আগামী জাতীয় নির্বাচন প্রার্থিতায় আগ্রহী পোশাক খাতের দুই ডজন ব্যবসায়ী

আপডেট: জুলাই ৯, ২০১৮, ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


সত্তরের দশক পর্যন্তও দেশের আইনসভায় ব্যবসায়ীরা ছিলেন প্রান্তিক। রাজনীতিক-আইনজীবীদেরই প্রাধান্য ছিল সংসদে। এর পর থেকেই চিত্রটা বদলাতে থাকে। ১৯৭৯ সালের আইনসভায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ছিলেন মাত্র ২৮ শতাংশ। ১৯৯১ থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সংসদেও তাদের প্রতিনিধিত্ব অর্ধেকের বেশি।
চলতি বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একাদশ সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনেও অংশ নেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। এদের অগ্রভাগে আছেন পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা। খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থিতায় আগ্রহ রয়েছে এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই ডজনের মতো ব্যবসায়ীর।
পোশাক শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, পোশাক শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্য রয়েছেন মোট ৩৭ জন। এর মধ্যে দশম জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন ১৪ জন। এ ১৪ জনসহ পোশাক খাতের আরো ছয় ব্যবসায়ীর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে, যারা আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান।
যদিও ব্যবসায়ী পরিচয় না দিলেও অনেকের নিজের ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যবসা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের (এমপি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনেক সংসদ সদস্যই আছেন, যাদের আয়ের মূল উৎস ব্যবসা। এর মধ্যে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারাও রয়েছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমাদের এখানে রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণ আবার ব্যবসার রাজনৈতিকীকরণ হয়েছে। সংসদ সদস্য হওয়া মানেই সব ধরনের ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আরো সম্পদশালী হওয়া। এর মাধ্যমে জনকল্যাণ কতটা হয়, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। ব্যক্তিস্বার্থই বেশি চরিতার্থ হয়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ভয়াবহ।
দশম জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন পোশাক শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ দারা। টঙ্গীর এহসান ফ্যাশন লিমিটেডের মালিকানায় আছেন তিনি। ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য একেএম রহমতুল্লাহও বস্ত্র ও পোশাক খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নারায়ণগঞ্জে তার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম এপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলস লিমিটেড। পোশাক খাতের এ তিন ব্যবসায়ী আগামী জাতীয় নির্বাচনেও প্রার্থিতায় আগ্রহী বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সসদ্য পরিবেশ ও বনমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদও যুক্ত পোশাক শিল্পের সঙ্গে। তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সাভারের গণকবাড়ীর শাশা গার্মেন্টস লিমিটেড।
ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আসলামুল হকেরও রয়েছে পোশাক ব্যবসা। তবে এ সংসদ সদস্যের কারখানাটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে বলে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। মিরপুর মাজার রোডে অবস্থিত তার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম অরবিটাল সোয়েটার লিমিটেড। তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদারের কারখানার নাম দ্য বেস্ট ডেনিম অ্যাপারেল লিমিটেড। একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দেখা যেতে পারে এ তিনজনকেও।

সিলেট-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য হলেন মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরী। পোশাক শিল্প সংগঠনের তালিকায় দেখা যায়, এ সংসদ সদস্য যুক্ত রয়েছেন, এমন পোশাক শিল্প-কারখানার নাম কুশিয়ারা কম্পোজিট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। সংগঠনের তালিকা অনুযায়ী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী মো. নসরুল হামিদও পোশাক শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা দেখানো হয়েছে, সেটি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় হামিদ সোয়েটার লিমিটেড। সংগঠনের তালিকায় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পরই আছে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের নাম। রাজশাহী-৬ আসনের এ সংসদ সদস্যের শিল্প-কারখানার নাম ইন্টারস্টফ অ্যাপারেলস লিমিটেড।
নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান পোশাক শিল্পের নিট খাতের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি। তার প্রতিষ্ঠানের নাম উইসডম অ্যাটায়ার্স লিমিটেড। চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য শামসুল হক চৌধুরীর পোশাক কারখানা চট্টগ্রামের জুবিলী রোডের রিচি অ্যাপারেল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। তবে কারখানাটি বর্তমানে বন্ধ আছে বলে বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে।
মহাখালীতে অবস্থিত ফাবিয়ান গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন তাজুল ইসলাম। এ ব্যবসায়ী কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি টিপু মুনশির পোশাক কারখানা তেজগাঁওয়ের সেপাল গার্মেন্টস লিমিটেড। রংপুর-৪ আসন থেকে বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন এ ব্যবসায়ী।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান সংসদের এ ১৪ জনই আগামী নির্বাচনেও অংশ নিতে চান। তাদের বাইরে আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী পোশাক খাতের আরো ছয় ব্যবসায়ী। এদের মধ্যে আছেন বিজিএমইএর বর্তমান সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানও। জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
ঢাকা-১৬ আসন থেকে প্রার্থিতায় আগ্রহী বিজিএমইএর বর্তমান পর্ষদের সহসভাপতি এসএম মান্নান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমিসহ পোশাক শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত আরো অনেক ব্যবসায়ী আছেন, যারা আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।
চট্টগ্রাম-১২ আসন থেকে বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন শামসুল হক চৌধুরী। এ আসন থেকেই প্রার্থী হতে আগ্রহী পোশাক খাতেরই আরেক ব্যবসায়ী বিজিএমইএর বর্তমান পর্ষদের সহসভাপতি মোহাম্মদ নাসির।
জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, পোশাক শিল্পের অনেক ব্যবসায়ীই আছেন, যারা সাবেক ও বর্তমান সংসদের সদস্য। আগামী নির্বাচনেও এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। বর্তমান সংসদ সদস্য ও আগামী সংসদের সদস্য হতে আগ্রহী পোশাক শিল্পের এমন ব্যবসায়ীর সংখ্যা দুই ডজনের মতো।
চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রার্থিতার আগ্রহ দেখিয়েছেন বিজিএমইএর বর্তমান পর্ষদের সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান। খুলনা সদর থেকে নির্বাচনে আগ্রহী বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী।
সাবেক সহসভাপতি এএইচ আসলাম সানির নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহের বিষয়টিও নিশ্চিত করেছে বিকেএমইএ। এছাড়া আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিকল্পনা করছেন টাঙ্গাইল-২ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আসাদুজ্জামানের ছেলে খন্দকার মশিউজ্জামান রোমেল।
দশম জাতীয় সংসদের সদস্য ও পোশাক শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত, এমন উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের কেউই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। কেউ কেউ মন্তব্য করলেও মনোনয়ন প্রত্যাশা ও জনপ্রতিনিধিত্বের আগ্রহ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি। একজন সংসদ সদস্য দাবি করেন, তার পরিবারের একজন সদস্য যুক্ত থাকলেও তিনি কোনো পোশাক শিল্প-কারখানার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।
পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের সংসদে প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রবণতা তেমন একটা দেখা যায় না। কিন্তু আমাদের দেশে ব্যবসায়ীরা সরাসরি রাজনীতিতে আসছেন ব্যবসায় আরো উন্নতির লক্ষ্যে। এ প্রবণতা শুধু পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের নয়, অন্যান্য খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আছে। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা