আজ বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস ডায়াবেটিসকে নয় ভয়, সচেতনতার হোক জয়

আপডেট: নভেম্বর ১৪, ২০১৯, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

খন রঞ্জন রায়


বিশুদ্ধ বাংলায় প্রাচীনকাল থেকে ‘মধুমেহ’ নামে শরীরের যে উপসর্গ সেটিই হাল আমলের বিশ্বব্যাপি মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী ‘ডায়াবেটিস’ বা বহুমূত্র। প্রধান উপসর্গ মূত্রাধিক্য। মূত্র বেশি হলে স্বভাবতই শরীরে পানিশূন্যতা হয়। ফলাফল অতিতৃষ্ণা। ডাক্তারি ভাষায় শরীরবৃত্তিয় এই ঘটনাসমূহ মেলিটাস, ইনসিপিডাস, এডিএইচ, অ্যান্টিভাইইউরেটিক হরমোনের ক্রিয়াকলাপের ফলশ্রুতি মূলত ‘ডায়াবেটিস’। মানবদেহযন্ত্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ লিভার বা যকৃত। এর নিচের দিকে অগ্ন্যাশয় নামে একটি প্রত্যঙ্গ আছে। ওখান থেকে এক ধরনের রস নির্গত হয়ে গ্রহণকৃত খাবারকে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরের শক্তি উৎপাদন করে। পরিস্কার করে বললে অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত রসের নাম ইনসুলিন। এটি একটি হরমোন। এর সহায়তায় মানবদেহের কোষগুলি রক্ত থেকে শর্করা বা গ্লুকোজ বা চিনিজাতীয় শক্তি শোষণ করে। দেহ চলাচল উপযোগী হয়। সেই অগ্ন্যাশয় যদি পরিমাণমত যথেষ্ট অগ্নিরস বা ইনসুলিন উৎপন্ন করতে না পারে তবে রক্তে শর্করা বা চিনির আধিক্য দেখা দেয়।
মানবশরীরযন্ত্রে সুনির্দিষ্টমাত্রার অধিক চিনির উপস্থিতিই ‘ডায়াবেটিস’। এর মূল কারণ অগ্নাশয়ের ইনসুলিন। এটিকে সঠিক মাত্রার নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে মানবশরীরে ঘটে নানা জটিলতা। দেহের কোষকলার শক্তি কমে আসে। অক্সিজেন নিতে অসমর্থ হয়। অক্সিজেনের অভাবে দেহকোষ মরতে থাকে। ফল হয় শরীরের নানা যন্ত্রপাতির বিকলঙ্গতা। যেটি বিবিধ উপসর্গ বা অসুখ-বিসুখের ফলাফল। অগ্নাশয়ের অগ্নিরস বা ইনসুলিন নিঃসৃত তারতম্যের কারণে ডায়াবেটিসকে দুইভাগে বিভক্ত করা যায়। একটি ডায়াবেটিস মেলিটাস অন্যটি ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস। তবে এই দুই ডায়াবেটিসের ক্রিয়াকলাপ বিপরীতমুখি। পরেরটির ক্ষেত্রেই মূত্রাধিক্যের কারণ। তবে মানবদেহে বিশ্বব্যাপিই প্রথমটি বা ডায়াবেটিস মেলাটাসের প্রকোপ অনেক বেশি। চিকিৎসা সহায়তা ও মাত্রা নির্ভরতার উপর ভর করে ডায়াবেটিস মেলাটাইসকে দুই ধরনের ভাগ করা হয়েছে। একটি টাইপ-১, অন্যটি টাইপ-২।
টাইপ-১ রোগে অগ্নাশয়ের ইনসুলিন নিঃসরণকারী কোষগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে ধীরে ধীরে শরীরের প্রয়োজনীয় মাত্রার ইনসুলিন উৎপাদন কমতে থাকে। রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে কৃত্রিম ইনসুলিন ইনজেকশন আকারে শরীরে প্রবাহিত করা লাগে। একে অটোইমিউন বলা হয়। জন্মগত হরমোন তারতম্যের কারণে সাধারণত শিশু তরুণদের মধ্যে এই মধুমেহ অধিক হয়। জন্ম থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যেই তা ধরা পড়ে।
টাইপ-২ ডায়াবেটিস মূলত ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। এধরনের রোগীরা নিঃসৃত অগ্নিরস যথাযথভাবে শরীরে শোষণ করতে পারে না। উদ্বৃত্ত থেকে যায়। ফলে শরীরে সুগারের মাত্রা বেড়ে যায়। প্রাথমিক অবস্থায় কায়িকশ্রম, ব্যায়াম এবং খাদ্যবিধির উপর নির্ভর করে একে মোকাবিলা করা যায়। সাধারণত ৪০ বছর বয়সের পর এই ধরনের বহুমূত্রের আক্রমণ শুরু হয়। তবে স্বল্প ক্ষেত্রে শিশু ও তরুণদেরও হতে পারে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডায়াবেটিস রোগীর ৯০ শতাংশই হলো টাইপ-২।
