আন্তঃসম্পর্ক ও সম্প্রীতি

আপডেট: January 23, 2020, 12:19 am

শুভ্রারানী চন্দ


সমাজ পরিবর্তনশীল। সবাই এখানে বসবাস করে গভীর আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে। সমাজ বাসযোগ্য হয়ে ওঠে তখনই যখন সেখানে বসবাসকারী মানুষেরা অনাত্মীয়কে আত্মীয় করতে পারে। পরকে আপন করতে শেখে, দূরকে কাছে টানতে শেখে এবং পরস্পরকে কাছে টেনে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্রে আবদ্ধ হয় আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা এ অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন অপূর্ব সৃষ্টি। তাঁদের ছিল মূল্যবোধ, পরস্পরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। ছিল সামাজিক শিষ্টাচার। সকলের মর্যাদার প্রতি ছিল সকলে সজাগ। তাঁদের উপস্থাপন ছিল ধীর -স্থির। তাঁদের শ্লীল-অশ্লীলবোধ ছিল অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। তাঁরা মনে করতেন যে কথা শুনে আমি ব্যথিত হই সে কথা কখনো অন্যের জন্য উচ্চারণ করা উচিত নয়। যা রুচিকর ও সুনীতি সমর্থিত তাই আমাদের উচ্চারণ করা উচিত। আমরা যা কিছু বলি তা প্রমাণ করার দায় আমাদের। মানুষে মানুষে সম্পর্ক দীর্ঘস্থ হওয়া সম্ভব যখন আমরা যুক্তিসংগত কথা বলব, মানবকুলের কথা বিবেচনায় রাখবো, মানুষের সম্মানের কথা সচেতনভাবে মনে রাখবো। যদি আমরা অন্যকে সম্মান করি, তাহলে আমরাও সম্মানিত হবো।
মানুষে মানুষে পারস্পরিক সম্পর্ককে যদি আমরা দীর্ঘস্থায়ী করতে চাই তাহলে আমাদের উচিত কোনভাবে কাউবে বিব্রত না করা। অনেক চটকদার কথা বলে অন্যকে আকর্ষণ করবার চেষ্টা করেন যার পরিণতি সুখকর হয়না। কারণ চটকদার কথায় অনেক সময় খানিকটা অসত্য কথা অসাবধানতাবশতঃ স্থান করে নেয়Ñযা নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। যদি কখনো প্রতিপক্ষের সাথেও আমাদের কথা হয় সেখানেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা থাকা উচিত। আমরা যেন কোন অরুচিকর বা মানহানিকর কথা ব্যবহার না করি সেক্ষেত্রে সতর্ক থাকি। আমরা যেন সব সময় ইতিবাচক থেকে সকলের সাথে ভালো আচরণ করি। আমাদের নেতিবাচক আচরণ যেন নিজেদেরকে অন্যের কাছে হাস্যকর কিংবা হালকা করে না তোলে সে বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।
আন্তঃসম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের যথেষ্ট সহনশীল হওয়া উচিত। কারো মতামত, কথাবার্তা কিংবা চালচলন যদি আপনার পছন্দ নাও হয়, আপনাকে ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে। আপনি যদি ধীর স্থির না থেকে রেগে যান তাহলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। আমাদের মনে রাখা উচিত ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে মত পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে একথাও সত্যি কারো মতকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তার পক্ষে যথেষ্ট জোরালো যুক্তি থাকা দরকার। তর্ক-বিতর্ক বা ঝগড়া নয়, যুক্তিই নির্ধারণ করবে আপনার কথার সত্যতা।
পরমত সহিষ্ণুতা না থাকলে সম্পর্কের মিষ্টতা থাকে না। নিজের মতের প্রতি যেমন আমাদের শ্রদ্ধা থাকে তেমনি অন্যের মতামতের প্রতিও আমাদের শ্রদ্ধা থাকা উচিত। পরস্পরকে জানা বা েেবাঝার জন্য পরমত সহিষ্ণুতা অত্যন্ত জরুরি। সমাজে অনেকে একা চালার কথা ভাবে কিংবা চলতে চায়। মানুষ সামাজিক জীব, কিভাবে সে একা চলবে? চলতেই পারবে না। কারণ সমাজে বাস করে কেউ সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস করতে পারে না।
মানুষে মানুষে সম্পর্কের একটা সীমারেখা আছে। প্রত্যেককেই সেই সীমারেখা মেনে চলা উচিত। যদি কেউ সে সীমারেখা লঙ্ঘন করে কিংবা করতে চায় তাহলে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পারস্পকি সম্পর্কের ভেতরে স্বচ্ছতা থাকা দরকার। যদি সেটা না থাকে তাহলে সে সম্পর্ক জটিল হয়ে যায়। আমরা কখনো জটিল সম্পর্কে আবদ্ধ হতে চাই না। অনেকেই আমরা আমাদের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন নই বলে অকারণে অন্যের সীমারেখার ভেতরে অনধিকার প্রবেশ করে ফেলিÑযেটি আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কে ফাটল ধরায়। অনেকে আবার এ সীমারেখা নিয়ে একেবারেই ভাবেন না। ফলে তারা যত্রতত্র যার তার সাথে অহেতুক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। যাতে পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। অনেক সময় সম্পর্কের চির অবসান ঘটায়
অনেকে চাটুকারিতায় অভ্যস্ত। এ ধরনের মানুষ সযত্নে পরিত্যাজ্য। এদের চাটুকারিতায় অনেকে বিভ্রান্ত হয়- যেটি সম্পর্ক নষ্টের অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং, সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে একজন চাটুকার থেকে সাবধান থাকা উচিত।
আমাদের মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সুসম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সুন্দর সহাবস্থান তখনই সম্ভব যখন পরস্পরের ধর্মের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা থাকে। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সকলের স্বতঃস্ফূূর্ত অংশগ্রহণ আমাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সব ভেদাভেদ ভুলে আমরা সব ধর্মের সব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে সে উৎসবকে আমরা সার্বজনীন করে তুলি। পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের এটি একটি অনুষর্জ। আন্তঃধর্ম সম্প্রীতি যত বাড়বে আমাদের পারস্পরিক সহাবস্থানও তত সহজ হবে।
আমাদের সমাজ এখনও অনেকটা পশ্চাৎপদ অনেকক্ষেত্রেই। এ থেকে উদ্ধারের পথ বাতলে দিতে পারেন সেইসব মানুষ যাদের মানুষ শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। যাঁদের মানুষ অনুকরণ ও অনুসরণ করতে চান। সমাজ পরিবর্তন কিংবা সমাজে স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য ধারণ করার মানসিকতা। মানুষকে সারা জীবন পারস্পরিক সমঝোতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। একজন্যও দরকার ধৈর্য্যরে। যাঁরা রুচিশীল, ধৈর্য্যশীল যাদের হৃদ্যতা আছে তাঁরাই পারেন মানুষকে সংঘবদ্ধ করতে। যাঁরা ধীর স্থির ও ঠান্ডা মাথার মানুষ তাঁরাই পারেন অন্যকে প্রভাবিত করতে।
মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করে আপামর জন্যগোষ্ঠীকে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করতে ধৈর্য, সহনশীলতা, পরমত সহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এসবের বিকল্প নেই। আমরা মানুষকে ভালো বাসতে শিখি এবং পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলি।