আনন্দময়ীর আগমনে-

আপডেট: অক্টোবর ৫, ২০১৯, ১:০৭ পূর্বাহ্ণ

মনোরঞ্জন নন্দী


নীল আকাশে মাঝে মধ্যেই তুলোর মত সাদা মেঘ ভেসে যায়। শিশির ভেজা শিউলি ও সাদা কাশফুল সোনালী রোদে ঝক ঝক করে। এরই মাঝে চারিদিকে পূজোর আমেজ। অর্থাৎ আনন্দ উৎসব। এই আনন্দ সাগরে ভেসে বেড়ায় নতুন নতুন পোশাকে নিজেদের সজ্জিত করে নানা বয়সের মানুষ। কিন্তু দুঃখের বিষয় নানান দুঃশ্চিন্তায় দিন যাপনের কারণে এবার টের পাইনি মা দূর্গার আগমনের সময় হয়ে গেছে। টের পেলাম যখন- আমার গিন্নি এসে বলল, আমাদের সংসারে এমন অভাব অনটন হবে তা কখনো ভাবিনি। একদিকে তুমি অসুস্থ, রোজগারের কোনো রাস্তা নেই। পাওনাদারদের অত্যাচার, এছাড়া অনেক প্রার্থনা করার পর সাত-আট বছর পর নাতি হলো। জানি হাত পাতার মতো জায়গা নেই। তবুও একবার অফিসে গিয়ে দেখ না- কত বছর চাকরি করলে? একজনও কি নেই যে, তোমাকে সাহায্য করবে? আর যাইহোক, নাতির জন্য জামা-প্যান্ট নিলেই হবে, পূজা বলে কথা ইত্যাদি শুনে চমকে উঠলাম। শত দুঃখ থাকলেও অল্প হলেও আনন্দ পেলাম। মনে মনে বললাম, এসো মা, তোমার অপেক্ষায় আছি। মাগো, খুব দুঃখ-কষ্টের মধ্যে জীবন যাপন করছি। আর মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না। মা বিপদ থেকে মুক্তি দাও না। তুমি তো জানো, প্রতি বছরেই আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগে লক্ষ লক্ষ মানুষ অন্নহীন, বস্ত্রহীন, আশ্রয়হীন অবস্থায় রাস্তা-ঘাটে, খোলা আকাশের নীচে অথবা ত্রাণ শিবিরে অনিশ্চিত ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই করে কোনো রকমে বেঁচে থাকার জন্য। এরই মধ্যে গত কয়েক বছর মিয়ানমার থেকে নদীর স্রোতের মতো কয়েক লাখ রোহিঙ্গা প্রাণে বাঁচার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের কথা ভেবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে আর এক সংকটের সৃষ্টি হলেও তা প্রকাশ না করে কটাদিন মহোৎসবে মিলিত হই। পরস্পরের সঙ্গে নানানভাবে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা বিনিময় করি। দোকানে বাজারে ক্রেতাদের ভীড়, পূজোর প্যান্ডেলে পথে আলোর মালা। দেখে মনে হয় সকলে অনায়াসে ভুলে গেছে সব গ্লানি হতাশা। কিন্তু দেশের মানুষ কে কীভাবে জীবন যাপন করছে তাঁর খোঁজ ক’জন রাখে। প্রত্যক্ষ করলেই আসল চিত্র স্পষ্ট হয়- বিশেষ করে নিম্নবিত্ত এবং দিন মজুর মানুষগুলোকে যখন অক্টোপাশের মতো পাওনাদাররা ছেঁকে ধরে তখনই আসল চেহারা দেখা যায়। অর্থাৎ পাওনাদারদের ভয়ে তাকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়- অথবা চোখের আড়ালে যাতায়াত করতে হয়। এছাড়া অনেক অপমানও নীরবে সহ্য করতে হয়। আসলে নিম্নবিত্ত বা দিনমজুর পরিবারদের জন্য উৎসব আসা মানেই অভিশাপ বলেই মনে হয়।
সত্যি কথা বলতে কী, আমি নিজেকে দিয়েই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করছি। কেননা একটি অফিসে যখন চাকরি করতাম- তখন অভাব-অনটনের বিষয়টি নিয়ে কখনো ভাবিনি। সাচ্ছন্দে জীবন যাপন করেছি। গত পাঁচ বছর হলো চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি। তারপরই আমার পরিবারে ঘটতে থাকে একের পর এক দুর্ঘটনা। এক কথায় বলা যায়, শারীরিকভাবেও অসুস্থ হওয়ার ফলে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছি। ব্যবসার জন্য