এর সুনির্দিষ্ট কারণও রয়েছে। বিশ্বব্যাপি মানুষের খাদ্যাভাস ও জীবনযাত্রা যন্ত্রনির্ভর হয়েছে। শারীরিক শ্রম কমে গেছে। ডায়াবেটিসকে উস্কে দেয় এমন খাবার সহজলভ্য হয়েছে। মিষ্টি ও মিষ্টি জাতীয় খাবারের দোকানঘর এখন অলি-গলি, ঘাট, ফুটপাত সয়লাব হয়েছে। কেনার সামর্থ্য বাড়াটাও অন্যতম প্রধান কারণ। ডায়াবেটিস রোগের প্রধান উপসর্গ যেহেতু অতিশয় দুর্বলতা, সার্বক্ষণিক ক্ষুধা, অধিক তৃষ্ণা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। ফলে খাবারের প্রতি অধিক আগ্রহ হওয়াটাও স্বাভাবিক। খাদ্য গ্রহণে চিকিৎসক নির্দেশনার সচেতনতা, জীবনধারার পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম- সর্বপোরি এই রোগ সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত ধারণা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের শ্রেষ্ঠ উপায়। অতিরিক্ত, অনেকদিন ধরে রক্তে শর্করা বা চিনির উপস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত থাকলে মানবযন্ত্রে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা সৃষ্টি হয়। জীবনমান এলামেলো হয়। কোমল কোষীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহ খুব দ্রুত আক্রান্ত হয়। হৃদপিণ্ডের রোগ, মস্তিস্কের প্রদাহ স্ট্রোক, কিডনি বিকলতা, চোখের নানা উপসর্গ, অন্ধত্ব হওয়ার মতো জটিলতা সৃষ্টি খুব স্বাভাবিক ঘটনা।
সারা বিশ্বে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, স্থুলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ডায়াবেটিস আক্রান্তের পরিমাণ দ্রুত নাগালের বাইরে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশসমূহের মধ্যে ভারত, চিন, ইন্দোনেশিয়া উন্নতরাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান ডায়াবেটিস রোগীর দিক দিয়ে শীর্ষস্থান দখল করছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে ডায়াবেটিসকে বৈশ্বিক মহামারি হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সাবধান/সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে।
এই রোগ সর্ম্পকে ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্ধে ঐতিহাসিক প্রাচীন মিশরীয় লিপিতে উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতীয় আর্য়ুবেদ চিকিৎসকগণও এই রোগটির অস্তিত্ব খুঁজে পান এবং সংস্কৃতভাষার সাথে মিল রেখে এর নাম দিয়েছিলেন ‘মধুমেহ’। গ্রিক চিকিৎসক অ্যাপোলোনিয়াস খ্রিস্টপূর্ব ২৩০ অব্দে এই রোগটিতে ‘ডায়াবেটিস’ নামে অভিহিত করেন। ৪০০ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় আর্য়ুবেদ চিকিৎসক সুশ্রুত এবং চরক ডায়াবেটিসকে টাইপ-১ ও টাইপ-২ হিসাবে চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। ডায়াবেটিস আক্রান্তের নানা জটিল-কুটিল দীর্ঘ যাত্রাপথে অধ্যয়ন গবেষণায় নির্ভরশীল চিকিৎসাসূত্র ইনসুলিন আবিষ্কার করেন কানাডীয় দুই বিজ্ঞানী ফ্রেডবিক গ্রান্ট বেনটিং ১৯২১ সালে ও চার্লস বেস্ট ১৯২২ সালে। তবে এই দুই কৃতি বিজ্ঞানীকে ১৯২৩ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকৃত ডায়াবেটিস, মহামারি বাংলাদেশকেও বেশ বড় ঝাঁকুনি দিচ্ছে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ৭ শতাংশ সরাসরি ‘ডায়াবেটিস’ এ আক্রান্ত। ২০১৮ সালের হিসাবে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৭.১ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুভীতির ব্যয়বহুল এই রোগে আক্রান্ত। ‘বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি’ তাদের গবেষণায় কৌশলপত্র প্রণয়ন করে দেখিয়েছেন যে, আগামী ২০৪৫ সালের মধ্যে এখানে আক্রান্তের সংখ্যা হবে ১৩.৭ মিলিয়ন। ‘ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিক ফেডারেশন’ বলছে বর্তমানে যাঁরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে তার ৮০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের মানুষ। তাদের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভাস রীতির খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।
