আগামী নির্বাচন : আমেরিকা ও বিএনপি এক সুর

আপডেট: জুলাই ১০, ২০১৮, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


সংবাদপত্রের পাঠকমাত্রই দেখে থাকবেন, বাংলাদেশে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত বার্নিকোট নির্বাচন নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন, যা শিষ্টাচার বর্জিত। অসভ্যতা এবং অন্ধ পক্ষপাতদুষ্টও বটে। বাংলাদেশের সরকার বা সরকারের প্রতিনিধি আমেরিকার কিংবা অন্য কোনো দেশের নির্বাচন নিয়ে এমন শিষ্টাচার বর্জিত এবং মিথ্যোচার কখনো করেননি। কারণ তা অশোভন এবং ভদ্রতার ভূগোল-সীমায় পড়ে না। গত বছর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে গোপনে রাশিয়ার সহযোগিতার অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার কোনো মন্তব্য করেননি। কিন্তু বিশে^র বৃহত্তর ও প্রভাবশালী সংবাদ প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ দিয়ে আমাদের দেশেও সে সম্পর্কে নানা মন্তব্য নিয়মিত প্রচারিত হচ্ছে। গত ৬ জুলাইয়ের ‘দৈনিক সংবাদ’-এর তৃতীয় পৃষ্ঠায় সে সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে। তাহলে বার্নিকোট কেনো আর কোন্ শিক্ষা থেকে এমন মন্তব্য করলেন? কারণ তারা যতোটা না মানবিক ততোটাই উৎপীড়ক। বিশে^র দেশে দেশে সে সাক্ষ্য তারা যোগ্যতার সঙ্গেই রেখেছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পর্কিত মন্তব্য তাই মিথ্যেচার বলে বাঙালি সমাজ মনে করে। কারণ তারা সবখানে তাদের মোড়লির ছাপ রাখতে চায়। অর্থে-বিত্তে-বৈভবে তারা শক্তিমান ভেবে এমন খবরদারি সবখানে করতে যায়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা তারা করেছিলো। কিন্তু সাফল্যলাভে ব্যর্থ হয়। আবার আমাদের ‘পদ্মাসেতু’ নির্মাণেও তারা বিশ^ ব্যাংকসহ অন্যান্য অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক আচরণের মধ্যে দিয়ে প্রতিবন্ধকতার প্রাচীর তুলেছিলো। সে ক্ষেত্রেও তারা সাফল্য লাভে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশ নিজের শক্তি ও সাহসে ‘পদ্মাসেতু’ নির্মাণ করছে। আমেরিকা কখনো কোনো দেশের সাফল্য-উন্নয়ন শুভ দৃষ্টিতে দেখে না। ইরান, উত্তর কোরিয়া আণবিক বোমা তৈরি করবে কি না সেটা তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হলেও আমেরিকা সে দেশগুলোয় নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু তার মিত্র ইসরায়েল-সৌদি আবার নিরস্ত্র জনগণেও অপর আধুনিক অস্ত্র প্রয়োগ করলেও তা বিরুদ্ধে আমেরিকা কখনো টুঁ শব্দটি করেনি। বরং খুনিদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাদের অস্ত্র বিক্রি করছে। করছে হাজার হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য। বাংলাদেশ বিশে^র সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি করতে চায়। যুদ্ধ চায় না। শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে। তাই আমাদের অস্ত্র অভ্যন্তরীণ শান্তি রক্ষার ব্যতীত প্রয়োজন হয় না। আমেরিকা তাতে নাখোশ। তারা মায়ানমারের সঙ্গে একটা যুদ্ধেও আবহাওয়া তৈরির চেষ্টা করেছিলো। কয়েক লক্ষ আরাকানবাসী এখন বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হয়ে বাস করছে। খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ত্রাণ সৌদিও দেয়নি আমেরিকায়ও না। অথচ উদ্বাস্তুদের ৯৯ শতাংশই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। সৌদির এতোটাই ইসলাম প্রীতি যে তারা ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জীবন-জীবিকার বিরুদ্ধে সব সময়ই অবস্থান নিতে ভালোবাসে। ভালোবাসার কারণ আমেরিকাকে নাখোশ না করা। আমেরিকার মোড়লির কাছে আনুগত্য ও অধীনতা স্বীকার করা। মুক্তিযুদ্ধে এবং যুদ্ধে বাঙালির বিজয়কেও আমেরিকার মতো সৌদি আরব ভালো চোখে দেখেনি। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যা পর তারা চিনের মতো বাংলাদেশের অস্তিত্ব স্বীকার করে। বিধায় তাদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কোনো দলকেই সমর্থন করে না। বার্নিকোট তারই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তার বক্তব্যে।
