আইরিশ কবি ইয়েটস্: বাংলাভাষা ও বাঙালির হিতৈষীপুরুষ

আপডেট: জুলাই ৭, ২০১৭, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ

রফিকুজ্জামান রণি


সা¤্রাজ্যবাদের যাঁতাকলে পদপিষ্ট ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণের নাটাই-সুঁতো যখন বৃটিশের হাতে জিম্মি, এ অঞ্চলের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, সামাজিক মূল্যবোধ, শিল্প ও সংস্কৃতির পরিম-ল যখন ধীরে ধীরে হয়ে পড়েছিলো একেবারেই কোণঠাসা। ঠিক তখনই বিশ্বের দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াবেন বাংলাভাষারই কোনো এক কবিÑ এ ছিলো পরম বিস্ময়কর ও অবিস্মরণীয় ঘটনা! গীতাঞ্জলী কাব্যে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে নোবেল জয়ের মাধ্যমে সে অসম্ভবকেই সম্ভব করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সমগ্র বিশ্ববাসীকে। রবিঠাকুরের নোবেলজয়ী সে কাব্যের প্রথম স্বীকৃতিদাতা ব্যক্তিটি কোনো বাঙালি কবি নন, তিনি হলেন আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েট্স। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে গীতাঞ্জলী কাব্যের জন্যে ১৬ পৃষ্ঠার সুদীর্ঘ এক ভূমিকা লিখে দিয়েছেন তিনি, সেখানে কবিগুরুকে বিশ্বসাহিত্যের দীপ্তিমান এক নক্ষত্রের সঙ্গেও তুলনা করেছেন ইয়েটস্। তারপর সৃষ্টি হয় এক স্বর্ণখচিত ইতিহাস, গীতাঞ্জলী প্রকাশের বছরখানেক বাদে রবীন্দ্রনাথ নোবল পুরস্কারে ভূষিত হয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষা এবং বাঙালিপ্রতিভার অস্তিত্বের কথা সুস্পষ্টভাবে জানান দেনÑ যার ফলে অপ্রত্যাশিত এক বিজয় আসে বাংলাভাষাভাষী ও বাঙালির।
১৯৫২ সালে রক্তবিসর্জনের মাধ্যমে বাংলাভাষা আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পেয়েছে বটে; কিন্তু তারও প্রায় তিন যুগেরও অধিককাল আগে বাংলাভাষা এবং বাংলা সাহিত্যের বিজয় কেতন পতপত করে সমগ্র পৃথিবীর আকাশে উড়ে বেড়ানোর ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে রবিঠাকুরের নোবেলপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। ভারতবর্ষের মানুষ রবীন্দ্রপ্রতিভা প্রথম দিকে খুব একটা আঁচ করতে না পারলেও আইরিশ কবি ইয়েট্স তাঁকে চেনার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল অজর্নের প্রায় দশ বছর পর নোবেল কমিটি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস্কেও এ পুরস্কারের জন্যে মনোনীত করেন; সেজন্যে মধ্যিখানে সূত্রপাত হয়েছে অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনারও, এমনকি পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করতেও পিছপা হননি ইয়েট্স; তিনি নিজেও যেন বিশ্বাস করতে পারেননি যে ভারতীয় উপমহাদেশের কেউ এতো বড় পুরস্কার অর্জন করে ফেলবেন এতো দ্রুত। তারপরও বলতে হয় উলিয়াম বাটলার ইয়েট্স হচ্ছেন বাংলা সাহিত্যসংস্কৃতির একজন পরম হিতৈষীপুরুষ। কেননা, নোবেল অজর্নের আগেও বাংলা কবিতাকে তিনি ছোট করে দেখেনি।
ইংরেজশাসিত, কলোনিযুগের দুর্বিষহ মুহূর্তেও যে বৃটিশ-ভারতে বিশ্বমানের কাব্যপ্রতিভা লুকিয়ে ছিলো এ কথা ইয়েট্স অকপটেই স্বীকার করেছেন তাঁর মুখবন্ধে। শুধু তাই নয়, মোহিনী চ্যাটার্জী নামের ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত এক বাঙালী ব্রাহ্মণকেও নিয়ে ইয়েটস্ লিখেছেন বিখ্যাত একটি কবিতা। এর আগে অবশ্য মোহিনী চ্যাটার্জী ইংল্যান্ডে গেলে তাঁর কাছ থেকে প্রাচ্যদর্শন সম্পর্কে বিস্তর অভিজ্ঞতা লাভ করেন তিনি। ইয়েটস্রে ভেতরে প্রাচ্যদর্শন যে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে সে ব্যাপারে তাঁর ‘মোহিনী চ্যাটার্জী’ শিরোনামের বিখ্যাত কবিতার অংশ বিশেষ পাঠের মাধ্যমে জানা যায়:
