আমাদের রাজনীতিকগণ

আপডেট: নভেম্বর ৫, ২০১৯, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


মানুষ বুদ্ধিবলে বিশ^জয় করেছে। সঙ্গে শক্তিরও প্রয়োজন হয়েছে। আজকে রাশিয়া-আমেরিকা কেবল বুদ্ধিবলে বিশ^ময় একাধিপত্য করছে। আইএসআই প্রধানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করে বাহাদুরি নিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তো মহাখুশি। উল্টোদিকে রাশিয়া এই হত্যার বিপরীতে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের ভাষ্য, তোমরাই যার স্রষ্টা, তোমরাই তার হন্তারক। অবিকল বিশ^সন্ত্রাসী হিসেবে খ্যাত ওসামা বিন্ লাদেনের উত্থান ও পতনের পেছনেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আজকে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি নিরস্ত্র জনগণের ওপর যে উৎপীড়ন অব্যাহত রাখার সাহস পাচ্ছে, তার পেছনেও মার্কিনিদের সমর্থন-সহযোগিতা রয়েছে। সম্প্রতি সৌদি আরবও ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, ইরানকে জব্দ করার নানা ফন্দি আঁটছে। মানুষের এই সবকিছুর মূলে রয়েছে স্বার্থপরতা, প্রভূত্ববাদী ভাবনা আর ‘সব আমার’ এমন কিছু বর্বর ভাবনা। দুর্বুদ্ধি। অসভ্য চিন্তা। খানিকটা অপ-কথা বলেন, করেন বোকামিও। তারই দু’একটি দৃষ্টান্ত নিয়ে আজকের লেখা।
সম্প্রতি সোসাল মিডিয়ায় পড়তে হলো জাসদ নেতা আসম রব বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা সরকারের পতন দেখে মরলে আমার মৃত্যু সার্থক হতো।’ জানি না আসম (এরশাদ পিরিয়ডে যাকে দেশবাসী ‘অসম’ বলেছে। কারণ তার দল বদল করে মন্ত্রী-সান্ত্রি হওয়ার এবং পদলোভ অন্তহীন।) রব সাহেব কোথায় এমন বাক্য উচ্চারণ করেছেন। তবে সোসাল মিডিয়ায় বাক্যটি ভাইরাল হওয়ায় অনেকে তার বক্তব্যের ব্যঙ্গ করে প্রতিত্তোর দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন না হলে তাকে ‘তেলেপোকা কিংবা ইঁদুর মারার বিষ খাওয়া’র পরামর্শ দিয়েছেন। দেশবাসী জানে, জনাব রব ছিলেন ছাত্র লীগের সেরা নেতা। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী। তার সমকালের অনেক নেতাই আওয়ামী বিরোধী হয়ে মুজিব সরকারের পতনের মধ্যে দিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিলেন। জাসদের সভাপতি বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ভারতের রাষ্ট্রদূত সমর সেনকে অপহরণের লক্ষ্যে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ভারতীয় দূতাবাস আক্রমণ করেছিলেন। পুলিশের প্রতিরোধে তাদের সে আক্রমণ সফল হয়নি। তাদের আরেক তাত্ত্বিক নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহের বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের মহানায়ক জিয়াউর রহমানকে বন্দিমুক্ত করে রক্ষা করেছিলেন। না হলে হয়তো জিয়া নামের কোনো শাসকই এ দেশ শাসনের সুযোগ পেতেন না। সেই জিয়াই বিচারের নামে প্রহসন করে কর্নেল সাহেবকে ফাঁসি দেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে রবের ভূমিকা অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। তিনি নিছক নেতৃত্ব “গণবাহিনী”, যাদের কাজ ছিলো গ্রামে-গঞ্জের কৃষকদের হত্যা করা। তাদের এই হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করার জন্যে বঙ্গবন্ধু অনেক বার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কর্ণপাত করেননি। চিন-আমেরিকা যেহেতু একাত্তরে পরাজিত হয়েছিলো ভারত-রাশিয়ার যৌথ আক্রমণে, তাই তাদের অর্থ ও প্ররোচণায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল নামে একটি ভূঁইফোর দলের অভ্যুদয় ঘটে বায়াত্তরে। সেই থেকে তারা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তো দূরে থাক সেই দলটি আজকে বহুধা বিভক্ত। বায়াত্তরে কারা তাদের দলে আশ্রয় নিয়েছিলো? একাত্তরের পরাজিত পলাতক যুদ্ধাপরাধীরা। তাদের লুটের অর্থ আর অস্ত্র নিয়ে গণবাহিনী দেশময় ত্রাসের সৃষ্টি করেছিলো। তাদের সন্ত্রাস-গণবিরোধী কার্যক্রমে দেশবাসী সমর্থন দেয়নি। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে এবং গণনিপীড়ন করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায়, এমন তত্ত্ব মার্কস-লেনিন দিয়েছিলেন বলে আমার অন্তত জানা নেই। তিনি যদি এখন শেখ হাসিনা সরকারের পতন দেখে শান্তিতে মরার বাসনা করেন, তাহলে সেটা হাস্যকর মনে হবে না কি? কোনো সরকার যদি গণবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে একমাত্র দেশের জনগণ। তা-ও আর দু’ভাবে। এক নির্বাচনে স্বৈরচারকে সমর্থন না করে আর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে। রব সাহেবের দল কি সে শক্তি ধারণ করে? তাদের সঙ্গে জনগণের কি কোনো সম্পর্ক আছে। তাদের আরেক নেতা প্রয়াত শাহজাহান সিরাজ চার খলিফার অন্যতম। তিনিও বিপথগামী হয়েছিলেন। বর্তমানে আরেক নেতা তো আরেক কাঠি সরেস। তিনি মাহমুদুর রহমান মান্না। মান্না একবার আওয়ামী লীগে, আরেকবার ঐক্যফ্রন্টে কখনো বা জনবিচ্ছিন্ন স্বতন্ত্র দলে। তিনি এক সময় শেখ হাসিনার মোসাহেবী করেছেন, যেই স্বার্থে আঘাত লেগেছে, অমনি ডিগবাজি খেয়ে বিএনপি’র ওপর ভর করেছেন। এখনো রবের মতো আস্ফালন করছেন। কিন্তু দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে তার মতো নেতা রব-জলিলের কাজের কাজ কিছুই করছেন না। তাহলে দেশের উন্নয়নে তাদের ভূমিকা কোথায়? দৃশ্যমান কিছুই নেই। এ জন্যেই এদের “জোকার অব দ্য ইয়ার” হিসেবে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা হয়েছে।
এক সময় দেশবাসী শুনেছে, প্রগতিশীল বামদের শ্লোগান। তারা মিছিল-মিটিং করলেই “রুশ-ভারতের দালালদের হুঁশিয়ার” করতেন। সোভিয়েত ইউনিয়নকে “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ” আর ভারতকে “সম্প্রসারণবাদ” হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বিরোধিতা করেছেন। স্বাধীনতার পর যেমন পরাজিত যুদ্ধাপরাধীরা সব কিছুতেই ভারতীয় জুজু দেখতেন, অবিকল জাসদ-চিনা বামেরাও তাই দেখতেন। সে কারণে তারা বঙ্গবন্ধুকে উৎখাতে সহযোগিতার জন্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভুট্টোকে চিঠি লিখেন। কিন্তু পাকিস্তানসহ বাংলাদেশ বিরোধীরা ষড়যন্ত্র করে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলে সামরিক সরকার কি তাদের সহায়তা করেছেন? করলে তো জলিল সাহেব একজন সাহসী সেক্টর কমান্ডার হাফেজ্জি হুজুরের বটতলায় আশ্রয় নিতেন না।
পঁচাত্তরের আগস্ট ও নভেম্বরে দেশে যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চলে, তার দায় তো এই বাম-প্রগতিশীল হিসেবে দাবিদারদের নিতে হবে। তারা বায়াত্তরে ব্যক্তি ও সরকারের বিরোধিতা না করে বিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত হতেন, তাহলে এই হত্যার সুযোগ ছিলো না। দেশ আজকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে যেতো। তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে হয়তো নেতৃত্বে তারাও অধিষ্ঠিত হতেন। দেশের মানুষ তাদের সমর্থন জানাতো। দেশে মানবতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক অপশক্তিরও উত্থান ঘটতো না। বিরোধিতার অর্থ এই নয় যে, তা জনসমর্থনের বিপরীত। নির্বাচনে পরাজিত হলেই ভোটচুরির অভিযোগ আনা এদের রাজনীতিক