অযত্ন অবহেলায় বেদখল হচ্ছে নওগাঁয় গাঁজা সংরক্ষণাগার || শত কোটির টাকার সম্পদ কাজে লাগানোর দাবি

আপডেট: নভেম্বর ১৪, ২০১৭, ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

এমআর রকি, নওগাঁ


অযত্ন অবহেলায় বেদখল হচ্ছে নওগাঁয় এই গাঁজা সংরক্ষণাগারটি। শত কোটির টাকার এই সম্পদটি অন্য কাজে লাগানোর দাবি জানাচ্ছেন স্থানীয়রা-সোনার দেশ

১৯১৭ সালে গাঁজা কাল্টিভেটরস কোঅপারেটিভ সোসাইটির গড়ে নওগাঁয় শতাধিক স্থাপনা এখন আর কোন কাজে আসছে না। গাঁজার গুদাম, অফিস কক্ষসহ নানা স্থাপনা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। নান্দনিক স্থাপত্য গড়ে তোলা গাঁজা সোসাইটির এসব ভবন এখন নানা অসামাজিক কাজে ব্যবহারসহ মুল্যবান সম্পদ দিনে দিনে বেদখল হচ্ছে। সমবায় ভিত্তিক কার্যক্রমে পরিচালিত গাঁজা সোসাইটির রয়েছে ৬ হাজার সদস্য। গাঁজা সোসাটির নির্বাচিত কোন কমিটি না থাকায় গত ১০ বছর ধরে কোন সুফল পাচ্ছে না এ সদস্যরা। স্থানীয়রা বলছে গাঁজা সোসাইটির মুল্যবান সম্পদ ব্যবহারে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
ঐতিহাসিকদের মতে ১৭২২ সাল নাগাদ উপমহাদেশে প্রথম গাঁজার চাষ শুরু হয় নওগাঁ সদর উপজেলার মুরাদপুর গ্রামে। অধিক লাভজনক হওয়ায় ১৮৭৭ সাল নাগাদ এই অঞ্চলে গাঁজাচাষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ সরকার গাঁজা উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য লাইসেন্স প্রথা চালুর পর গাঁজা উৎপাদনকে কেন্দ্র করে ১৯১৭ সালে ‘নওগাঁ গাঁজা কাল্টিভেটরস কোঅপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের’ নামে একটি সমবায় সমিতি গঠিত হয়। সে সময় গাঁজা সোসাইটির প্রধান কার্যালয় গাঁজা সংরক্ষনের গুদামসহ নানা স্থাপনা গড়ে তোলা হয় নওগাঁয়। কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ের আদলে এই কার্যালয়ের সাজসজ্জার জন্য কাঠ আনা হয়েছিল নেপাল থেকে। ১৯৮৭ সালে গাঁজা চাষ নিষিদ্ধ করার পর এসব স্থাপনা বন্ধ ঘোষণা করা হয় । এরপর থেকে এসব ভবন পরিত্যক্ত। সুষ্ঠুু নজরদারী না থাকায় দিনে দিনে এসব মুল্যবান সম্পদ বেদখলসহ নেশা খোরদের আড্ডায় ব্যবহার হচ্ছে ।
গাঁজা সোসাইটির অন্যতম অংশীদার ময়নুল হক মুকুল বলেন, জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়ন করার লক্ষে গাঁজা সমবায় সমিতিকে একত্রিত করে মানুষের মঙ্গলের জন্য যদি কাজ করা না হয় তা হলে এ সম্পদ হরিলুট হতেই থাকবে আর সমবায়ের উদেশ্য কোন দিন বাস্তবায়ন হবে না বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন অধরা রয়ে যাবে । তিনি এসব সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে একটি নির্বাচিত কমিটি দেওয়ার দাবি জানান।
