আজ ভয়াল ১৩ সেপ্টেম্বর সাপাহারকে মুক্ত করতে প্রাণ দেন ২১ বীর মুক্তিসেনা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭, ১:৪১ পূর্বাহ্ণ

সাপাহার প্রতিনিধি


স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৬ বছর পর আবারো ফিরে এলো সেই ভয়াল ১৩ সেপ্টেম্বর। নওগাঁর সাপাহার উপজেলার স্বাধীনতাকামী মানুষদের কাঁদাতে ও ১৯৭১’র ১৩ সেপ্টেম্বরের সেই বিভৎস ঘটনা স্মরণ করে দিতে। ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে এলাকার বীরমুক্তিযোদ্ধার একটি সশস্ত্র দল জেলার সাপাহারবাসীকে শত্রুমুক্ত করতে গিয়ে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হন এবং সে যুদ্ধে ২১জন বীরসেনা হাসিমুখে তাদের তাজা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন, আহত হয়েছিলেন অনেকেই।
তাই ১৩ সেপ্টেম্বর সাপাহারবাসীর জন্য ইতিহাসে ভয়াল দিন হিসেবে আজও পরিচিত। প্রতিবছর এই দিনটি স্মরণ করে অনেক সন্তান হারা মা, ভাই হারা বোন ও তাদের আত্মীয়-স্বজনরা অঝর ধারায় তাদের চোখের পানি ফেলেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সেদিনের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া যুদ্ধাহত বীরমুক্তিযোদ্ধা এসএম জাহিদুল ইসলাম, মনছুর আলী, আ. রাজ্জাকসহ একাধিক মুক্তিযোদ্ধা এবং এলাকার কিছু প্রবীণ ব্যক্তির নিকট থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকহানাদার বাহিনী ও তার দোসররা সাপাহার সদরের পূর্বদিকে একটি পুকুর পাড় ও পাড় সংলগ্ন স্কুলে (বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী পাইলট উচ্চবিদ্যালয়) একটি শক্তিশালী ক্যাম্প স্থাপন করে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এখান থেকেই তারা এলাকার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে অসহায় মা-বোনদের সম্ভ্রমহানী নিরীহ লোকদের ব্রাশফায়ার ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে থাকতো। দেশের এই প্রতিকূল অবস্থায় বর্বর হানাদার বাহিনীর কবল থেকে সাপাহারবাসীকে মুক্ত করার জন্য সাপাহার ও মহাদেবপুর এলাকার ৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে তৎকালীন পাকহানাদার বাহিনীর লে. শওকত আলীর অধীন সাপাহারের ওই শক্তিশালী ক্যাম্পটিকে উৎখাত করার জন্য ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে আক্রমণ চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক ওইদিন রাতে মুক্তিযোদ্ধা মেজর রাজবীর সিং এর আদেশক্রমে ও ইপিআর হাবিলদার আহম্মদ উল্লাহর নেতেৃত্বে ৮০ জন মুক্তিযোদ্ধার সংঘটিত দলটিকে ৩টি উপদলে বিভক্ত করে একটি দলকে সাপাহার-পত্নীতলা রাস্তার মধইল ব্রিজে মাইন বসানোর কাজে নিয়োজিত করা হয়, যাতে পত্নীতলা হতে শত্রু সেনারা সাপাহারে প্রবেশ করতে না পারে। অন্য একটি দলকে নিয়োজিত করা হয় সার্বক্ষণিক টহল কাজে। আর মূল দলটি অবস্থান নেয় শত্রু শিবিরের একেবারে কাছাকাছি একটি ধানখেতে। কিন্তু হাজারো সর্তকতা ও নিñিদ্রতার জাল ভেদ করে মোনাফেক রাজাকার আলবদর মারফত মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের খবর পৌঁছে যায় শত্রু শিবিরে। তাৎক্ষণিকভাবে