আত্মদর্শনে কোরবানি

আপডেট: আগস্ট ১১, ২০১৯, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ

ড. হাসান রাজা


ইসলাম অর্থ শান্তি, সমর্পণ। বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাকৃতিক এবং সর্বজনীন পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শন ইসলাম। এই ইসলাম ধর্ম ছাড়াও পৃথিবীতে প্রচলিত সকল ধর্মদর্র্শনগুলোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি ধর্ম দর্শনে দু’টি দিক বিদ্যমান। একটি বাহ্যিক, অপরটি অভ্যন্তরীণ। বাহ্যিক দিকটি অনুষ্ঠাননির্ভর আর অভ্যন্তরীণ দিকটি তত্ত্বগত, যা মূলত সাধনানির্ভর। যুগে যুগে পৃথিবীতে আগত মহাপুরুষগণ যে মৌলিক ভিত্তির ওপর নির্ভর করে জীবনজুড়ে মানুষকে নিজেকে জানার মাধ্যমে সত্যের পথে, কল্যাণের পথে, শৃঙ্খলার পথে, সাম্যের পথে, মানবতার পথে, আত্মমুক্তির পথে আহ্বান করেছেন তার নাম জ্ঞান। এই জ্ঞান আত্মিক জ্ঞান, আধ্যাত্মিক জ্ঞান, মানবধর্মের জ্ঞান। হযরত আদম (আ.) থেকে হযরত মুহাম্মদ (আ.) পর্যন্ত সকল নবি-রসুলই মূলত এই একই সত্য ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করে যুগ সমস্যা অনুসারে ধারাবাহিকভাবে মানুষকে ধর্ম দেশনা দান করেছেন। যার মধ্যে নিহিত রয়েছে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ এবং আত্ম মুক্তি। এই কল্যাণ বা জ্ঞান অর্জনের জন্য নবী, রসুল বা তাদের স্থলাভিষিক্ত প্রতিনিধি নায়েবে রসুল, অলি-আল্ল¬াহ্, সূফি-দরবেশ, মুনি-ঋষিগণের নিকট দেহমন দ্বারা পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পিত হতে হয়। জানতে হয় সৃষ্টি ও স্রষ্টা রহস্যের মৌলিক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিকাশ বিজ্ঞানের পরমজ্ঞান, সৃষ্টিবিজ্ঞান তথা আত্মবিজ্ঞান।
ইসলাম ধর্ম দর্শনের মৌলিক ভিত্তিসমূহের মধ্যে অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে কোরবানি। হযরত ইব্রাহীম (আ.)Ñএর সুন্নত হিসাবে আমরা উম্মতে মুহাম্মদীগণ এই অনুষ্ঠান পালন করি। তবে বাহ্যিকভাবে বর্তমান সমাজে প্রচলিত ধারায় পশু হত্যার মাধ্যমে যে কোরবানি পালন করা হয় তা আল্ কোরানে বর্ণিত ইসলামের মূল দর্শনের পরিপন্থি। যা শুধুই আনুষ্ঠানিক এবং বস্তুবাদী চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।
অন্যদিকে আত্মÑদর্শনে নিবেদিত সূফি সাধক, অলিÑআউলিয়াগণ মনে করেন কোরবানি শুধু পশু হত্যার নামই নয়, এবং কোরবানি দেওয়ার বিষয়ও নয়। বরং প্রকৃত কোরবানি হওয়ার বিষয়। গুরুমুখি সাধনায় নিজেকে জানার মাধ্যমে মহান সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভের জন্য সর্বোত্তম আত্মত্যাগ ও সৃষ্টির সেবায় আত্ম-উৎসর্গের নাম কোরবানি ।
সালাত, সিয়াম, হজ্জ্ব ও জাকাতের সাধনা করে আত্মিকভাবে সর্বোত্তম কল্যাণ লাভের মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ কোরবানি। এই কোরবানি মানুষের সাধক জীবনের চরম এবং পরম একটি কর্তব্য ও আরাধ্য বিষয়। মানুষের আত্মিক কল্যাণ এবং মুক্তিলাভের সর্বশেষ সাধনা কোরবানি। পৃথিবীর প্রচলিত সকল ধর্মদর্শনে এই কোরবানির মূল বিষয়টি বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। মুহাম্মদী ইসলাম ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ আল্ কোরানের সুরা বাক্বারাহ্ (২:৬৭-৭১), সুরা মায়েদাহ্ (৫:২,৯৭), সুরা হজ্জ্ব (২২:২৬-৩৮) ও সুরা আস্ ছাফ্ফাত (৩৭:১০০-১০৮)-এ কোরবানি সম্পর্কে রূপকভাবে আলোচিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, পবিত্র আল্ কোরানে কোরবানি শব্দটি সরাসরি কোথাও নাই। আল্ কোরানে উল্লি¬খিত শব্দটি হচ্ছে ‘জবেহ্’। ‘জবেহ্’ শব্দটির অর্থ উৎসর্গ করা, পবিত্র করা, শুদ্ধিকরণ।
মূলত মানুষের সপ্ত ইন্দ্রিয় পথে তার অস্তিত্বের মধ্যে আগত বিষয়রাশিসমূহ মানুষকে চঞ্চল ও অস্থির করে রাখে। তৈরি করে ক্ষণস্থায়ী মায়াজাল। মৃত্যু দ্বারা যা বারবার খ-িত হয়। মানুষের সপ্ত ইন্দ্রিয় তথা চোখ, কান, নাক, মুখ ইত্যাদি দ্বারা দৃশ্য, শব্দ, গন্ধ, কথা ইত্যাদি রূপে মানুষের মস্তিষ্কে আগত এই সব বিষয়রাশি মোহদ্বারা গ্রহণ করলে সেগুলো মানুষের মস্তিষ্কের স্মৃতিফলকে পরজন্মের বীজ হিসাবে জমা হয়। এর নাম শিরিক বা অংশিদারিত্ব। তাই আত্মিকভাবে কোরবানি হচ্ছে মানষের মস্তিষ্কে তার সপ্ত ইন্দ্রিয় পথে আগত বিষয়রাশিকে মোহময়ভাবেÑপ্রভু হিসাবে গ্রহণ না করে একমাত্র স্রষ্টার গুণাবলি অর্জনের জন্য সকল বিষয় দেখা ও শোনার মাধ্যমে তাদের মোহ ত্যাগ করে মস্তিষ্কের স্মৃতিফলককে শূন্য করা বা পবিত্র করা। হাক্বিকতে তথা ধর্ম নিরপেক্ষ আত্মÑদর্শনে এটাই প্রকৃত কোরবানি। তাই প্রকৃত কোরবানি হওয়ার সাধনা মানব জীবনের পরম সাধনা। মুর্শেদ বা গুরুহীন অবস্থায় এই সাধনা কখনোই সম্ভব নয়। একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর যে কোনো বিষয়-বস্তুর ওপর নির্ভর করা, আশ্রয় নেয়া, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, কাম, ক্রোধ, লোভরূপি সকল রিপুর তাড়নায় নিমজ্জিত অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আপন পশুরূপি নফসের কোরবানি করা, শুদ্ধি করার মধ্যেই রয়েছে মহান সৃষ্টিকর্তা রব্বুল আলামীনের জন্য প্রকৃত সন্তুষ্টি। কারণ প্রতিটা মানুষ তার স্বরচিত আমিত্ব বা অহং দ্বারা পরিচালিত হয়। কিন্তু জগৎ সংসারে যে কোনো সৃষ্টি জীবের জন্য ‘আমিত্ব’ বা আমার বলে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়।
