অ্যাঞ্জি, আয়লান ও মানবিকতার হত্যা

আপডেট: জুলাই ৫, ২০১৯, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

শান্তনু দত্তগুপ্ত


আরও একটা ছবি…। মর্মান্তিক বললেও কম। আর সেটাই গোটা দুনিয়ার চোখে আঙুল দিয়ে ফের দেখিয়ে দিল, মানবিকতার থেকে অর্থনীতির গুরুত্ব আজ অনেক বেশি। কালো টি-শার্ট, কালো শর্টস পরা শরীরটা মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে কাদায়। আগাছার মধ্যে। টি-শার্টটা একটু উঠে। তার ফাঁক থেকে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট আর একটা শরীর। ২৩ মাসের অ্যাঞ্জির। লালরঙা প্যান্ট পরা নীচের অংশটাই শুধু নজরে আসছে। মাথাটা ঢুকে রয়েছে বাবার টি-শার্টের ভিতর। ছোট ডান হাতটা বেরিয়ে রয়েছে বাবার কাঁধের কাছে। জলের হাল্কা ঢেউ এসে ধাক্কা মেরে ফিরে যাচ্ছে বাবা আর মেয়েকে। শেষবারের মতো। ঠিক যেভাবে চার বছর আগে তুরস্কের সমুদ্রসৈকতে পড়ে ছিল তিন বছরের আয়লান কুর্দির ছোট্ট শরীরটা। সিরিয়ার সেই শিশু গৃহযুদ্ধের নৃশংসতা থেকে বাঁচতে বাবা-মায়ের সঙ্গে পাড়ি দিয়েছিল গ্রিসের দিকে। রিফিউজি ছিল সে। রিফিউজি অ্যাঞ্জি ভালেরিয়াও। হোক না শিশু! আদপে তো রিফিউজি! ইললিগাল মাইগ্র্যান্ট…।
ঠিক এক সপ্তাহ আগে গোটা দুনিয়া যখন ফাদার্স ডে পালন করছে, অস্কার আলবার্তো মার্টিনেজ তখন মেক্সিকো সীমান্তে শরণার্থী শিবিরে। ২৩ মাসের মেয়ে অ্যাঞ্জি ভালেরিয়া, আর স্ত্রী তানিয়াকে নিয়ে… ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গায়ের চামড়া পুড়িয়ে দেওয়া গরমে। দু’মাস ধরে পড়ে ছিলেন সেখানে। নিজের দেশ… এল সালভাডর ছেড়ে। বেঁচে থাকার আশায়। সেখানে শেফের কাজ করতেন একটি রেস্তরাঁয়। দারিদ্র্য, হিংসার পরিবেশ ছেড়ে বেরতে চেয়েছিলেন। মেয়েকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে একটা নিরাপদ জীবন দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বৈধভাবে আবেদনের যে বিরাট লাইন! আর পেরে উঠলেন না। ঠিক উল্টোদিকে টেক্সাস। রিও গ্রান্দে নদীটা পেরলেই। মাত্র তো ৪০০ মিটার! মেক্সিকোর স্থানীয় প্রশাসন সাবধান করেছিল, নদীর ধারে যেন কেউ না যায়। বাঁধ থেকে জল ছাড়া হয়েছে। আচমকা স্রোত বেড়ে যেতে পারে। বেঁচে থাকার তাড়নায় গা করেননি মার্টিনেজ। প্রথমে গিয়েছিলেন মেয়েকে ওপারে পৌঁছে দিতে। অসুবিধা হয়নি। মেয়েকে রেখে ফিরছিলেন… স্ত্রীকে ওপারে নিয়ে যেতে। মেয়ে বুঝল না। দেখল বাবা চলে যাচ্ছে…। সঙ্গে সঙ্গে জলে ঝাঁপ দিয়েছিল অ্যাঞ্জি। মার্টিনেজ ঠাহর করেই ফিরলেন মেয়েকে ধরতে। ততক্ষণে স্রোত বেড়ে গিয়েছে। মেয়ে অ্যাঞ্জির কাছে পৌঁছতেই বাবা আর মেয়েকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল রিও গ্রান্দে। মেক্সিকোর দিকে দাঁড়িয়ে দেখলেন তানিয়া। পরদিন সকালে সাড়ে পাঁচশো মিটার দূরে উদ্ধার হল দু’জনের দেহ।
