আমরা ১২ই নভেম্বর স্মরণে আনি

আপডেট: নভেম্বর ১২, ২০১৯, ১:০৯ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির


১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর প্রাকৃতিক দুর্যোগ তখনকার পূর্ববাংলা বিশেষ করে উপকূলবর্তী অঞ্চলকে লন্ডভণ্ড বিপর্যস্ত করে ফেলেছিল। অনেকে বলেছিলেন, মানুষের কুকীর্তির গজব হিসেবে এই আসমানি মুসিবত। এটা যে বিজ্ঞানসম্মত অভিমত এখন আমরা তা ভালোভাবে বুঝছি।
তখনকার রাজশাহী জেলার নবাবগঞ্জ মহকুমার সাথে রাজধানী ঢাকার ত্বরিত যোগাযোগ ছিলোনা। খবরের কাগজ আসতো প্রায় দুদিন পরে ট্রেনযোগে। তাছাড়া আবহাওয়া প্রচার প্রসারের ব্যবস্থা ছিলো অপ্রতুল। টেলিভিশন তো দূরে থাক ঘরে ঘরে রেডিও ছিলো না। মানুষ দিনমান ধরে টিপটিপ বৃষ্টি আর ঝড়ো হওয়াকে বলতো ‘কাত্তিমাসের ডাওর’। পুরুষানুক্রমে প্রকৃতির এই খেলা দেখে মানুষ অভ্যস্ত ছিলো। ঘটনার পেছনের রহস্য জানার কিংবা জানানোর তেমন ব্যবস্থা ছিলো না। রোদ-বৃষ্টি, শীত-গ্রীষ্ম প্রাকৃতিক চক্র। মাঝে মাঝে এগুলো স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। মানুষ এ অবস্থা থেকে রক্ষা পাবার জন্য প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে অদৃশ্য অসীম শক্তির কাছে নানা আয়োজনে আরতি জানিয়ে এসেছে। তার অবসান কতখানি হয়েছে তার হিসেব আমরা জানি না। তবে প্রকৃতির আচরণের খেয়ালিপনার ব্যাপকতা মানুষকে ভাবিত করছে। বলা হচ্ছে, প্রকৃতির বিপরীতে দুরাচারিতা একে রুষ্ট করে তুলেছে। হয়ে উঠেছে বৈরী। এর বিরূপতা প্রতিরোধের শক্তি আমাদের সীমিত হলেও একে স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখতে আমরা নিজেদের অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। মহাশক্তিধররা এই আপ্তবাক্য মানতে রাজি নয়।
১২ই নভেম্বরের ভয়াবহতার দুদিন পরে সংবাদপত্র নবাবগঞ্জে আসলে জানা গেল, কী অকল্পনীয় দুর্যোগ হাজার হাজার মানুষের ও গবাদিপশুর মৃত্যু, উঠতি ফসল এবং বৃক্ষাদি ধ্বংস করে উপকূলকে মহাশ্মশানে পরিণত করেছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ওইসব বিপর্যস্ত অঞ্চলে সাংবাদিকগণ কোনো অপার্থিব শক্তিতে বলীয়ান হয়ে দুর্বিসহ খবর পরিবেশন করেছিলেন, তা আজো আমার কাছে বিস্ময়ের হয়ে আছে। কারণ তখনো এদেশে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার হয়নি।
তখনকার পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান আকাশ পথে বিপর্যয় দেখে গেছেন। কৃত্রিম সহানুভূতি আর অপ্রতুল সাহায্যের ব্যবস্থা করে দায় সেরেছেন। মানুষ বুঝেছে তাদের নির্মম রসিকতা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিঙড়িয়ে সব রস পাত্র ভর্তি করে পূর্ববাংলার অবহেলিত মানুষের জন্য ছোবড়া রেখে গেছে এমনিভাবে। সচেতন মানুষের বুঝতে অসুবিধা হয় না, আবেগসর্বস্ব মতবাদের প্রলেপ কাকস্য পরিবেদনা কিনা।
কথিত আসমানি বালাকে অস্বীকার না করে বলা যায়, এই যে প্রকৃতির রুদ্র আচরণ তা মানবসৃষ্ট। পবিত্র-ধর্মগ্রন্থও বলছে নিজেদের অপকর্মের দোষে মানুষ নানা প্রকৃতির ফেসাদ ডেকে আনছে।