মানুষের কোনো কিছুই নিজের নয়। পৃথিবীতে সব কিছুই স্রষ্টার পরিচয়। সব কিছুর মাঝেই মহান আল্ল¬াহর অস্তিত্ব বিরাজমান। সব কিছুই তাঁর, সব কিছুই তিঁনি। ঊাবৎুঃযরহম ঐব ধহফ বাবৎুঃযরহম ঐরং. সকল কিছুর মাঝেই তিঁনি ‘রব’ রূপে বিরাজিত। মানুষ তার মাঝে ঘুমন্ত সেই রবকে নিজের আমিত্ব, কামনাÑবাসনা, রিপুর তাড়না আর বিষয়রাশির মোহময় বন্ধনে আবৃত করে রাখে। আল্ কোরানে ঘোষিত হয়েছে ‘ওয়াল্ল¬াহু মুহিতুম বিল কাফেরিন’ অর্থাৎÑ আল্লাহ কাফেরদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে আছেন। আবার একইভাবে আল্ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে ‘ক্বুলুবুল মুমেনিনা আরশাল্ল¬াহ’ অর্থাৎÑ মুমিনের ক্বলবই (সূক্ষ্ম মস্তিষ্ক) আল্ল¬াহর আরশ। অথচ কতিপয় বস্তুবাদী, লোভী মানুষ আপন অস্তিত্বকে না জেনেÑনা শুনে, সাত আসমানের ওপর মহান সৃষ্টিকর্তা আল্ল¬াহকে বসিয়ে তার দোহাই দিয়ে নিজ নিজ আমিত্ব বা কামনাÑবাসনাকে অনুসরণ করে থাকে। তারা মহান সৃষ্টিকর্তার সর্বজনীন বিধানকে না মেনে আপন দেহমনকে ভোগী বস্তুগত চাহিদার মোহে আবদ্ধ করে ভোগের স্বাদÑসাগরে ডুবে গিয়ে পৃথিবীতে নিজস্ব মালিকানা সৃষ্টি করে থাকে। স্রষ্টা ও সৃষ্টি আলাদা এই ভ্রান্ত মতবাদে নিমজ্জিত মানুষ জগৎ জুড়ে মহান রব্বুল আলামিনের অখ- অসীম সত্তার সর্বময় অস্তিত্বকে বিস্মৃত হয়ে প্রতিষ্ঠা করে সাম্প্রদায়িকÑবিশৃঙ্খলা, স্বার্থান্বেষী ভোগী আইনÑকানুন। যা যুগে যুগে পৃথিবীতে আগত মহামানবগণের সর্বজনীন নিরপেক্ষ আত্ম মুক্তির জীবন দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
আল্ কোরানে উল্লি¬খিত প্রতিটি বিষয়ের দর্শনগত দিকটি সর্বজনীন, সর্বকালীন। সকল প্রকার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলির সঠিক দিক নির্দেশনা দানের মৌলিক ও নান্দনিক উপস্থাপক হচ্ছে আল্ কোরান। এর প্রতিটা বিষয়ের রয়েছে সাধারণ এবং রূপক অর্থ। এছাড়া আল্ কোরানে ঘোষিত হয়েছে একমাত্র কর্তব্য পরায়ণ মোত্তাকির জন্যই কোরান পথ প্রদর্শক স্বরূপ এবং এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। সুতরাং বাহ্যিক অনুষ্ঠানই সব কিছু নয়। প্রতিটা অনুষ্ঠানের মৌলিক দর্শনকে জানতে হবে, মানতে হবে, ব্যক্তি কল্যাণের জন্য, সামগ্রিক কল্যাণের জন্য। তাই অসৎ উপায়ে অর্জিত টাকা দিয়ে বা তার থেকে নাদুসÑনুদুস পশু কিনে সেটাকে ভোগের জন্য আল্ল¬াহর নামে কোরবানি দেওয়া হলে ওই পশুর চামড়া, নাড়িÑভুড়ি বা রক্ত-মাংস কোনোটির জন্য মহান রব্বুল আলামিন কতোটুকু লালায়িত সেটা মহান আল্লাহপাকই ভালো জানেন। অথচ ‘প্রিয়বস্তু’ কোরবানি করÑএই আদেশের মধ্যেই নিহিত রয়েছে কোরবানির সর্বজনীন সত্য। একজন