মেক্সিকোর সাংবাদিক ডে লিউক তুলেছিলেন ছবিটি। দেখিয়েছিলেন বিশ্বকে। আর এই ছবির ব্যাপারে প্রশ্ন করলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘আই হেট দিস।’ ঘৃণা করেন তিনি। এবং দায়ী করেন ডেমোক্র্যাটদের। মেক্সিকো সীমান্তে পাঁচিল তো তারাই তৈরি করতে দিচ্ছে না! ওখানে সুউচ্চ দেওয়াল তৈরি হয়ে গেলে এসব ঝামেলাই থাকত না! কে আর ওই দেওয়াল টপকে আমেরিকায় ঢোকার চেষ্টা করত? তবু তিনি মানবেন না, তাঁর অভিবাসন নীতির জন্যই আজ এই অবস্থা। বারাক ওবামার জমানায় মধ্য আমেরিকার দেশগুলিতে অস্থিরতা কাটানোর জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। আলাদা অর্থ বরাদ্দ, শান্তি ফেরাতে এবং হিংসা থামাতে হস্তক্ষেপ… সব ছিল। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে বন্ধ করেছেন। ফলস্বরূপ, মধ্য আমেরিকার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াটা আর শেষ হয়নি। গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস, এল সালভাডর, নিকারাগুয়ার মতো দেশগুলো আবার ফিরে গিয়েছে দুর্নীতি, হিংসা, অনটনের অতলে। কাজেই চলতি শতকের শুরুর দিকে সীমান্ত পেরিয়ে মার্কিন আশ্রয়ে আসার কারণ শুধু অর্থনৈতিক হলেও ধীরে ধীরে চিত্রটা বদলে গিয়েছে। সেই সময়টা পেটের টানে কারখানায় বা নির্মাণকাজে গতর খাটার উদ্দেশ্যেই মধ্য আমেরিকা বা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে মানুষ পাড়ি জমাত মার্কিন মুলুকে। ফ্লোরিডার অর্ল্যান্ডোয় আলাপ হয়েছিল এক ক্যাবচালকের সঙ্গে। হাইতি থেকে এসেছিলেন ২৩ বছর আগে। তখন থেকেই গাড়ি চালান আমেরিকার রাস্তায়। এটাই তাঁর ধর্ম-কর্ম। দেশের কথা মনে পড়ে না? নাঃ। এক বিন্দু না ভেবে উত্তর দিয়েছিলেন তিনি। গ্রিন কার্ড হয়েছে। কিন্তু নাগরিক এত বছরেও হয়ে উঠতে পারেননি। তার উপর ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আদৌ আর হতে পারবেন কি না, সে নিয়েও সংশয়ে ছিলেন। অর্থনীতির সে ছবি এখন হু হু করে বদলে গিয়েছে। আজ সবটাই সামাজিক। এখন শুধু আর কাজের খোঁজে একা নয়, স্ত্রী সন্তান, পরিবারকে নিয়ে। সাম্প্রতিক একটা তথ্যে