অং সান সু চির মিথ্যেচার || জাতিসংঘের কঠোর ভূমিকা চাই

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৭, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ

গত ২৪ অগাস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে একসঙ্গে ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলা এবং এই হামলার জেরে সংঘটিত সহিংসতায় ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার শতাধিক রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে মিয়ানমারের পুলিশ ও সেনাবাহিনি। তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। প্রায় প্রতিদিন বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ নদীতে ভাসমান রোহিঙ্গা নারী পুরুষ ও শিশুদের লাশ পাওয়া যাচ্ছে। হয় এরা পানি তে ডুবে কিংবা গুলিতে নিহত হয়েছে। লাশের মিছিল প্রতিদিনই বাড়ছে। রয়টাসের্র খবর অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের হত্যা করে মায়ানমার সেনাবাহিনি প্রমাণ লোপাট করতে লাশ পুড়িয়ে ফেলছে। ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে। বিশ্ব বিবেক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এই ঘটনায় হতভম্ব। দেশে দেশে মিয়ানমার বাহিনির এই গণহত্যার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। অং সান সু চির নোবেল পুরস্কার ছিনিয়ে নেয়ার দাবিও উঠেছে। একটি জাতিসত্তাকে নির্মূলে এমনই আগ্রাসী গণহত্যা চালাচ্ছে সে দেশের সেনাবাহিনি। বাংলাদেশের সাথে সীমান্তের একাংশ জুড়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভূমিমাইন বসানোরও খবর এসেছে। সেনাবাহিনীর সহিংসতা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে পালানো রোহিঙ্গারা যেন আর মিয়ানমারে ফিরতে না পারে সেজন্যই মাইন পাতা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্মম এই হত্যাযজ্ঞ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে এবং জাতিসংঘ উদ্বিগ্ন- প্রতিবাদ জানাচ্ছে কেবল তখনই ১৩ দিন পর মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী অং সান সু চি অবশেষে রোহিঙ্গাদের নিয়ে মুখ খুললেন।
মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী অং সান সু চি বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড়, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিমদের দুর্দশা নিয়ে ‘ভুয়া সংবাদ’ ছড়ানোকেই দায়ী করেছেন। সু চি বলছেন, রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যের সবাইকেই তার সরকার সুরক্ষা দিচ্ছে। একইসঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতিকে ভুয়া ছবি ও খবরের মাধ্যমে বিকৃত করে সন্ত্রাসীদের স্বার্থে প্রচার করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে ভয়াবহ মানবিক সঙ্কটের মধ্যেও এতটুকু বিচলিত নন সু চি। আগের মতোই উল্টো সুরে তিনি দায়ী করেছেন ‘বিদ্রোহীদেরকে’, সেনাবাহিনীকে নয়।
শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সু চির মত ব্যক্তিত্বও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছেন। অন্যদিকে সে দেশের সেনাবাহিনি হত্যাযজ্ঞ চালানোর সমর্থনে ‘বহির্দেশের ষড়যন্ত্র তত্বও আবিস্কার করেছে। অং সান সু চি এবং সে দেশের সেনাবাহিনির বক্তব্য যদি সত্য ধরে নেয়া হয় তাতেও প্রশ্ন থেকে যায়। মায়ানমার সরকার যদি সে দেশের রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিবে তা হলে শরণার্থীর ¯্রােত কীভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, কীভাবেই বাংলাদেশের নদীতে একের পর এক গুলিবিদ্ধ  রোহিঙ্গাদের লাশ ভেসে আসছে কিংবা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেÑ এই শরণার্থী মিছিল, গুলিবিদ্ধ লাশ তো আর অপপ্রচার নয়। এগুলোই বাস্তবতা। আর বাস্তবতা আছে বলেই জাতিসংঘ, ইউরোপিয়ন ইউনিয়ন সোচ্চার প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বিশ্বের দেশে দেশে প্রতিবাদ নিন্দা হচ্ছে। তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ইতোমধ্যে তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে। ওইসব দেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। এসবও কী অপপ্রচার?
প্রকৃত অর্থে মিয়ানমার রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চাপিয়ে দিয়েছে। নিরীহ রোহিঙ্গাদের ওপর যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে । তারা ওই জাতিগোষ্ঠিকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে চলেছে। রোহিঙ্গাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম পরাকাষ্টা দেখিয়ে যাচ্ছে মিয়ামার। মানবিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে বিশ্ব জাতিগোষ্ঠির সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে। এই মুহূর্তে জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় ভূমিকার প্রয়োজন। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আহবান জানাই।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