পাকসেনারও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। চলতে থাকে উভয়পক্ষের মধ্যে যুদ্ধের নানা পরিকল্পনা। অবশেষে শেষ রাতের দিকে ধানখেতে অবস্থান নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র গর্জে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। শুরু হয় উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুুল লড়াই। লড়ায়ের একপর্যায়ে বীরমুক্তিযোদ্ধার দলটি যখন শত্রু সেনাদের প্রায় কোনঠাসা করে ফেলেছিল, ঠিক এমনি অবস্থায় ভোরের আভাস পেয়ে ব্রিজে মাইন বসানোর দলটি সেখান থেকে সরে পড়লে তার কিছুক্ষণ পরই পত্নীতলা হতে অসংখ্য শত্রু সেনা আরোও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সাপাহারে প্রবেশ করে। এরপর শত্রুপক্ষের অত্যাধুনিক ভারী অস্ত্রের মুখে হিমশিম খেয়ে এক সময় বাধ্য হয়ে পিছু হটতে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের। এসময় শত্রুপক্ষের গুলির আঘাতে বীরমুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান, আইয়ুব আলী, আবদুল হামিদসহ ১৫ জন ঘটনাস্থলেই শাহাদাতবরণ করেন। আহত হন মনছুর আলী, এসএম জাহিদুল ইসলাম, দলনেতা আহমদ উল্লাহ, সোহরাব আলী, নুরুল ইসলামসহ অনেকে।
এছাড়া শত্রুদের হাতে জীবিত ধরা পড়েন ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা। শত্রুরা আটক ৮ জনের মধ্যে চারজনকে পত্নীতলার মধইল স্কুলের ছাদে তুলে কুপিয়ে হত্যা করে লাশগুলি লাথি মেরে নিচে ফেলে দেয়। দুই জনকে ধরে এনে মহাদেবপুরের একটি কূপে ফেলে দিয়ে জীবন্ত কবর দেয় এবং সাপাহারের তিলনা গ্রামের আবু ওয়াহেদ গেটের ও মহাদেবপুর উপজেলার জোয়ানপুর গ্রামের মৃত এসএম আবেদ আলীর ছেলে যুবক এসএম জাহিদুল ইসলামকে ধরে এনে নাটোরের রাজবাড়ীতে তৈরিকৃত জেলখানায় বন্দি করে রাখে।
শত্রু সেনার বন্দিদশা ও সেই ভয়াল ১৩ সেপ্টেম্বর এর বর্ননা দিতে গিয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া জেল ফেরত যুদ্ধাহত জাহিদুল ইসলাম হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন এবং অশ্রুসিক্ত নয়নে বললেন, মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন আস্তানা গোপন তথ্য ও অস্ত্র ভাণ্ডারের খবর জানার জন্য প্রতিদিন সকালে তাদের দুইজনকে হানাদার বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নিকট উপস্থিত করা হতো। তথ্য আদায়ে ব্যর্থ হলে কর্মকর্তার সামনেই ধারালো অস্ত্র (চাকু) দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কেটে লবন মাখিয়ে দেয়া হতো। অসহ্য যন্ত্রনায় অসহায় মুক্তিযোদ্ধারা যখন ছটফট করতো এবং শত্রুবাহিনীর সকলেই তখন আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠতো। এমনি হাজারো দুঃখ-কষ্টের মাঝে থেকে সুযোগ বুঝে একদিন তারা জেলের প্রাচীর টপকে পালিয়ে এসে প্রাণে বাঁচেন। দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ ও শত্রুদের দেয়া অসহ্য যন্ত্রনা সহ্য করে মুক্তিযোদ্ধা আবু ওয়াহেদ গেটের এখন প্রবাসী জীবনযাপন করলেও যুদ্ধাহত বীরমুক্তিযোদ্ধা এসএস জাহিদুল জীবনের শেষ প্রান্তে সে বৃদ্ধ বয়সে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করে কোন মতে বেঁচে আছেন।