দেখা গিয়েছে, বেআইনিভাবে দক্ষিণের সীমান্ত পেরনোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আটক করা হয়েছিল ১ লক্ষ ৩২ হাজার ৮৮৭ জনকে। তার মধ্যে ৮৪ হাজারই সপরিবারে। আরও মারাত্মক পরিসংখ্যান হল, সাড়ে ১১ হাজার একা… নাবালকত্বের সীমা পেরয়নি তারা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার দক্ষিণ সীমান্তে উদ্বাস্তুদের জন্য ‘মানবিকতার’ খাতিরে ৪৬০ কোটি মার্কিন ডলার মঞ্জুর করেছে। প্রবল কষ্টে থাকা শরণার্থীদের যাতে উপকার হয়। পাশাপাশি মেক্সিকোর উপর চাপটাও মার্কিন প্রেসিডেন্ট অন্যভাবে বজায় রেখে দিয়েছেন। সাফ হুমকি, তোমার দেশ থেকে রিফিউজি ঢোকা বন্ধ করো, না হলে আমদানি পণ্যের উপর শুল্ক ব্যাপক হারে বাড়িয়ে দেব। এর ফলে আমেরিকার কোনও ক্ষতি না হলেও মেক্সিকো অবশ্যই ভাতে মারা যাবে। ব্যাপক আর্থিক মন্দার কবলে পড়বে দেশটা। ট্রাম্প সরকার আপাতত তেমন পদক্ষেপ না নিলেও হুমকিটা ঘাড়ের উপর খাঁড়ার মতো ঝুলিয়েই রেখেছে। দিন কয়েকের মধ্যেই পর্যালোচনা হবে, উদ্বাস্তু ঠেকাতে কেমন কাজ করছে মেক্সিকো। সেই বুঝে ব্যবস্থা। মেক্সিকোও পেটের দায়ে ঢেলে মিলিটারি পুলিস নামাচ্ছে। শুধু আমেরিকার দিকে যাওয়া ঠেকালেই যে হবে না! তাহলে শরণার্থী শিবিরগুলোয় মানুষ বাড়তেই থাকবে। তা সামলানো যাবে না। কাজেই যে নদী, জঙ্গল বা পাহাড় পথে মধ্য আমেরিকা থেকে অগুনতি মানুষ এই সীমান্তে এসে পৌঁছচ্ছে, সেই যোগসূত্রটা বন্ধ করতে হবে। অর্থাৎ কঠোর হওয়া ছাড়া গতি নেই।
কিন্তু তাতে কি অ্যাঞ্জেলিকা লোপেজের বা তাঁর সন্তানদের কোনও লাভ হবে? ২৩ বছর বয়সি সিঙ্গল মাদার অ্যাঞ্জেলিকা। থাকতেন হন্ডুরাসের স্যান্টা কোপা দে কোপানে। গ্যাং ওয়ারে বিধ্বস্ত দেশ…। একদিন কয়েকজন বন্দুকধারী এল। বলল, তোমাকে আর তোমার বোনকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে। ‘বান্ধবী’র মতো তোমরা আমাদের সঙ্গে থাকবে। জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও। ওরা দরজা ছেড়ে বেরতেই আর দেরি করেননি অ্যাঞ্জেলিকা। সাত বছরের ছেলে, আর দু’বছরের মেয়েকে কোলে নিয়ে ছুটেছিলেন মেক্সিকোর দিকে। জানা নেই, কীভাবে বৈধ শরণার্থী হওয়ার জন্য আবেদন করতে হয়। জানেন না, কীভাবে আমেরিকায় গেলে ওখানকার পুলিস তাড়িয়ে দেবে না… তাও এসেছেন। কাদার মধ্যে শুয়ে দুই শিশুকে নিয়ে সারা রাত কাটিয়েছেন। আর ভিক্ষা করেছেন… একটা নিরুপদ্রব জীবনের। অ্যাঞ্জেলিকার মতোই তো মেক্সিকোর ফেরিয়া মেসোআমেরিকানা সেন্টারের শরণার্থী সেই মা! বন্ধ দরজার নীচ দিয়ে মুখটা বাড়িয়ে ডাকছেন… কেউ যদি শোনে। স্প্যানিশে বলছেন, আমার ছেলেটা অনেক দিন ধরে অসুস্থ। একটা কণাও খেতে দেওয়া হয়নি। খাবার জল নেই। ওকে বাঁচান। ও মরে যাবে…।
