আজও ঘুরে বেড়ায় হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রেরা

আপডেট: নভেম্বর ১৫, ২০১৭, ১:২৫ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


সেই ১৯৭২ সালে যার কলম চলতে শুরু করেছিল ২০১২-তে এসে তা থামলো। ততদিনে তিনি রাঙিয়ে দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের আকাশ। তিনি লিখেছেন অবিরাম, সৃষ্টি করেছেন কালজয়ী বহু চরিত্র। যাদের হাত ধরে তিনি তৈরি করেছেন কোটি কোটি পাঠক। সেই লেখকের নাম হুমায়ূন আহমেদ। কেউ কেউ তাকে বাংলা সাহিত্যের বাদশাহ হুমায়ূন বলেও ডাকেন।
১৩ নভেম্বরে বেঁচে থাকলে ৭০ বছরে পা রাখতেন হুমায়ূন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি নেই, কিন্ত দেশ-বিদেশে হুমায়ূন ভক্তরা নানা আয়োনে আর শ্রদ্ধার স্মরণে পালন করেছেন প্রিয় লেখকের জন্মদিন।
হৃদয়কে হলুদ রঙে রাঙিয়ে, দিন-রাত খালি পায়ে রাজপথে হেটে বেড়ায় তরুণরা। আবার, নীল রঙা অপেক্ষার আনন্দে পথের গল্পে মিশে থাকে হাজার তরুণীর উদাস দৃষ্টি। এভাবেই সাধারনের মধ্যেও, অসাধারনভাবে দেখা মেলে হুমায়ূন আহমেদের কালজয়ী চরিত্রগুলোর ‘এসব দিনরাত্রি’র গল্প। এ গল্পের চরিত্রেরা উঠে এসেছিল নাটকেও। পেয়েছিলো দুর্দান্ত জনপ্রিয়তা।
খালি পায়ে পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবী পড়ে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুড়ে বেড়ায় হিমু। সেই মানুষটির সঙ্গে নাকি মিল রয়েছে লেখকের বাবার। এ কারণেই হয়তোবা হিমুর কোনো বাহ্যিক বর্ণনা দেননি লেখনিতে। দিনের পর দিন তিনি হিমুকে প্রাণ দিয়েছেন বৈচিত্রতায়।
৯০ দশক থেকে এ ‘হিমু’ ভাইরাসে আক্রান্ত হতে আছে এদেশের তরুনরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ‘হিমু’ হতে চেয়ে খালি পায়ে পিচ ঢালা পথে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতাটা নিয়েছেন অনেকে। হিমুর প্রথম বইয়ের নাম ‘ময়ূরাক্ষী’।
নাটকে সরাসরি ‘হিমু’ চরিত্রে কেউ অভিনয় করেননি। তবে হিমু সেজেছেন, বা হিমু হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে অভিনয় করা চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম আজ রবিবার নাটকের ‘তুহিন’। তুহিনের সাজসজ্জা হিমুর দৃশ্যমান রূপের অভাব অনেকটা পূরন করেছে। এছাড়া মোশাররফ করিমও সম্প্রতি নাটকে ‘হিমু’ সেজেছেন।
তবে হুমায়ূন আহমেদের সেলুলয়েডের ফিতায় ‘দুই দুয়ারী’ ছবিতে রহস্যমানব চরিত্রটিকে অনেকেই হিমুর সঙ্গেই মিলিয়ে ফেলেন। মনে হয় হিমুরই ছায়া নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ চরিত্রটি উপস্থাপন করেছেন। সেদিক থেকে বইয়ের মতো সিনেমাতেও নন্দিত হলো হিমু। সেই চরিত্রে অভিনয় করে প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নিয়েছিলেন অভিনেতা রিয়াজ।
হিমুর হলুদ থেকে পুরোটাই আলাদা মিসির আলী। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার ফার্গো শহরে ভ্রমণের সময় রহস্যময় যে চরিত্রের জন্ম দেন হুমায়ূন আহমেদ। মোটা ফ্রেমের ভারী চশমা পরিহিত লোকটি কিছুতেই বিশ্বাস করেন না অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা। যতো রহস্যময় ঘটনাই ঘটুক যুক্তি দিয়ে তার সমাধান খুঁজে নেন। এই যুক্তিবাদী মানুষটির নাম ‘মিসির আলী’। হিমু’র ঠিক বিপরীত। হিমু যেমন যুক্তি মানে না, মিসির আলী আবার যুক্তির বাইরে হাঁটেন না। নিজের তৈরি করা চরিত্রগুলোর মধ্যে ‘মিসির আলী’ই হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে প্রিয়। যদিও, কথা জাদুকর কখনো কখনো বলতেন তিনিই মিসির আলী। এ বাস্তববাদী চরিত্রটিকেও দেখা গেছে অনেকবার টিভি নাটকের পর্দায়।
