আজ বিশ্ব বাবা দিবস

আপডেট: জুন ১৬, ২০১৯, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

সৌরভ সোহরাব


ছোট বেলায় একবার আমার ভীষণ জ্বর হলো। জ্বরে কাঁপতে লাগলাম। তখন আমার বয়স ৭ কি ৮ বছর। গ্রামের ডাক্তার কবিরাজ দেখানো হলো। জ্বর কমলো না। এভাবে ৭-৮ দিন পর গ্রামের ডাক্তার কবিরাজ আর পারবেন না বলে জবাব দিলেন। বাবা-মা দুজনেই চিন্তায় পড়লেন সন্তানকে নিয়ে কোথায় যাবেন। মা বললেন, বড় ডাক্তারের কাছে যাও।
সেসময় আমাদের এলাকায় নাম করা এক ডাক্তার ছিলেন। তাঁকেই সবাই বড় ডাক্তার নামে চিনত। মূলত সে ছিল ডিপ্লোমা পাস ডাক্তার। নাম রাজ্জাক ডাক্তার। বাড়ি বিল দহর বাজারে। আমার গ্রাম থেকে প্রায় ১৫ কি.মি. পথ। রাস্তা-ঘাট নেই। চলনবিলের ডাহিয়া ও বেড়াবাড়ির বিলের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার কোনো রাস্তা নাই। বাবা আমাকে কাঁধে নিয়ে ছুটলেন সেই বিলদহর বাজারে। তখন আষাঢ-শ্রাবণ মাস। বিল ভর্তি পানি। বাবা এক বুক পানি অতিক্রম করেই আমাকে নিয়ে হাঁটছেন। আমি জ্বরের শরীরে বিলে অথৈ পানির দৃশ্য দেখছি। ঢেউয়ের তালে ভেসে উঠছে ছোট বড় অসংখ্য শশুক। উপুর করা কালো পাতিলের মত ডুবছে আর উঠছে। বাবা খুব সাহসী ছিলেন। আমাকে বললেন, কাঁধে চেপে বস। ভয় পাস না। এই শশুক আমাদের কিছুই বলবে না। এভাবে বিলের পানি আর কাদার রাস্তা পাড়ি দিয়ে বিলদহর রাজ্জাক ডাক্তারের চেম্বারে উপস্থিত হলাম। চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। কয়েক দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে গেলাম।
প্রায় ৩০ বছর পর এসে বাবা আমার জীবনে এক করুণট্রাজেডি হয়ে উঠলেন। বাবার বয়স তখন ৬৪ বছর আর আমার বয়স ৩৮। সেই ট্রাজেডির ঘটনাটি বলি, ২০১৫ সালের শুরুতেই বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বগুড়ায় ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার পরীক্ষা-নীরিক্ষা দিলেন। পরীক্ষার রিপোর্ট আসতে সময় লাগলো। এর মধ্যে ডাক্তার প্রাথমিক কিছু ওষুধ দিলেন। ওষুধ খেয়ে বাবা সুস্থ হয়ে উঠলেন। আগের মত চলাফেরা করতে লাগলেন। রির্পোট আসলো ১ মাস পর। রির্পোটে কী আছে জানার জন্য বগুড়ার সেই ডাক্তারের চেম্বারে যাই।
ডাক্তার রির্পোট দেখে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, আপনি একটু শক্ত হবেন। বললাম কী হয়েছে? ডাক্তার বললেন, ক্যন্সার।
বলেন কী? এখন উপায়! ডাক্তার বললেন, কোনো উপায় নেই। আপনার বাবা আর ৬ মাস বাঁচবেন। ক্যান্সার পূর্ণ বিস্তার করেছে। এখন কোনো চিকিৎসা দিয়ে লাভ হবে না। যে কদিন বাঁচে পাশে পাশে থাকুন। আমাদের করার কিছুই নেই।
ডাক্তারের কথায় আমার বাকশক্তি হারিয়ে গেল। বাহিরে এসে ছোট ভাই শামীম আর ছোট চাচা শফিকুলের গলা ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলাম। আমার বাবাকে আর বাঁচাতে পারলাম না। আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলো।