বসতবাড়ি মরগেজ রেখে ব্যাংক থেকে টাকা লোন নেয়া হয়েছিল- কিন্তু দুঃখের বিষয় নানা কারণে লাভের পরিবর্তে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ি। বিকল্প কোনো কিছু না থাকার ফলে ঋণ পরিশোধ করার জন্য বসতবাড়ি বিক্রি করার চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু আজও বিক্রি হয়নি। ফলে পাওনাদারদের শুধু অকথ্য ভাষাই নয়; বরং কারও কারও নানাভাবে হামকি-হুমকি শুনছি। অপরদিকে ব্যাংকের যে ম্যানেজার মহোদয় ঋণ দেয়ার জন্য আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। তিনিও সবকিছু জানা শোনার পরও শুধু ফোনে বলেও থামেন নি। থামাতে পারছি না। সশরীরে বাড়িতে এসে ম্যানেজার মহোদয় বলেছেন- পাঁচ ছয়টা কিস্তি দেয়া হয়নি। কোথায় থেকে কীভাবে দিবেন জানি না। আগামী পনের দিনের মধ্যে অন্তত একটা কিস্তি দিয়ে আবার এক মাস সময় নিন। তা নাহলে আমি বাধ্য হবো আইনের আশ্রয় নিতে। শেষে বাড়ি বিক্রি করতে পারবেন না ইত্যাদি।
অপরদিকে এই চরম হতাশা এবং মানসিক যন্ত্রণায় আহত পাখির মতো একেবারে অস্থির হয়ে ছুটাছুটি করছি প্রাণে বাঁচার জন্য- ঠিক সেই মুহূর্তে রাজশাহী প্রেস ক্লাবের সভাপতিসহ সাংবাদিক এবং কতিপয় সুহৃদ বন্ধু সাহায্য-সহযোগিতার জন্য হাত বাড়িয়েছেন- তা না হলে কী হতো জানি না! এ প্রসঙ্গে আর একজনার নাম উল্লেখ না করে পারছি না, কারণ এই চরম আর্থিক অভাব-অনটনের মধ্যে আমিসহ পরিবারের সকলের নিজ দায়িত্বে ক্লিনিকে ভর্তি করে চিকিৎসা করেছেন এবং এখনো করছেন। খোঁজ করলে জানা যাবে আমার মতো অনেক গরীব অসহায় মানুষের চিকিৎসা করেছেন এবং করছেন। তিনি প্রফেসর ডা. সুজিত কুমার ভদ্র, পরিচালক, বারিন্দ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (সাবেক মুক্তি ক্লিনিক), লক্ষ্মীপুর, রাজশাহী।
এমন দুঃখ-কষ্ট শুধু আমার একার নয়, খোঁজ করলে জানা যাবে- অনেকের নতুন পোশাক হয়নি এমনকি এক বেলা খাওয়াও হয়নি। নানা দুঃশ্চিন্তার মধ্যেই এলো মহামায়া মা দূর্গা। তাঁর আগমনে আনন্দের উৎসব থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না। সে জন্যেই বিশ^াস করতে হয়- সর্বময় ক্ষমতা একজনার আছে। যাকে দেখা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়।
গতবারের মত এবারও সারাদেশে দূর্গাপূজোÑ জাঁকজমকভাবেই উদযাপন হলেও হিন্দু সম্প্রদায় ভীষণ উদ্বিগ্ন। কারণ আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আন্তরিক প্রচেষ্টা আর জনগণের সহযোগিতায় সারাদেশেই নিষিদ্ধ উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীর সমর্থকদের তৎপরতা নেই বললেই চলে। তবু তাদের সমর্থকরা আত্মগোপন থেকে সুযোগ বুঝে সরকারের ভাবমূর্তি খারাপ করার জন্য কেউ অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটাবে না তা জোর করে বলা যায় না। মিরজাফরদের মৃত্যু নেই।
আমি মনে করি সঠিক সময়েই দূর্গাপূজো উদযাপিত হচ্ছে। কেননা হিন্দু ঐতিহ্য দূর্গা পৌরাণিক শক্তির এক প্রজ্জ্বলিত রূপ। তিনি তার সমস্ত অমিত শক্তির দ্বারা অসুর বধ করে মর্তের সমস্ত মানুষের কল্যাণ সাধন করেন। এই দূর্গাপূজোর মাধ্যমে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ প্রকৃতপক্ষে নানা দূর্গতি থেকে মুক্তি লাভের প্রত্যাশা করে।