দুনিয়া নিয়ন্ত্রক, গণতন্ত্রের ধারক বলে কথিত আমেরিকা ও তাদের দালাল মিত্র ছাড়া প্রায় গোটা পৃথিবী একাট্টা হয়েছে বায়ুস্তরের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে কার্বন নিঃসরণ যেন সীমিত থাকে। কে জানে স্বার্থপর মোড়লদের মতিগতি মানবমঙ্গলে ফিরে আসবে, না কি দানবীয় স্বেচ্ছাচারিতায় এই অতুল সুন্দর ধরাতল ধ্বংস হয়ে যাবে।
ভুক্তভোগীরা সংগঠিত হচ্ছে। শুভবুদ্ধির মানুষ শংকিত। শুভ চেতনার বাস্তবায়ন নিয়ে। হয়তো বাস্তবায়িত হবে যখন ধ্বংসের অনিবার্যতা রোধ কঠিন হয়ে পড়বে।
এই যে, অসামান্য সুন্দর পৃথিবী তার ভারসাম্য রক্ষার্থে প্রকৃতি কিছু অলিখিত বিধিমালা রেখে দিয়েছে। মানুষ তা লংঘন করলে বিপদ আসবেই। এসব বিধান মেনে চলার উপদেশ দিয়ে বেশি লাভ হয় না। কারণ ক্ষমতাবানরা স্বভাবতই স্বেচ্ছাচারী হয়।
দেখা যায়, সমাজের কিছু গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির মুখ বন্ধ করার জন্য ক্ষমতাধর ভোগবাদীরা খেতাব দেয়। বৃটিশ আগ্রাসন এবং পাকিস্তানি আধিপত্যবাদের কালে রায়বাহাদুর, খানবাহাদুর, তামঘায়ে, জুরআত, সেতারাই পাকিস্তান ইত্যাদি খেতাব মশহুর ছিল। খেতাবপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং সম্পদ পেয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে ভুলে যেতো। সুখের বিষয় সুইডিস কিশোরী গ্রেটা খেতাব গ্রহণ করতে চায়নি। ক্ষমতাবানদের ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণের অপত্যপরতা সীমিত রাখার মহৎ উদ্দেশ্যে খেতাব গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন। একজন কিশোরীর ধরিত্রীকে স্বাভাবিক রাখতে চাওয়ার এইযে সংকল্প আমরা কতজন তা করতে পারি! যদি পারতাম তবে বিশ্বজোড়া প্রাকৃতিক বিভীষিকা দেখতে হতো না। এখন সম্মিলিত প্রতিরোধের ব্যাপারে অনেকে উৎসাহী নয়। এমনকি সম্মেলনের স্থান দিতে কেউ কেউ নারাজ। অবিবেকী মানুষ তাৎক্ষণিক নগদ প্রাপ্তিতে সন্তুষ্ট। এতে যে সভ্যতা এবং শুভভাবনা টিকে থাকবে না, তা ক্ষমতাগর্বীদের চেতনায় ধরা দেয় না।
আমরা নদী-নালা জলাধার, প্রয়োজনীয় বনসম্পদ, উন্মুক্ত দিগন্ত ধ্বংসের খেলায় উম্মত্ত। এই উম্মত্ততা থামছে না। মাঝে মাঝে সরকারে চৈতন্য দেখা দেয়। ঐতিহাসিক ১২ই নভেম্বর স্মরণে রেখে আমরা যদি আমাদের মাতৃভূমিটুকুকে বাঁচানোর জন্য সংকল্পবদ্ধ হই, তবে এই দৃষ্টান্ত বিশ্বব্যাপি সমাদৃত হবে এবং আমাদের আগামী প্রজন্ম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে।
সত্তুরের ১২ই নভেম্বর সমকালীন ভুক্তভোগীদের কাছে আজো মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে আছে। তাঁরা হয়তো দুর্যোগ বহন করার ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছেন; তবে মনে রাখতে হবে মহাদুর্যোগের সামনে সে শক্তি খড়কুটোর মতো। সবার উচিত, সেই ভয়াবহতা স্মরণে রেখে নদী-নালার দখলদারিত্ব এবং বনানী ধ্বংস করা কঠোরভাবে বন্ধ করা। শোনা যায়, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল অচিরে সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে! তখন সংশ্লিষ্টদের অবিমৃষ্যকারিতা বুঝার অবকাশ থাকবে কী?
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