কার্যতালিকাভুক্ত। ভোট চুরিটাও তারা করতে সক্ষম নয়। তাই অনেক বাম আজকে আওয়ামী ছত্রচ্ছায় নির্বাচন করে মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন। জাসদের আরেক টুকরো ইনু সাহেবও তাই। অন্য টুকরো “বাসদ” নামকরণ করে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করার নামে দেশের স্বাধীনতারও বিরোধিতা করেন জামাত -বিএনপি’র সঙ্গে মিলে। কতোটা সত্য জানি না, তবে অনেকে মনে করেন, তেল-গ্যাস-বন্দর বিদ্যুৎ রক্ষার নামে জামাত-বিএনপি’র অর্থ ও জনসমর্থন নিয়ে কর্মসূচি পালন করেন। তাদের ছাত্র সংগঠনের নেতা একদিন প্রচারপত্রসহ দলের মুখপত্র “ভ্যানগার্ড” বিক্রি করতে আসে। আমি তাদের “ভ্যানগার্ডে”র ইতিবৃত্ত ও ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে কি জানে, জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলতে পারেনি ও বিক্রেতা ছাত্ররা।
অবশ্য স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে আজকে ছাত্র লীগের নেতাকে জিজ্ঞেস করলে তার সদুত্তোর দিতে পারবে না তারা। তারা পারবে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে সবাই মিলে পুকুকে নিক্ষেপ করতে। তারা কারা, যারা প্রতিষ্ঠান প্রধানকে জলে নিক্ষেপ করেছে? এরা হাইব্রিড বললে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হবে না, এরা দল ও সংগঠনের চেতনা বিরোধী। এদেরই এক অংশ বুয়েটের ছাত্র আবরারকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। শেখ হাসিনা সরকার তাদের গ্রেফতার করে বিচারের সম্মুখিন করে বলেছেন, অপরাধী যে দল ও সংগঠনের হোক, তাদের বিচার হবে। নূসরাত হত্যার বিচারের রায় সাত মাসে দেয়া হয়েছে। অপরাধীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীও আছে।
বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে সৌদি আরবে ৬০ হাজার নারীকর্মী পাঠানো হয়েছিলো। সেখানে গিয়ে অধিকাংশই যৌন হয়রানি ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেকে দেশে ফিরে এসেছেন। এই নিয়ে দেশের কোনো রাজনীতিক দল, এমন কি ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যারা নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, যারা একাত্তরে সেই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে হত্যা-ধর্ষণ আর লুটপাটে লিপ্ত হয়েছিলো, তারা পর্যন্ত নিশ্চুপ রয়েছে। এই অসভ্যতা যদি ভারতের কোনো শিল্পপতি কিংবা রাজনীতিক করতো তাহলে প্রতিবাদী মিছিলে দেশ ছেয়ে যেতো। সরকারকে পর্যন্ত তার জবাবদিহিতা দিতে হতো। সৌদি আরব একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারকে সমর্থন দিয়েছিলো। তারা এখনো বাংলাদেশকে বন্ধু মনে করে না। তারা ইরানকে জব্দ করতে ইসরায়েলের সঙ্গে আঁতাত করে। ইয়েমেনে ৭০ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। দিনের পর দিন তাদের অভুক্ত রেখে আর্ত-পীড়িতদের আহাজারি দেখে মজা পাচ্ছে। সেখানে তারা নারী নির্যাতনের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ইন্দোনেশিয়া-শ্রীলঙ্কার পর বাংলাদেশের স্বধর্মীয় নারীদের ওপরও নির্যাতন করেছে। নির্যাতিতরা সেই ক্ষত নিয়ে দেশে ফিরেছেন। সরকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করতে চান। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় তা পাঠায় দেশের শ্রমিক। নারীকর্মীদের কোনো দেশে, বিশেষ করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হলে যৌনকর্মীদের পাঠানো হোক। ওরা দিনে কাজ করবে, রাতে সৌদি শেখদের মনোরঞ্জন করবেন। আমরা প্রত্যাশা করি সরকার সুপারিশগুলো বিবেচনা করবেন।