আদিবাসী দিবস এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি

আপডেট: আগস্ট ৯, ২০১৯, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

মিথুশিলাক মুরমু


আজ ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে দুনিয়াজুড়ে উদযাপিত হচ্ছে। আমার বাংলাদেশে সরকারিভাবে আয়োজিত না হলেও বেসরকারিভাবে কিংবা ব্যক্তি প্রচেষ্টায় অনেক জায়গাতেই আয়োজন করা হয়েছে আদিবাসী দিবস। আমার দেশের সংবিধানে আদিবাসী শব্দটি অনুপস্থিত; যে শব্দটি রয়েছে, সেটি দেশের আদিবাসীরা গ্রহণ করেনি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৩ক- তে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।’ তবে হতাশার কথা হচ্ছেÑ ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ’-এর কোনো সংজ্ঞা আমাদের জানা নেই। সাঁওতাল, উঁরাও, মান্দি, খাসি, চাকমা, মারমা, বম-কে কোনটিতে পড়ছে, সেটির গোলক ধাঁধায় আমাদেরকে ধূমায়িত করে তুলেছে। আর এই জন্যেই ঢাকা বিশ^বদ্যালয়ের ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে ১ম বর্ষ ¯œাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তির বিজ্ঞপ্তিতে চোখে পড়েÑ ‘উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটার ক্ষেত্রে স্ব-স্ব উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী প্রধান/জেলা প্রশাসক-এর সনদপত্রের সত্যায়িত ফটোকপিসহ’ জমা দিতে হবে।
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে বিভিন্ন সময়ে সমতল অঞ্চলের ইণ্টারমিডিয়েট পর্যায় থেকে উপরের ছাত্রছাত্রীরা বৃত্তিগ্রহণ করেছে এবং তাদের প্রত্যেকে ক্ষুদ্র পুস্তিকা ‘সমতলের ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর জন্য গৃহীত উন্নয়ন কর্মসূচিÑ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি অনন্য উদ্যোগ’ প্রদান করা হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে, ১৫,৮৬,১৪১ জন যা মোট জনসংখ্যার ১.১০ শতাংশ। এদের মধ্যে মোট পুরুষ হচ্ছেÑ ৭,৯৭,৪৭৭ জন যা ৫০.২৮ শতাংশ সমতলের মোট ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর; অপরদিকে নারী ৭,৮৮,৬৬৪ জন যা ৪৯.৭২ শতাংশ সমতলের মোট ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর। মোট খানার সংখ্যা পাওয়া যায় ৩,৫৬,১৭৫টি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে প্রকাশিত পুস্তিকায় দু’ধরনের তালিকা চোখে পড়ে। প্রথমতÑ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত গেজেট অনুযায়ী ২৭টি সম্প্রদায়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নাম উল্লেখ রয়েছেÑ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ¤্রাে, তনচঙ্গা, বম, পাংখোয়া, খিয়াং, চক, খুমি, লুসাই, কোচ, সাঁওতাল, ডালু, রাখাইন, মনিপুরী, গারো, হাজং, খাসিয়া, মং, ত্রিপুরা, ওরাঁও, বর্মন, পাহাড়ি, মালপাহাড়ি, মু-া, কোল। এখানে স্মতর্ব্য যে, চক জনগোষ্ঠী নামে কোনো জনগোষ্ঠী রয়েছে কী না জানিনা কিন্তু চাক জনগোষ্ঠী রয়েছে। এছাড়াও সমতলে মং ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি দেখানো হয়েছে, যা আমাদেরকে আশ্চর্যন্বিত করেছে। দ্বিতীয়তÑ সমতল অঞ্চলে আরো কতকগুলো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উপস্থিতি স্বীকার করা হয়েছেÑ বরাইক, রাজবংশী, পাহান, রাই, বুনো, মালো, রাজোয়াড়, তুরি, মুরারি, মাহাতো, লহোরা। তবে হ্যাঁ আরো যে কতকগুলো জনগোষ্ঠী রয়েছে তাদের নাম অনুল্লেখই রয়ে গেছেÑ মাহালী, ভূঁইয়া, ভূমিজ, কর্মকার ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর নাম আড়ালেই থেকে গেছে। ২০১১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারি অনুযায়ী, সর্বাধিক আদিবাসী বসবাসকারী জেলা তালিকার শীর্ষে রয়েছে নওগাঁ জেলাÑ ১১৬৭৩৬; দিনাজপুরÑ ৬৬৮৬১; হবিগঞ্জÑ ৬৫৮০২; মৌলভীবাজারÑ ৬৩৪৬৬ এবং রাজশাহীÑ ৪৯৩১২ জন। আর উপজেলাগুলোর মধ্যেÑ চুনারুঘাট ৩৯২৮৬; নিয়ামতপুরÑ ৩২১৪১; গোদাগাড়ীÑ ২৪৪৩৮; কমলগঞ্জÑ২৩১২৪; পতœীতলাÑ ২০২৭০; মধুপুরÑ১৫৮৯৮; মহাদেবপুরÑ ১৫৩৮৯; পোরশাÑ ১৪৩৭৪; শ্রীমঙ্গলÑ১৩৫৩১; তানোরÑ ১৩৪৬০। বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে পুস্তিকায় সর্বত্রই ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ হিসেবে সব জনগোষ্ঠীকে আখ্যায়িত করা হয়েছে; তাহলে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণরা কে বা কোন জনগোষ্ঠী!
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ‘সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য উন্নয়ন সহায়তা’ (পার্বত্য জেলা ব্যতিত) ১৯৯৬-৯৭ অর্থ বছর থেকে বর্তমান অবধি চলমান রয়েছে। এসব আদিবাসী অর্থাৎ সরকারি কাগজ-কলমে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়নে অর্থায়ন করছে জিওবি (এডিপি থোক বরাদ্দ) এবং সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মূলতঃ শিক্ষাবৃত্তি, পরিবহণ, জুতা তৈরি, পানের বরজ, সামাজিক বনায়ন, পোল্ট্রি, হস্তশিল্প, সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প, গরু পালন, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রকল্প, সেলাই প্রশিক্ষণ প্রকল্প, তাঁত প্রশিক্ষণ প্রকল্প, রিক্সা-ভ্যান প্রকল্প, মৎস্য/চিংড়ি চাষের মতো কার্যসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। আর এসব কাজের জন্য তৎকালীন সময় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বরাদ্দ পাওয়া যায়Ñ