মানুষের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু তার সন্তান, গরু-ছাগল বা উট কিংবা দুম্বা নয়। মানুষের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু হচ্ছে তার প্রাণ, তার আপন সত্তা। সেই সত্তাকেই আল্লাহর নামে সৃষ্টির কল্যাণে উৎসর্গ করতে হবে। মহান সৃষ্টিকর্তার এমনি সর্বজনীন আদেশে আদিষ্ট হয়ে কোরবানি হয়েছিলেন হযরত মুসা (আ.) ও হযরত ইবরাহীম (আ.)। একমাত্র মহান আল্ল¬াহতায়ালার সন্তুষ্টি লাভের জন্যই হযরত ইবরাহীম (আ.)Ñতাঁর পুত্র হযরত ঈসমাইল (আ.)Ñকে আল্ল¬াহর জন্য, আল্ল¬াহর পথে উৎসর্গ করেছিলেন। এক্ষেত্রে কোনো রকম পশু তথা উট বা দুম্বা কিংবা হযরত ঈসমাইল (আ.)Ñএর রক্ত, মাংসের সাথে মহান আল্ল¬াহর কোনো সম্পর্ক নাই। বরং আল্ল¬াহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য, নৈকট্য লাভের জন্য, আপন আপন আমিত্ব তথা মানবীয় নফসের শুদ্ধি ক্রিয়াই মহান আল্ল¬াহর রাহে আপন সত্তার উৎসর্গই প্রকৃত কোরবানি। যার মাঝে নিহিত রয়েছে আত্মমুক্তি, পরিশেষে বিশ্ব মানবতার কল্যাণ। তাই পবিত্র আল্ কোরানে রূপকভাবে মানবীয় সত্তাকে পশু হিসাবে উল্লে¬খ করা হয়েছে। কেননা, পৃথিবীতে সৃষ্ট সকল জীবই আল্ল¬াহর সৃষ্টি এবং সকল জীবের মাঝেই তিনি নিজে আত্মারূপে বিরাজ করেন। তাই আল্ল¬াহর সৃষ্টি জীবকে আল্ল¬াহর নামে নৃশংসভাবে হাতÑপা বেঁধে হত্যা করার মধ্যে মানুষের কোনো কল্যাণ নাই, নাই কোনো পরকালের মুক্তি। বরং আল কোরানে বর্ণিত হয়েছে : ‘ফাক্বতুলু আনফুসাকুম জালিকা খয়রুল্ল¬াকুম ইনকুনতুম তা’লামুন’। অর্থাৎÑ ‘অতএব তোমাদের নফসের কোরবানি (ক্বতল=পরিশুদ্ধি) কর, এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জ্ঞানী হয়ে থাক।’
মূলত প্রতিটা মানুষের আপন আপন নফসের শুদ্ধি ক্রিয়া বা কোরবানি তথা আমিত্বরূপি পশুত্বের কোরবানি করার মাধ্যমে জীবনভর নিজের সকল চিন্তাÑচেতনা ও কর্মের ওপর সার্বক্ষণিক আল্ল¬াহর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই আল্লাহর জন্য, আল্ল¬াহ প্রাপ্তির জন্য মানুষের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ বা আত্ম-উৎসর্গ তথা প্রকৃত কোরবানি। এটাই পবিত্র আল্ কোরানে উল্লি¬খিত আত্মদর্শী সাধক মানুষের সর্বজনীন কোরবানির প্রকৃত গুঢ় তাৎপর্য ও হাক্বিকত। তাই আত্ম-দর্শনে প্রকৃত কোরবানির সাথে চতুষ্পদ পশু হত্যার কোনো সম্পর্ক নাই। এই পরম আত্মদর্শী সত্য সুন্দরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বাঙালির বিশ্বমানব ক্ষণজন্মা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও তাই তাঁর কবিতায় ঘোষণা করেছেন : ‘মনের পশুরে কর জবাই, পশুরাও বাঁচে বাঁচে সবাই’।
ড. হাসান রাজা, লেখক ও গবেষক