রাজনীতি, অর্থনীতি এবং দেশ শাসন ভয়ানক বস্তু। দেশ চালাতে গেলে অত চোখের জল ফেলা যায় না। আমাদের বিশ্বনেতারা বারবার তারই প্রমাণ দিয়ে চলেছেন। তাই প্রাণ দিতে হয় গুরপ্রীত কওরকেও। ঠিক তার সপ্তম জন্মদিনের আগে। ছোট্ট মেয়েটা কালো রঙের টি-শার্ট আর প্যান্ট পরে পা রেখেছিল আমেরিকায়। তারপর পথচলা শুরু হয়েছিল অ্যারিজোনার মরুভূমিতে। ভারতীয় সেই মেয়েটি। ভালো কিছুর আশায় বুক বেঁধে মায়ের সঙ্গে ঢুকে পড়েছিল আমেরিকায়। বাবা ছ’বছর ধরে এখানে আছেন। শরণার্থী হিসেবে আবেদন করেছিলেন। যা এখনও মার্কিন আদালতে ঝুলে। প্রচ- তেষ্টা…। অন্যদের কাছে মেয়েকে রেখে জলের খোঁজে গিয়েছিলেন গুরপ্রীতের মা। ফিরে এসে দেখেছিলেন মেয়ের নিথর দেহ। পরে গুরপ্রীতের বাবা-মা বলেছিলেন, ‘নিরাপদ, আরও ভালো কিছু হবে ভেবেই না এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম! ভারত ছেড়ে এসেছি। ভেবেছি কোনওরকমে মার্কিন মুলুকে শরণার্থী হতে পারলে মেয়েটাকে ভালোভাবে মানুষ করতে পারব। কোনও বাবা-মা কি ইচ্ছাকৃত সন্তানকে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে বলুন? আমাদের কাছে অন্য কোনও উপায় ছিল না।’
কী দোষ ছিল গুরপ্রীতের? কী দোষ ছিল অ্যাঞ্জির? দেশ, সীমান্ত, ক্ষমতা… এসবের জাঁতাকলে পড়ে আজ একের পর এক অ্যাঞ্জি হারিয়ে যাচ্ছে এই পৃথিবী থেকে। গুরপ্রীতের মা পারেননি। অপেক্ষায় রয়েছেন অ্যাঞ্জেলিকা। অপেক্ষায় সেই অসুস্থ সন্তানের শরণার্থী মাও। কতদিন? একটা সময় আর পারা যাবে না। এঁরাই সবকিছু ভুলে মরিয়া একটা চেষ্টা করবেন। বন্দুকের নলের মুখে পেরতে যাবেন কাঁটাতার। কিংবা ঝাঁপিয়ে পড়বেন জলে। মার্টিনেজের বোঝা উচিত ছিল, রাজনীতি বা দেশের স্বার্থের কাছে মানবিকতা আজ বিকিয়ে গিয়েছে। তাই মেয়ে অ্যাঞ্জিকে ভালো জীবন তিনি দিতে পারেননি। কিন্তু মৃত্যুর সময়… এক মুহূর্ত কাছছাড়া করেননি তাকে। ভেবেছিলেন নিজের টি-শার্টের নীচে মেয়েকে আগলে নিতে পারলে শেষমেশ ওপারে পৌঁছে যাবেন। পৌঁছলেন। কিন্তু নিষ্প্রাণ। লোকে বলে, মা সন্তানের জন্য সবকিছু করতে পারে। কিন্তু একজন বাবা তো মা এবং সন্তান দু’জনকেই কাঁধে নিয়ে চলে… নিঃশব্দে। আজীবন। আমৃত্যুও।
বিলেটেড হ্যাপি ফাদার্স ডে মার্টিনেজ…।
(বর্তমান ীনলাইন এর সৌজন্যে)