অর্থবছর বরাদ্দ (কোটি টাকা)
১৯৯৬-৯৭ ৫.০০
২০১০-১১ ১২.০০
২০১১-১২ ১৫.০০
২০১২-১৩ ১৭.০০
২০১৩-১৪ ১৬.০০
২০১৪-১৫ ১৬.০০
২০১৫-১৬ ২০.০০
২০১৬-১৭ ২০.০০
২০১৭-১৮ ৩০.০০

এই কার্যসূচির আওতায় আরো কতকগুলো নতুন জনগোষ্ঠীর নাম উল্লেখ পাওয়া যায়Ñ ক্ষত্রিয়, রবিদাস, সর্দার, কর্মকার, হাওলাদার, পাল, বাগদি, চৌহান, বিশ^াস, মৃধা, মালাকার, বেহারা, বনুয়া, সিং, রুহিদাস, দাস এবং বাঁশমালী। এই নামগুলোর মধ্যে হাওলাদার, পাল, চৌহান, বিশ^াস, মৃধা, মালাকার, বেহারা, বনুয়া, রুহিদাস, দাস এবং বাঁশমালীর নাম ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’-এর তালিকাতেও তেমন চোখে পড়েনি। এই পদবীর জনগোষ্ঠী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে অর্ন্তভূক্তি বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাগজ-পত্রে স্থান প্রাপ্তি অনেককেই হতবাক করে দিয়েছে!
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রত্যেক বছরের ন্যায় এ বছরও প্রতিটি ছেলেমেয়েকে ২৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়। এছাড়াও আমরা লক্ষ্য করেছি, বিভিন্ন সময়ে অভ্যন্তরীণভাবে মেধাভিত্তিক (বিশেষ করে ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে) ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি, এসএসসি, এইচএসসি, মাস্টার্স শ্রেণির ৮০০ জন ছেলেমেয়েকে বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে; বৃত্তির পরিমাণ ছিলো ১৯,৩৫,০০০ টাকা। এ সময়ে বাস্তবায়িত হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বাস্তবায়নাধীন বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচি আওতায় শিক্ষাবৃত্তি। ১৬১ উপজেলায় থোক হিসেবে ৪১৪.৬৫ লক্ষ টাকা শিক্ষা বৃত্তি হিসেবে প্রদান করা হয়েছে ৫৫০০ ছাত্র ও ৭৩০০ ছাত্রীর মধ্যে। এককালীন উচ্চ শিক্ষাবৃত্তি (সরকারি/ বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়, মেডিক্যাল/ইঞ্জিনিয়ারিং ও জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ) ২১২ জন ছেলে ও ৮৮ জন মেয়েকে ৮০,০০০০০ টাকা রাজস্ব তহবিল থেকে প্রদান করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে আদিবাসীদের শিক্ষাবৃত্তি ছাড়াও উপজাতীয় কালচারাল একাডেমীগুলোর মধ্যে দিয়ে বেশ কার্যসূচি সরকার গ্রহণ করে চলেছে। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, শিক্ষাবৃত্তির ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ থাকলেও জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’র শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের ২৩-এ বলা হয়েছে ‘দেশের আদিবাসী সহ সকল ক্ষুদ্রজাতিসত্তার সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশ ঘটানো।’ অন্যদিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর গঠনতন্ত্রের ‘অঙ্গীকার’-এ ২০ তে বলা হয়েছে, ‘বাঙালি জাতির সভ্যতা, কৃষ্টি, ভাষা, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতির বিকাশ নিশ্চিতকরণ এবং জীবনবিমুখ অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ বিনোদন ও অপ-সংস্কৃতি প্রতিরোধ করা। দেশের আদিবাসী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও উপজাতীয় জনগণের জীবনধারা, ভাষা সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা।’ অর্থাৎ জাতীয় শিক্ষানীতি ও আওয়ামী লীগ-এর গঠনতন্ত্রের সাথে সরকারি কাগজ-পত্রের অমিলও আমাদেরকে দ্বিধান্বিত করে তোলে।
বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার ২০১১ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে অর্থাৎ পবিত্র সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধিনীর পূর্বে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত এবং অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সামিল হয়ে পাশে পাশে থেকেছেন। মন্ত্রী মহোদয়, সাংসদগণ স্থানীয় পর্যায়ে মতবিনিময়, আলোচনা এবং সভা-সেমিনারে আদিবাসী শব্দটিকেই ব্যবহার করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে থাকতে আগ্রহ প্রকাশ করে থাকেন। তবে আশার কথা হচ্ছেÑ ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ’ হোক কিংবা আদিবাসীই হোক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহানুভূতি, সাহায্য ও কর্মউদ্যোগ ব্যতিত এইসব জাতিগোষ্ঠী কোনোভাবেই উন্নয়নের মহাসড়কে সম্মিলন হতে পারবে না। আদিবাসী দিবস-এ আমাদের এইসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজ অধিকার বিষয়ে সচেতনতা ও সরকারের প্রাপ্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হোক এই প্রত্যাশা করি।
লেখক: সংবাদকর্মী