দৃঢ় প্রত্যয় আছে- সুমহান ঐতিহ্যের বিন্দুমাত্র অবমাননা বিগত বছরগুলোতে হয়নি, আশা করি এবারও হবে না এবং এই মহান উৎসবের আনন্দ যাতে স্বাভাবিক ভাবে প্রবাহিত হতে পারে এবং কোনো রকম অসুবিধার সম্মুখিন হতে না হয় সেজন্য প্রশাসনের কর্মকর্তা মহোদয়গণ সব ধরনের প্রয়োজনীয় (কঠোর নিরাপত্তা)’র ব্যবস্থা করেছেন। তেমনি কয়েকদিন পূজা উদযাপনের আয়োজকদের সচেতন থাকা বিশেষ প্রয়োজন। তেমনি পরস্পর ধর্ম পালনের জন্য যথাযোগ্য মর্যাদা এবং আন্তরিকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করা দরকার। বিশেষ করে নামাজের সময় পটকা, ঢাক, ঢোল, মাইক বাজানো থেকে বিরত থাকবেন। মোটকথা অকারণে নিজেদের মধ্যে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা যেন না ঘটে। সেহেতু সামাজিকভাবে তো বটেই। এছাড়া প্রতিটি পূজো উদযাপন কমিটির কর্মকর্তা এবং সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদেরকে আন্তরিকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করা।
এই শারদীয় দূর্গা পূজা উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মিলিত হবো। অসহায় গরিব দুস্থ পরিবার বলে কোনো ভেদাভেদ থাকে না কারো মনে। আর কোনো ঝগড়া বিবাদ নয়, শুধু ভাব আর ভালবাসা। তারপরেও কথা থেকে যায়। সকলকে খুশি করলেও বিদায়ের সুরতো বেজে উঠবেই। দশমীর সকালেই ঢাকের বোলে সেই বিষ্ণতার সুর বেজে ওঠবে। তার রেশ থাকবে প্রতিমা বিসর্জন না হওয়া পর্যন্ত। এটাই স্বাভাবিক।
আমাদের এই মহান দুর্গোৎসবের আনন্দ যাতে স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে এবং কোনো রকম অসুবিধার সম্মুখিন হতে না হয়। হিন্দু সম্প্রদায়রা নিরাপদে এবং নির্ভয়ে দর্শনার্থীরা দূর্গা প্রতিমা দর্শন করতে পারে এবং সিটি কর্পোরেশন এলাকায় দূর্গাপূজা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্নের জন্য করণীয় বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
রাজশাহী সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেছেন, উৎসব আমাদের সবার সমান। দূর্গাপূজা উপলক্ষে নগর ভবনসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে আলোকসজ্জা করা হবে, প্রতিমা বিসজর্ন ঘাটে সিসি ক্যামেরা লাগানো থাকবে, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকবে- নির্বিঘ্নে নিরাপত্তায় পূজা উদযাপনের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা করা হবে। এ বছর প্রত্যেক মণ্ডপকে ১০ হাজার করে টাকা প্রদান করা হয়েছে। পরিশেষে মাননীয় মেয়র মহোদয় হিন্দু ভাই-বোনদেরকে শারদীয় উৎসবের আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান।
এই মহান উৎসবের প্রাক্কালে সমগ্র দেশবাসীর শুভ কামনা করি। প্রত্যাশা করি শারদীয় উৎসব যেন সত্যি সত্যিই আমাদের সব দুঃখ জ্বালা যন্ত্রণাকে ভুলিয়ে দেয়। সকলকে জানাই শারদীয় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
আমাদের প্রধান দূর্গোৎসব সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্নের লক্ষ্যে প্রশাসনের কর্মকর্তা মহোদয়গণ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। সেজন্যে সকলকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও শারদীয় অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা ।
লেখক: গল্পকার, নাট্যকার, কলাম লেখক।