অনভিপ্রেত উচ্চশিক্ষার মোজেজা

আপডেট: জুন ৮, ২০১৯, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির


তাত্ত্বিক জ্ঞান আর ব্যবহারিক পরিশীলন মেধাবী ব্যক্তিকে বিশেষজ্ঞ হতে সাহায্য করে। চাকরিতে উন্নতি বা চাকরি প্রাপ্তির প্রধান অবলম্বন হিসেবে যদি এমফিল-পিএইচডি-ডিলিট ইত্যাদি মাপকাঠি হয় তবে এসবের মাহাত্ম্য খ-িত হতে বাধ্য। স্মরণার্হ যে, মেধাচাষ করে বাড়ে না-শাণিত হয়, তা স্বতঃস্ফূর্ত, সহজাত। গত শতকের আগে কোনো আবিষ্কারকের ওইসব ডিগ্রি ছিলো না। অবশ্য সে সবের অভিধা তখনো চিহ্নিত হয়নি। ব্যক্তির জ্ঞানের বিস্তৃতিতেই তাদের পা-িত্যের পরিচয় বিধৃত থাকতো এবং তাতেই তারা সমাদৃত হতেন। এই ফাঁকে নিজের অকৃতার্থতার কথা কিঞ্চিৎ বলে রাখি। আমি বিবিধ পথ মাড়িয়ে মানবিক বিদ্যা আহরণের শতচেষ্টার পরিণতিতে কণা পরিমাণ জ্ঞানের সাথে পরিচিত হয়ে শিক্ষকতার ব্রতে প্রবিষ্ট হই। তখন বুঝিনি। এখন বুঝছি, জগতের সর্বাপেক্ষা মহান ব্রতে আমার মতো এমন মেধাহীন ব্যক্তির আনাগণা কী অপরাধ!
নিকট অতীতের কিছু মেধাবী শিক্ষকের পরিচয় এ প্রসঙ্গে উপস্থাপন করি। কিংবদন্তিশিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক, শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মোহাম্মদ আব্দুল হাই, মননশীল চিন্তক আব্দুল হক প্রমুখ বাড়তি ডিগ্রি কাঁধে নেন নি। অথচ সেসব অর্জন তাদের পক্ষে কঠিন ছিলো না। তাঁরা জ্ঞানের নিরলস চর্চা করে গেছেন।
আমরা কাউকে খাটো করার জন্য বিষয়টি অবতারণায় প্রবৃত্ত হইনি। তবে পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, সমাজজীবনের সাথে সম্পর্কহীন এমন কিছু বিষয়ে ডিগ্রি নেয়া হচ্ছে, যা সনদের ফাইলে আবদ্ধ থাকে বা নামের শেষে অথবা প্রথমে কিছু চমকলাগানো শব্দের সংযোজনে ব্যবহৃত হয়। এগুলো কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ বা ওপরে ওঠার নিমিত্ত মাত্র। শিক্ষাবিদ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর আত্মজীবনী ‘আমার চলার পথে’ গ্রন্থের অক্সফোর্ড পর্বে বর্ণিত আছে, সনদের অলংকার হিসেবে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের জন্য তাঁকে প্ররোচিত করা হয়েছিলো, তিনি প্রলুব্ধ হননি। এমনিতেই ইংরেজি সাহিত্যের বিপুল ভুবন পর্যবেক্ষণ ব্যক্তির পক্ষে একজীবনে বাস্তবতা পরিপন্থী। পিএইচডি ডিগ্রির জন্য ব্যক্তিসাহিত্যিক বা কালের পরিচয় দেয়ার প্রয়োজনে কিছুটা খ-িত বিষয়কে অবলম্বন করা হয়। যা টর্চলাইটে সুড়ঙ্গের অন্ধকার ঘনীভুত করার মতো। তাই তিনি সাহিত্যের একটি ধারা বেছে নিয়ে ব্যাপক পড়াশোনার পথ পরিক্রম করেন। তাছাড়া জ্ঞান আহরণ তো ছকে বাঁধা হতে পারে না। প্রসঙ্গত একটি ঘটনা বলে রাখা ভালো, জনাব সিদ্দিকীর সাথে জনৈক সজ্জন ব্যক্তি ওয়াহাবী আন্দোলনের তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। বাস্তব জীবনে তাঁকে ওয়াহাবী অনুসারীদের একটি অংশের মানুষেরা নেতা হিসেবে সম্মান করলেও তিনি সেই বৃত্তবদ্ধ ছিলেন না। ফলে অর্জিত ডিগ্রি ফলপ্রসূ হয়নি। আজকের উচ্চতর ডিগ্রি কী পরিমাণ ভয়াবহ, তা সংক্ষিপ্ত আলোচনায় কথাবদ্ধ সম্ভব নয়। এখনকার উচ্চতর ডিগ্রিধারীদের অনেকে একটি মাত্র গোরুর রচনা আয়ত্বকারীদের মতো। ফাঁক ফোকর পেলে নি¤œগামীজনের মতো সেদিকেই প্রবাহিত হয়। এযেন ডস্টর ডোস্কির আদুরী গল্পের নায়িকার মতো। ঘেরাটোপ থেকে বেরুতে পারে না।
