আনন্দ যাত্রাই শেষ যাত্রা || কাঠমাণ্ডুতে প্রাণ হারালো দুই দম্পতি

আপডেট: মার্চ ১৪, ২০১৮, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ

বুলবুল হাবিব


বাম থেকে হাসান ইমাম, বিলকিস বানু, নজরুল ইসলাম ও আখতারা বেগম-সোনার দেশ

নগরীর সিরোইলের ‘জননী’ নামের ১৭২ নম্বর বাসার ছয়তলায় একটি ফ্ল্যাট নিয়ে থাকতেন দম্পতি হাসান ইমাম (৬৫) ও বেগম হুরুন্নাহার বিলকিস বানু। ভূমিমন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব হাসান ইমাম ও কলেজ শিক্ষক বিলকিস বানুর অবসরটা আনন্দেই কাটছিলো। দুই ছেলে কায়সার ইমাম ও তৌকির ইমামÑদুজনেই থাকেন কানাডায়। একবারে নির্ঞ্ঝাট জীবন। তাই সেই জীবনেই আরেকটু আনন্দের ছোঁয়া পেতে নেপাল ভ্রমণে যাচ্ছিল বন্ধু দম্পতি নজরুল ইসলাম ও আখতারা বেগমের সাথে। তাদের বাড়িও নগরীর উপশহর এলাকায়।
গত সোমবার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সাড়ে ১২টায় বেসরকারি বিমানসংস্থার ইউএস বাংলার একটি উড়োজাহাজে করে তারা রওনা দেন। নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ল্যান্ড করার সময় বিমানটি ক্রাশ করে। সেই বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন তারা। শুধু তারাই হন একই উড়োজাহাজে ছিলেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইমরানা কবির হাসি ও তার স্বামী রকিবুল হাসান। হাসি অর্ধদগ্ধ অবস্থায় বেঁচে গেলেও তার স্বামী রকিবুল চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাদের বাড়ি ছিলো সিরাজগঞ্জে।
গত সোমবার রাত সাড়ে ১০টায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্তী শাহরিয়ার আলম এমপি ফেসবুকে জীবিত ও মৃতদের একটি তালিকা দেন। সেই তালিকা থেকেই তাদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিলকিস বানুর ছোট ভাই বরেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ আলমগীর মো. মালেক জানান, আমরা নয় ভাইবোনের মধ্যে পাঁচ নম্বর হচ্ছে আমার এই বোন। তারা স্বামী-স্ত্রী দুইজনেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে পড়ালেখা করেছেন। একই ক্লাসে পড়তেন। দুলাভাইয়ের বাসা হচ্ছে দিনাজপুরে। কিন্তু অবসর জীবনে তারা রাজশাহীতেই থাকতেন। তাদের দুই ছেলে কানাডায় থাকেন। এদের মধ্যে বড় ছেলে চাকরি করেন ও ছোটটা কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএস করলেন। তারা দুইজনেই কানাডা থেকে রওনা দিয়েছেন।
তিনি জানান, আমার বোন উড়োজাহাজে উঠতে খুব ভয় পান। এই কারণে তিনি কখনো তার ছেলেদের বাসায় কানাডায় যাননি। এবার প্রথম গেলেন নেপালে বেড়াতে। তা-ও গত বছর আমি গিয়েছিলাম । আমার কথায় প্রভাবিত হয়েই তারা বেড়াতে গিয়েছিলেন।
তিনি জানান, তাদের মরদেহ আনতে আমার বড় বোনের ছেলে শেখ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন মাসুম ও দুলাভাইয়ের ছোট ভাই আলী ইমাম নেপালে গিয়েছেন। গতকাল রাতে তারা জানিয়েছেন, তারা মরদেহ শনাক্ত করতে পারেননি। কারণ মরদেহ চেনা যাচ্ছে না। এইজন্য বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তারপর মরদেহ নিয়ে আসা হবে।
উপশহর এলাকার এক নম্বর সেক্টরের ৩১৯ নম্বর বাড়িটি থাকতেন মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও আখতারা বেগম দম্পতি। দুই মেয়ের নামের নামাঙ্কিত ‘কাঁকন-কনক’ বাড়িটির দুই তলায় থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত শিল্প ব্যাংক কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম ও রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজের শরীরর্চা বিভাগের শিক্ষক (অব.) আখতারা বেগম। অবসর জীবন তাদের আনন্দেই কাটছিলো। বড় মেয়ে কাঁকনের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ে কনক ঢাকার উত্তরার উইমেনস মেডিকেল কলেজের ফোর্থ ইয়ারের স্টুডেন্ট। তারা দুইজনেই ঢাকায় থাকেন। বড় মেয়েকে বিয়ে দেয়ার পর বাবা-মা দুইজনেই বেশিরভাগ সময় ঢাকায় থাকতেন। রাজশাহীতে আসতেন ভাড়া নিতে আর বাড়িঘর দেখাশুনা করতে। গত বুধবার নজরুল ইসলাম রাজশাহী থেকে ঢাকায় যান। তার স্ত্রী আগে থেকেই ঢাকায় ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পড়াশোনা করা নজরুলের ক্যাম্পাস জীবন থেকেই বন্ধুত্ব গড়ে উঠে হাসান ইমামের সঙ্গে। তাই অবসর জীবনের পূর্ণতা নিয়ে আসতে স্ত্রীসহ দুই বন্ধু একসাথেই রওয়ানা দিয়েছিলেন নেপালে। কিন্তু দুর্ভাগ্য! চারজনই না ফেরার দেশে চলে গেলেন একেবারে। তাদের দুইজনেরই গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।
ঢাকা থেকে ফোনে নজরুল ইসলামের জামাই অ্যাডভোকেট ইমরান হোসেন জানান, মরদেহ শনাক্ত করতে নেপালে গেছেন আমার শাশুড়ির ভাই ডা. মাঈনুদ্দীন চিশতী ও তার মেয়ে নুসরাত। তারা আমাদের জানিয়েছেন, তারা নেপালে যাওয়ার পর তাদের প্রথমে আহতদের দেখতে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর সেখান থেকে মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে মরদেহ দেখতে দেয়া হয়নি। এছাড়া একটি করে ফরম পূরণ করে নেয়া হয়।