জেলা মাদক বিরোধী সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান খোকা ও জেলা বাসদের সমন্বনয়ক জয়নাল আবেদিন মুকুল বলেন, শহরের হার্ট পয়েন্টে শত কোটির টাকা এ সম্পদ কাজে লাগানোর জন্য সর্বদলীয় ঐক্য দরকার । এখানে একটি কৃষি বিশ^বিদ্যালয় নেই এ সম্পদকে কাজে লাগানো যেতে পারে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলে। জেলা কৃষি খাতকে আরো সমৃদ্ধ করা যেতে পারে । জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, গাঁজা সোসাইটির সম্পদ হরিলুটে এখানে জামায়াত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কোন তফাৎ নেই । যে যখন যেভাবে পেরেছে মুল্যবান এ সম্পদ নিজের দখলে নিতে বেপরোয়া ।
গাঁজা সোসাইটি ও গাঁজা মহল নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের নওগাঁয় মোট সম্পদ রয়েছে ৪০ একর জমি, ছোট বড় ১০০টি ভবন, ৭টি দিঘি, ১টি লেক, ১১টি উচ্চবিদ্যালয়, ৩টি মসজিদ, ১টি মন্দীর, ৪টি গুদাম ঘর, ১টি সরাইখানা এবং কোঅপারেটিভ ক্লাব। এ ছাড়াও ১টি লাইব্রেরি, ৩টি হাসপাতাল, ৩টি দাতব্য চিকিৎসালয় । নির্বাচিত কোন কমিটি না থাকায় বর্তমানে জেলা রাজস্ব বিভাগ এর দেখভাল করার দায়িত্ব পালন করছে । সোসাইটির কেয়ার টেকার আনিসুর রহমান জানান, বর্তমানে তাদের দখলে আছে প্রায় ২৮ টি বাসা, ৩৯০ টি দোকান, এবং ৬টি পুকুর, একটি ঝিল হিমাগার ও আবাদি ৯ বিঘা জমি রয়েছে । জমি ও পুকুর ৩ বছরের জন্য লীজ দেওয়া আছে । কমিটি থাকা কালে এর সুফল অংশীদারদের মাঝে দেওয়া হতো এখন এসব কার্যক্রম বন্ধ আছে । বর্তমানে সমিতির প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যাংকে রয়েছে বলে জানান তিনি।
নওগাঁ পৌর মেয়র নজমুল হক সনি বলেন, পৌর সভার মধ্যে যে সব গাঁজার পরিত্যাক্ত সম্পদ আছে তা জনকল্যাণ কর কাজে লাগানোর জন্য একাধিক বার মিটিং করা হয়েছে কিন্ত কার্যকর কোন প্রদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না । তবে আগামীতে বিষয়টি নিয়ে আরো সরব হওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন ।
সমবায় ভিত্তিতে পরিচালিত গাঁজা সোসাইটির প্রায় ৬ হাজার অংশীদারে মধ্যে ১৩শ জন সদস্য মারা গেছে। যে সব সদস্য রয়েছে তারাও এখন সমিতির অলস কার্যক্রমে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সমিতির অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট মহসীন রেজা বলেন নওগাঁ শহরের মুল অব কাঠামো গাঁজার সম্পদের উপর। এসব সম্পদ কেউ নাম মাত্র মুল্য ভোগ দখল করছে যুগের পর যুগ ধরে । এখন এসব সম্পদ নিয়ে ভাববার সময় এসেছে ।
নওগাঁ জেলা প্রশাসক ড. মো. আমিনুর রহমান বলেন, গাঁজা সোসাইটির এসব সম্পদ ব্যবহারে পদক্ষেপ নিতে আগামীতে কাজ করবেন তিনি। সমিতির পক্ষ থেকে যদি নির্বাচন চাওয়া হয় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিবেন । তিনি এসব সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করার লক্ষে আইন শৃংখলাসহ জেলা সমন্বয় মিটিংয়ে আলোকপাত করবেন বলে জানান।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