করা কি উচিত উপাসনা
শুধাতেই, ব্রাহ্মণ বাতায়
‘কোনোকিছু প্রার্থনা কোরো না,
হর-রাত বলবে শয্যায়,
‘এই আমি ছিলাম স¤্রাট,
এই আমি ছিলাম নফর.
বুদ্ধু, হারামি, বজ্জাত
কিছু নাই মহীর উপর
যা যা আমি না ছিলাম, হায়
আমার বুকের ‘পরে ফের
অযুত মস্তক শুয়ে রয়।’
বিশ্বের প্রভাবশালী সাহিত্যবোদ্ধা, মার্কিন কাব্য-সমালোচক হেনরী গ্রাসী গোটা পৃথিবীর মধ্য থেকে মাত্র দুটো কবিতাকেই সর্বশ্রেষ্ঠের আসনে বসিয়েছেন। কবিতা দুটো হলোÑআইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস্রে ‘ঞযব ঝবপড়হফ ঈড়সরহম’ অর্থাৎ ‘দ্বিতীয়াগমন’ এবং বাংলা কবিতার বিদ্রোহী পুরুষ কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঞযব জবনবষ তথা ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। দুটো কবিতাতেই সা¤্রাজ্যবাদ, রক্তপাত ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে প্রবালভাবে হুঁশিয়ারি বাণী উচ্চারিত হতে দেখা যায়।
মার্কিন সমালোচক হেনরী গ্রাসীর এই কবিতা নিবার্চন থেকে আরেকটা বিষয়টা স্পষ্ট হয় যে, পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষের কবিপ্রতিভা কখনোই পরাধীন ছিলো না। সমকালেই উতরে গেছে সা¤্রাজ্যবাদের নিগড় ভেঙে দেশ থেকে দেশান্তরে।
বাঙালীর গর্ব করার আরো একটি বিষয় হলো হেনরী গ্রাসীর মতো বিদগ্ধজনের দ্বারা বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পাওয়া দুটো কবিতাই যথাক্রমে বাংলাভাষার কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলা সাহিত্যের পরম হিতৈষী কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস্রে হাতের উপরেই জন্ম লাভ করেছে।
আইরিশ সাহিত্যের কেল্টিক কাব্যধারার যুগ¯্রষ্টা কবি উইলিয়াম বাটলার  ইয়েটস্রে জন্ম আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে, ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে। স্বদেশের লোকজ ঐতিহ্য, ইতিহাস, প্রবাদপ্রবচন, দর্শন, মূল্যবোধ ও সংস্কার তাঁকে নিবিড়ভাবে প্রভাবিত করেছে। পাশাপাশি প্রাচ্যদর্শনও তাঁকে ভীষণভাবে টেনেছে। মডগন নামের পরমা সুন্দরী, বিপ্লবী এক অগ্নিকন্যা এসে তাঁর জীবন ও আদর্শকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছেন। কিন্তু ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে মডগনকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েও অপ্রত্যাশিতভাবেই প্রত্যাখ্যাত হন তিনি। অনেক চেষ্টা করেও প্রিয়তমাকে ঘরে আনতে পারেননি কখনো। সবকিছু উলোটপালট করে দিয়ে হঠাৎ করেই মডগন এক সৈনিকের সাথে সংসার পেতে বসে। পরবর্তীতে অন্য কোনো নারীর সঙ্গে ঘর বেঁধেও মনের মধ্য থেকে কবি মডগনকে সরাতে পারেননি। ‘ঘরেতে এলো না সেতো, মনে তার নিত্য আসা যাওয়া’। মৃত্যু অবধি তিনি এই দুঃখ ভুলতে পারেননি তিনি। তাঁর বহু লেখাতেও ঘুরে ফিরে ঠাঁই পেয়েছে সেই অগ্নিকন্যার স্মৃতির ছায়াশিস। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে, ২৮ জানুয়ারি সাউথ অব ফ্রান্সে মহান এই কবি শারীরিকভাবে পৃথিবীর সাথে সম্পর্কোচ্ছেদ করে চিরতরে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। কিন্তু বেঁচে আছেন আজও কবিতার খাতায় এবং পাঠকভক্তের স্মৃতির পাতায়।