এখন ডকটরেট ডিগ্রি বিক্রির কারখানা গড়ে উঠেছে। অনেক গড় মেধাসর্বস্ব ব্যক্তি তা সহজেই কিনতে পারছে। তাতে আতঙ্কিত হবার নানাকারণ বিদ্যমান। কিছু ব্যক্তির মেধার সংকীর্ণতার কারণে মাস্টার্স পর্যন্ত ভালো ফল না থাকায় কোথাও ভালো কর্মসংস্থান হয়নি। যেনতেন প্রকারে বড়ো ওজনের ডিগ্রি পিএইচডি করায়ত্ব করেছে। সেই সুবাদে বা পদপ্রক্ষালনের গৌরবে বিশুদ্ধ জ্ঞানদান প্রতিষ্ঠানে প্রবিষ্ট হয়েছে। এদের অনেকেই মেধাহীনরা যে সব ভুল করে তার আবর্তেই ঘুরপাক খায়।
শিক্ষা ব্যতীত চাকরির অন্যান্য ক্ষেত্রে ডিগ্রিধারীদের বাড়তি জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ কম। তবুও কিছু মেধাবী ব্যক্তি তা অর্জন করছেন চাকরি ক্ষেত্রে উন্নতি বা অন্যবিধ ভাবনা সামনে রেখে। প্রবল যোগ্যতাসম্পন্ন হয়েও অকার্যকর হয়ে থাকে গবেষণার বিষয়ের ফল। তাহলে এসবের মোজেজা কোথায়?
আমরা অনেককে চিনি, যাঁরা অসাধারণ মেধাবী। চাকরিকালীন তাঁদের কেউ কেউ ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হয়েও অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রি করে এসেছিলেন বিদেশ থেকে। কর্মজীবনে যারা কোনো প্রয়োগের সুযোগ পান নি। তাহলে এতসব উচ্চতর ডিগ্রি বগলদাবা করার উদ্দেশ্য কি চাকরি প্রাপ্তি বা পদোন্নতি! আমরা মনে করি এতসব অনভিপ্রেত ডিগ্রির চেয়ে জাতীয় কাজে সত্যিকার মেধাবীদের বেছে নেয়া দরকার। আর উচ্চশিক্ষা বা উচ্চতর ডিগ্রির শনৈ শনৈ ক্রমবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দেখিয়ে চোখ জ্ঞানের গভীরে প্রবেশের দ্বার উন্মুক্ত করতে না পারলে জাতির মানসিক উন্নতি কাগুজেই থেকে যাবে। পিএইডির তাবিজ ধুয়ে খেলেও জ্ঞানের দীনতা ঘুঁচবে না।
তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের মেধা পরীক্ষার ভার মুক্তকরার নির্দেশ দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। একে আমরা সাধুবাদ জানাই যদিও তার ফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে। টোলের শিক্ষার যুগে তেমন পরীক্ষা ব্যবস্থা ছিলো না। তাই বলে যেখান থেকে জ্ঞানার্যিগণ ফেলনা ছিলেন না। তার প্রমাণ বহন করছে ইতিহাস। সুতরাং অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ডিগ্রি নয়- প্রথম অপরিহার্য প্রয়োজন মেধার। আমরা হাতেনাতে দেখতে পাচ্ছি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়- এমনকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছু ডিগ্রিধারী শিক্ষার কত অপমান করে চলেছে।
সম্প্রতি উচ্চমাধ্রমিক পরীক্ষার (২০১৯) পদার্থবিদ্যা বিষয়ের প্রশ্নপত্র নিয়ে যে মূর্খতার কারসাজি প্রদর্শিত হলো, তার দায় কে নেবে? দলবাজ, পদলেহী অথবা অনভিপ্রেত সুযোগ সন্ধানী ডিগ্রিধারীদের এতে সংশ্লিষ্ট থাকার অনুমান বোধ করি অন্যায় নয়। আমাদের আশংকা, এরাই যদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব পেতে থাকে তবে প্রশ্নপত্রের কেলেঙ্কারীই নয়- পুরো জাতির ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্য দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হবে না। আমরা যে দুঃস্বপ্ন দেখতে আগ্রহী নই।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