এদিকে, স্বপ্নবাজ সেই কানাবাবা শুভ্রকে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন পৃথীবির শুদ্ধতম মানবের প্রতিচ্ছবি রূপে। যার জন্ম অনেক বছর আগে লেখকের ‘সাদা গাড়ি’ নামক গল্পে। কখনো কখনো হুমায়ুন আহমেদ সেই শুদ্ধতার জলকাব্যে ভাসতে দেখেছেন নিজেকেও। চলচ্চিত্রে হুমায়ূনের শুভ্রকে দর্শকের সামনে হাজির করেছিলেন তৌকীর আহমেদ। ‘দারুচিনি দ্বীপ’ ছবিতে এই চরিত্রে আমরা পেয়েছি রিয়াজকে।
চিরাচরিত প্রেমিকা হয়ে প্রেমিকের অন্তরে আরাধ্য লাইলি, রজকিনী, ক্লিওপেট্রা, হেলেন, বনলাতা সেনেরা। তাদের ভিড়ে হুমায়ন নিয়ে এলেন রুপাকে। এ নারী মায়াবতী। আবার বাউ-ুলে হিমুকে অনেক ভালোবাসে রুপা, এই ভালোবাসা তাকে দু:খবতীও করেছে। অল্পতেই চোখ টলমল করে পানিতে; কিন্তু খুব কম কাঁদে সে।
নীল শাড়ি যাকে দিয়েছে অমরত্ব। নতুন যুগের প্রেমিকের কল্পনার প্রেমিকা চরিত্র রুপা। হিমু সিরিজের গল্পে রুপার উপস্থিতি হয় সাধারণত স্বল্প সময়ের জন্য। কিন্তু ওই স্বল্প সময়েই পাঠকদের মন জয় করে নেয় রুপা। সেই রুপার রুপক ছবিটাকে এখনও খুঁজে বেড়ায় পাঠকমন।
আর গাঁয়ের মেয়ে জরী? নাগরিক জীবনে দায়িত্ব সয়ে সয়ে ক্ষয় হতে থাকা সেই মোনা- আজও দাগ কেটে যায় পাঠকের অন্তরে। বাকের ভাইয়ের মৃত্যুতে মোনার অব্যক্ত কষ্টগুলো আজও কাঁদায়। আজও বহু প্রেমিক সেই কষ্টের ভার নিতে চায়। খুঁজে বেড়ায় মোনাকে। যদিও বা তার সন্ধান মেলে না। তবে টিভির পর্দায় সুবর্ণ মুস্তাফা মোনাকে দেখে সেই তৃপ্তি নেন কেউ কেউ। তিনিও আর মোনাকে ছাপিয়ে যেতে পারেন নি। হয়তো চাননিও কোনোদিন।
তবে হুমায়ূনের সৃষ্ট চরিত্র নিয়ে বলতে গেলে সব আবেগ থমকে দাঁড়ায় বাকের ভাইয়ের সামনে। যে চরিত্রের ফাঁসিতে হয়েছিলো মিছিল,সমাবেশ, বিক্ষোভ। এ এক বিরল ইতিহাস। যে ইতিহাসের সম্মানে আজও স্নাত হন ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে এই চরিত্রে রুপদান করা অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর। কিংবা বলা যেতে পরে আনিসের কথা। বোকাসোকা ভাব ধরে থাকা ব্রিলিয়ান্ট আর চালাক সেই ছেলেটা। ‘আজ রবিবার’ নাটকে এই চরিত্রে এসেছিলেন জাহিদ হাসান। বলা চলেই সেই তো উত্থান এ অভিনেতার।
কালজয় করেই ফিরে আসে ‘অয়োময়’র ছোট মীজা, লবঙ্গরা। ‘বহুব্রিহী’র ছোট মামাও বিস্মৃত নন, ‘তুই রাজাকার’ স্লোগানের খাতিরে। ‘আজ রবিবার’র ছোট চাচাকে কোনোদিন ভুলতে পারবে এই দেশের পাঠক বা দর্শক? ‘নক্ষত্রের রাত’ সেই হাসান। পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখতে যে যুবক নিজের কিডনি বিক্রি করে দেবার মানসে শহরে পা রাখে ক্রমেই তাকে দেখা যায় একজন দার্শনিক হয়ে উঠতে। যার কাছে দু:খগুলো সুখের অনুপ্রেরণা হয় আর আনন্দগুলো ধরা দেয় দু:খের আগমনী সতর্কতা হিসেবে।
এমনসব শত শত চরিত্ররা আজো বাঁচিয়ে রেখেছে বাদশাহ নামদারকে। তার সৃষ্ট সব চরিত্রেই যেন তিনি নিজের রৌদ্রজ্জ্বল ছায়া রেখে গেছেন। লেখকের কাছের মানুষদের গল্পে তারই প্রমাণ মেলে। হুমায়ূন আহমেদ ব্যক্তিটাও ছিলেন বহুমাত্রিক, বর্ণিল।
পাখি উড়ে যায় ফেলে যায় পালক’ জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের অনেক উপন্যাসেই এই কথাটি পাওয়া যায়। মানুষ হুমায়ূন আহমেদ নেই। কিন্তু লেখক হুমায়ূন আহমেদ অমর। তার কালজয়ী চরিত্রগুলো অম্লানভাবে টিকে আছে। ঘুরে বেড়ায় এ শহরে, ও শহরে।-জাগোনিউজ