অর্ধেকের বেশি রোহিঙ্গা এসেছে খালি হাতে

আপডেট: জানুয়ারি ৮, ২০১৮, ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


মিয়ানমারের উত্তর রাখাইনে ২৫ আগস্ট সেনা অভিযান শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে ৬ লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গা। এদের মধ্যে সিংহভাগ এখন বেঁচে আছে মূলত দেশী-বিদেশী ত্রাণসহায়তার ওপর। কারণ পালিয়ে আসার সময় জরুরি প্রয়োজন মেটানোর মতো কোনো কিছুই সঙ্গে আনতে পারেনি অর্ধেকের বেশি রোহিঙ্গা।
অনিশ্চয়তা ও জরুরি প্রয়োজনের মুখে রোহিঙ্গারা এখন কতটা নাজুক অবস্থানে রয়েছে, তা নির্ণয়ে দেশী-বিদেশী সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজারের উদ্বাস্তু শিবিরগুলোয় সম্প্রতি একটি সমীক্ষা চালিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। রোহিঙ্গা ইমার্জেন্সি ভালনারেবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট (আরইভিএ) শীর্ষক ওই জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার সময় খাদ্যাভাব বা জরুরি অন্য প্রয়োজন মেটানোর মতো বিক্রয়যোগ্য কোনো ধরনের সম্পদ বা টাকা-পয়সা সঙ্গে করে আনতে পারেনি ৫১ শতাংশ রোহিঙ্গা। টাকা-পয়সা আনার সুযোগ পেয়েছে ৩৭ শতাংশ রোহিঙ্গা। স্বর্ণালঙ্কার আনতে পেরেছে ২১ শতাংশ। এছাড়া ৬ শতাংশ রোহিঙ্গা পালিয়ে আসার সময় বিক্রয়যোগ্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস সঙ্গে নিতে পেরেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে এখন খাদ্যের জন্য বাইরে থেকে আসা ত্রাণসহায়তার ওপর উচ্চ থেকে পূর্ণ মাত্রায় নির্ভরশীল উদ্বাস্তু রয়েছে ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ ত্রাণসহায়তা বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ৮০ শতাংশই খাদ্য সংকটের মুুখে পড়বে। এক্ষেত্রে সঙ্গে আনা সহায়সম্বল বিক্রি, জমানো টাকার সদ্ব্যবহার অথবা ধারদেনা করা ছাড়া সংকট মোকাবেলার আর কোনো উপায় নেই তাদের। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হলো, সংকটময় মুহূর্তে খাদ্যভাব মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় এটুকু জোরও অধিকাংশ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর নেই।
রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আর্থিক দুর্বলতাই তাদের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার পেছনে মূল কারণ বলে ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়। এতে উঠে আসে সর্বশেষ গণবাস্তুচ্যুতি শুরু হওয়ার পর থেকে যারা বাংলাদেশে এসেছে, তাদের মধ্যে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশই এখন সবচেয়ে বেশি খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে আগেকার বিভিন্ন ঘটনায় বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে যাদের নিবন্ধন রয়েছে, তাদের অবস্থাও প্রায় একই রকম। এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ মাত্রায় খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে ৫৭ শতাংশ। নিবন্ধিত পুরনো রোহিঙ্গাদের মধ্যে এ ধরনের ঝুঁকি রয়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশের।
নতুন আসা উদ্বাস্তুদের মধ্যে বর্তমানে মোটামুটি মাত্রার খাদ্যঝুঁকিতে রয়েছে ২৩ দশমিক ২ শতাংশ। এছাড়া ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ আছে যাদের মধ্যে গহনা বিক্রি, ধারদেনা, জমানো টাকা-পয়সা ব্যয় ও বাকিতে খাদ্য ক্রয়ের মাধ্যমে এ ধরনের সংকট মোকাবেলার কিছুটা সামর্থ্য রয়েছে। কিন্তু এ সম্পদ বা জমানো টাকা শেষ হয়ে যাওয়া মাত্র এদের পরিস্থিতিও খুব খারাপের দিকে চলে যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। এরই মধ্যে এদের অনেকেই আবাসনসহ নানা প্রয়োজনে বেশকিছু অর্থ ব্যয় করে ফেলেছে।
গত বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে কয়েকটি পুলিশ ও সেনাচৌকিতে এক সমন্বিত হামলার জের ধরে সেখানকার সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সে দেশের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এক দমন অভিযান শুরু হয়। অভিযান শুরুর পর থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠে বর্মি সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের বিবরণে উঠে আসে ঘরের ভেতর মানুষ আটকে পুড়িয়ে মারাসহ নির্বিচার যৌন সহিংসতা ও আরো অনেক বর্বরতার মর্মস্পর্শী বিবরণ। এসব বর্বরতার হাত থেকে রেহাই পায়নি শিশুরাও। পুরো বিষয়টিতে পরিষ্কার হয়ে উঠতে থাকে গণহত্যার আলামত। নির্মমতার মাত্রা দেখে অভিযানটিকে জাতিগত নিধন কার্যক্রম বলে অভিধা দেয় জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহল।
অভিযান শুরুর পর থেকেই রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে দলে দলে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে থাকে। এ সময়ও খাদ্যাভাব, গন্তব্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য বা ধারণার অভাব, নিরাপত্তা ঝুঁকি, অর্থাভাব, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন সংকটসহ নানা ধরনের হয়রানি মোকাবেলা করেই বিপৎসংকুল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাদের।
উদ্বাস্তু শিবিরে রোহিঙ্গাদের বর্তমানে যেসব সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে, আরইভিএ জরিপে সেগুলোর ওপরও আলোকপাত করা হয়। এতে বলা হয়, উদ্বাস্তুরা এ মুহূর্তে নগদ টাকার অভাবই বোধ করছে সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে খাদ্যের অপর্যাপ্ততা, আশ্রয়স্থলের দুরবস্থা, বস্ত্র ও জ্বালানির অভাব এবং সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার অপ্রতুলতার মতো সংকট মোকাবেলা করেই অতিবাহিত হচ্ছে তাদের উদ্বাস্তু জীবন।