বাড়ি ফিরে দেখি বাবা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঠিকমতো মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করছেন। খাওয়া দাওয়া ঘুম- সব কিছুই ঠিক ঠাক চলছে। বাবার ক্যান্সারের বিষয়টি গোপন রাখা হলো। বাড়ির সবাইকে বলা হলো, যেন বাবা কিছুতেই বুঝতে না পারেন। বাবাকে বোঝানো হলো রোগটা জটিল। ওষুধ খেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
বাবার খুব কাছে থাকার চেষ্টা করলাম। সময় পেলেই বাবার কাছে বসি। কী খেতে ইচ্ছে করে জিজ্ঞেস করি। গল্প করি। বাবার অতিথের কথা শুনি। বাবা সুন্দর করে গুছিয়ে তাঁর শৈশবের কথা বলেন। মনে মনে ভাবি। হায়রে পৃথিবী। হায়রে মানব জীবন। জন্ম মৃত্যু সব কিছুই নিয়তির খেলা। বাবার মৃত্যুর এই ৬ মাস খুব কাছ থেকে অনুভব করা শুরু করলাম। কীভাবে একটি জীবন্ত মানুষ তিলে তিলে নিস্তেজ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে।
২ মাস যেতেই বাবা দুর্বল হয়ে পড়লেন। ক্ষুধার চাহিদা কমে গেল। ৩ মাসের মাথায় খাওয়া দাওয়া একে বারেই বন্ধ হয়ে গেল। মসজিদে নামায পড়তে যেতে পারলেন না। বাড়িতেই নামায আদায় করার চেষ্টা করলেন। ৪ মাসের মাথায় বাবা বললেন বিলদহরের বিকাশের হোমিও ওষুধ খেলে সব ভালো হয়ে যাবে। সব কিছু জানার পরও বাবার ইচ্ছে পূরণ করার জন্যই বিলদহর বাজারে বিকাশের হোমিও চিকিৎসা নেয়ার জন্য বিলদহর যাওয়ার সিদ্ধাস্ত নিলাম। বিলদহর বাজারের হোমিও চিকিৎসক হিসাবে বিকাশ ডাক্তারের সে সময় সুনাম ছিল।
একদিন বাবাকে নিয়ে ছুটলাম সেই বিলদহর বাজারের দিকে। ডাহিয়া থেকে ভাড়াটে নৌকায় চড়ে বিলদহর বাজারে যাচ্ছি। বিলে তখন তেমন পানি নেই। খালের পানি দিয়ে চলছে নৌকা। মনে পড়ছে সেই ছোট বেলার কথা। এই রাস্তা দিয়েই সেদিন বাবা আমাকে কাঁধে নিয়ে বিলদহরের রাজ্জাক ডাক্তারের কাছে গিয়ে ছিলেন। আমি যাচ্ছি সেই বাবাকে নিয়ে বিকাশ ডাক্তারের কাছে।
বিকাশ ডাক্তার রির্পোট দেখে চমকে উঠলেন। আমার চোখের ইশারায় ওষুধ দিলেন। বাবাকে সান্ত¦না দিয়ে বলা হলো- ভালো হয়ে যাবেন। বাড়িতে যান। বাবা খুশি হলেন। খুশি হতে পারলাম না আমি। ভেতরে ভেতরে চাপা কান্না আরও চেপে রাখার চেষ্টা করলাম।
আবারও নৌকা পথে সেই বিলের খাল দিয়ে বাড়ি ফিরছি। ভাবছি নিয়তির কী নির্মম পরিহাস। ৩০ বছর আগে যে বাবা আমার চিকিৎসার জন্য আমাকে নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে বিলদহর বাজারে এসে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে আমাকে সুস্থ করলেনÑ অথচ সেই বাবাকে চিকিৎসা দিয়ে আমি সুস্থ করতে পারলাম না। বুক ফাটা চাপা কান্না নিয়ে সন্ধ্যায় বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।
৬ মাসের মাথায় বাবা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন ওপারে। সেই যে গেলেন আর ফিরে এলেন না।
আজ ১৬ জুন বিশ্ব বাবা দিবস। আমার বাবা বেঁচে নেই। যাদের বাবা বেঁচে আছেন তাঁদের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা। আর যাঁদের বাবা আমার বাবার মত না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন। তাঁদের আত্মার মাগফেরাত কামনা সহ বেহেশ নসিব কামনা করছি।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক, সিংড়া প্রেসক্লাব,নাটোর।