উদ্বেগের সাথে বলতে হয় আমাদের দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষই জানেন না, যে তিনি সারা জীবনের জন্য বয়ে বেড়াচ্ছেন মৃত্যুঝুঁকির ‘ডায়াবেটিস’। দুর্ভাগ্য এখানে যে যারা জানেন যে নিজে আক্রান্ত তাদের মধ্যে ৫৭ শতাংশকে রোগের সঠিক জ্ঞান ও সুচিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হয় নি। বৈশ্বিক পরিস্থিতিও খুব সুখকর নয়। সারা বিশ্বে প্রতিবছর ১০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে শুধু ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের অজ্ঞানতার জন্য। বিভিন্ন মাত্রার ডায়াবেটিসের জন্য উপসর্গ মোতাবেক চিকিৎসকগণ বিশেষ দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। কায়িকশ্রম, খাদ্যনিয়ন্ত্রণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন, পরিমিত সহনীয় মাত্রার খাওয়ার ওষুধ দিয়ে ডায়াবেটিস রোগকে আত্মনিয়ন্ত্রের চেষ্টা করেন। যদিও সব রোগীর বেলায় তা প্রযোজ্য হয় না। যাদের শরীর যন্ত্র থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসুলিন তৈরি হয় না, কারো ক্ষেত্রে নিঃসরিত ইনসুলিন কোষঝিল্লিতে পর্যাপ্ত থাকলে তা শোষণের মতো শারীরিক সক্ষমতা থাকে না, নিয়ত-প্রতিনিয়ত আবিষ্কৃত ও সংযোজিত অত্যাধুনিক পরীক্ষা নিরীক্ষা ও শারীরিক গঠনপ্রণালী পর্যালোচনা করে চিকিৎসক ইনসুলিনকেই নির্ভরশীল মনে করেন। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজির সর্বাধুনিক গবেষণায় সাশ্রয়ী দামের ও অধিক মানের হিউম্যান ইনসুলিন তৈরি করা হচ্ছে। মানুষের ডিএনএ থেকে জেনেটিক সংগ্রহ করে ব্যাকটেরিয়া সংযোজনের মাধ্যমে দ্রুত বংশ বৃদ্ধির করে আধুনিক সফল কার্যকর ব্যবহারউপযোগী ইনসুলিন বোতলজাত করা হয় বলেই এর নাম হিউম্যান ইনসুলিন।
ইনসুলিন আবিস্কারের আগে সারা পৃথিবীতে হাজার-লক্ষ মানুষ হতাশার সাথে আক্ষেপ নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে। বর্তমান মহামারি আকার ধারণ করা এই রোগও আবিষ্কৃত ইনসুলিনের কল্যাণে সুস্থ স্বাভাবিক নিরাপদ জীবন উপভোগ করছে। রোগাক্রান্ত হয়েও নির্ভয়-নির্বিঘ্ন জীবনযাপনের নির্ভরতার প্রতীক ইনুসুলিন আবিষ্কারক ফেডরিক বেনটিং এর জন্মদিন ১৪ নভেম্বর। তার স্মৃতিকে মধুময় করে বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯১ সাল থেকে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস পালনের নির্দেশনা দেয়। সুনির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে সারা পৃথিবীর স্বাস্থ্যসচেতন জনগণ, সরকার, বিভিন্ন সংস্থা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করে এই দিবস। ডায়াবেটিস প্রতিরোধের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন জনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্য শতভাগ পূর্ণতা পাক, ডায়াবেটিস পরাভূত হোক, ডায়াবেটিসের বিরুদ্ধে লড়াই হোক সফলতার- এই প্রত্যাশায় পালন হচ্ছে এবারের ‘বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস’।
লেখক: টেকসই উন্নয়ন কর্মী
[email protected]