তার কথার সঙ্গে বিএনপি-জামাতের অভিযোগের শব্দাবলি ও উদ্দেশ্য অভিন্ন। এটা কোনো কূটনীতিকের দায়িত্ব ও আচরণ নয়, নির্লজ্য পক্ষপাত। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগেও আমেরিকার রাষ্ট্রদূত শিষ্টাচার বর্জিত আচরণ করেছিলেন। তিনি উপযাচক হয়ে ভারতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে একটা সমঝোতা করতে, যা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। ভারত সরকারের কোনো প্রতিনিধি তার সঙ্গে কথা বলেননি এমন কি তাকে প্রয়োজনীয় প্রটোকলও দেননি। ফলে তিনি ব্যর্থ হয়ে দিল্লি থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। আমেরিকার যেমন মাথা ব্যথা উত্তর কোরিয়া কেনো আণবিক অস্ত্র তৈরি করবে। যা করবে একা তারা। শক্তিশালী ও বিত্তবান হবে একা তারা। তাদের সমকক্ষ হওয়া যাবে না। গেলেই সেখানে তারা বাধার সৃষ্টি করবে। যেমন ইরান কেনো অস্ত্র বানাবে? সেখানে বাধা এবং নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করা। বিশ^-মোড়ল থাকতে হতে চায় তারা। অথচ তাদের দেশে ট্রাম্প বিরোধী আন্দোলন চলছে, নিজেদের অস্তিত্ব আজকে সংকটাপন্ন, সেটা না ভেবে তারা অন্য দেশের উন্নয়ন, নির্বাচন, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছে, যা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা কি ভাবে সরকার গঠন করবো, কি ভাবে দেশ পরিচালনা করবো, তা নিয়ে তারা কেনো উপদ্রপ করছে? তাদের মোসাহেব-খোশামুদে হওয়াটা কি সম্মনজনক? চিনের মতো এই আমেরিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের অন্যতম। তারা দেখের লজ্জা পায়নি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি নির্মমভাবে বাঙালি হত্যা-ধর্ষণ আর লুটপাট করেছে একাত্তরে। তারপরও তারা পাকিস্তানি ঘাতক-ধর্ষকদের সমর্থন দিয়েছিলো। করেছিলো বাঙালি হত্যার জন্যে অস্ত্র সরবরাহ। এদের পক্ষে কি অবস্থান করা যায়? করলে বাঙালির অস্তিত্ব সৌদি সরকারের মতো জ¦ী হুজুর হতে হবে। জনগণকেও তারা দাস বানিয়ে রাখবে। করবে মোড়লি আর সব কাজে করকে অহেতুক হস্তক্ষেপ। ত্রিশ লক্ষ বাঙালির আত্মদানে অর্জিত একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এটা মেনে নেয়া যায় না। তাই বার্নিকোট হোন আর যে কেউ হোন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ মেনে নেয়া মানে তাদের বশ্যতা স্বীকার করা। এ দেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের কাছে দেশের উন্নয়ন, শান্তি ও সৌভ্রাতৃত্বকে বন্ধক দেয়া। ধর্মান্ধতা আর সাম্প্রদায়িকতা সমর্থন জানানো। বাঙালি আমেরিকার কেনো যে কোনো দেশের খবরদারি মানে না।
বাংলাদেশের কিছু পত্র-পত্রিকা বাদে অধিকাংশ সংবাদপত্রেই প্রতিদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী ঘটনা এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার তথ্যচিত্র পরিবেশিত হয়। সেগুলো কি বিচারহীনতার সংস্কৃতি নয়? সেগুলো কি ভদ্রতা-সভ্যতার পরিচয় জ্ঞাপক? তা যদি না হয় তাহলে তারা কেনো অন্য একটি দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলে? তাদের এই নগ্ন ও অভদ্রসুলভ আচরণ কোনো ক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সম্প্রতি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পণ্যের ওপর শুল্ক বসিয়েছে। তারা রাশিয়া ও চিনের পণ্যের ওপরও বাড়তি শুল্ক বসিয়ে নিজেরাই বিপাকে পড়েছে। কারণ এই দেশগুলোও আবার আমেরিকার পণ্যের ওপর শুল্ক বসিয়েছে। এই আমেরিকা রুশ কূটনীতিকদেরও বহিস্কার করে বিপাকে পড়ে। কারণ রাশিয়া পাল্টা আমেরিকান কূটনীতিদের বের করে দেয়। তারা কেবল বিশ^ময় মোড়লি করবে, অন্য কাউকে সঙ্গে নেবে না। তারা জানে নিশ্চয়ই যে বিশ^ এখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়েছে, একমাত্র সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী তারাই নয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তা প্রমাণিতও হয়েছে। পাকিস্তানিদের সমর্থনে তারা সপ্তম নৌ-বহর পাঠানোর উদ্যোগ নিলে সোভিয়েত ইউনিয়নও নবম নৌ-বহর পাঠনোর হুমকি দিলে তারা লেজ গুটিয়ে ফেলে। আসলে আজকের আমেরিকা কাগুজে বাঘ। তার বেশি নয়। বার্নিকোটের বিরূপ মন্তব্য এবং বাঙালিদের ওপর খবরদারি সে কারণে হাস্যস্পদ হবে। কিন সিটি নির্বাচনের ফলাফল এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল এই বক্তব্যেকেই সমর্থন দেবে। কারণ বাঙালি একাত্তরের ভয়াবহতা-নিষ্ঠুরতার কথা ভোলেনি। যাদের বর্বরতার কারণে বাঙালি একাত্তরে অগ্নিগর্ভ সময় অতিক্রম করে একটি দেশ অর্জন করে, তার ত্যাগ, অবদান বিস্মৃত হয়নি। তাই বিএনপি-জামাত যতোই বিদেশি বন্ধুদের সহযোগিতা ও কুমন্ত্র নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হোক না কেনো, তারা গণবিরোধী এবং দেশ বিরোধী অপবাদ থেকে নিস্কৃতি পাবে না। সিটি নির্বাচনগুলো সে তথ্যই জনগণকে দিচ্ছে। আজকে তাই বিএনপি-আমেরিকার ষড়যন্ত্র একাত্তরের মতোই উপে যাবে। প্রতিদিন আমেরিকায় খুনোখুনি হয়, ধর্ষিত হয় অসংখ্য নারী, হয় লুটপাট, সেগুলো কতোটা মানবিক পরিবেশের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা বিশ^বাসী জানে। বাঙালি আমেরিকা ও বিএনপির অভিন্ন সুরের জবাব ব্যালটে দেবে। কোনো রাষ্ট্রের দূতাবাসের কথায় নয়।