আমি যখন তোমার বাড়ি তখন তুমি আমার বাড়ি

আপডেট: জানুয়ারি ১১, ২০১৯, ১:০৯ পূর্বাহ্ণ

সালাম হাসেমী


শ্রাবণ মাস। সারা রাত বৃষ্টি হয়েছে। এখন সকাল। সকালেও বৃষ্টি। মূষল ধারায় এক টানা সুরে ঝর ঝর করে ঝরছে। উপহার তার তেতলা বিলডিং এর ব্যালকুনীতে এসে দাঁড়িয়ে শ্রাবণের বৃষ্টি ঝরা দেখছে। বৃষ্টি তার কাছে খুবই ভালোলাগে। ড্রোইং রুম হতে একটি চেয়ার এনে এটে সেটে বসল। এমন মজার বৃষ্টির দিনে উপহারের কল্পলোকে একটি পাখি হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির পাখি এসে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে বেড়াতে লাগল। উপহারের সেই স্মৃতির পাখির ডানায় ভর করে ফিরে গেল তার ফেলে আসা কৈশোরের স্কুল জীবনে। তার কৈশোর জীবনের অম্লান স্মৃতি হল শিশির। উপহার ঢাকা মিরপুর হতে বদলী হয়ে ফরিদপুর এসে যে স্কুলে ভর্তি হল সেই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র শিশিরকে প্রথম দৃষ্টিতে তার ভালো লেগে গেল। তার নিকট পত্রের মাধ্যমে প্রেম প্রস্তাব করে সাড়াও পেল। চলল প্রেম বছরাধিকাল। এসময় কালের মধ্যে উভয়ের প্রেম গাঢ় হল। শিশির তার পত্রে কবিতা লিখে কবিতার মাধ্যেমে প্রগাঢ় ভালোবাসার কথা প্রকাশ করে। উপহার কবিতা লিখতে না পারলেও বিভিন্ন ছন্দের চরণ তার পত্রে লিখে ও ফুল অংকন করে শিশিরের মনে ভালোবাসার প্রগাঢ় ছাপ ফেলার সতত চেষ্টা চালাতো। সফলও হয়। উপহার ও শিশিরের ভালোবার নদী এক সময় টইটুম্বর হয়ে যায়। পরস্পর পরস্পরকে ব্যতীত ক্ষণকালও বাঁচতে পারে না।
সহসা উপহারের বিয়ে হয়ে গেল। সে তার নব স্বামীর হাত ধরে চলে গেল তার স্বামীর কর্মস্থলে সুদূর পাবনায়। বিয়ে পর কিছুকাল শিশিরের কথা তেমন মনে না পড়লেও যখন উপহার জানতে পারল যে তার স্বামী তাকে বিয়ে করার আগে আরো একটি বিয়ে করেছে। সে স্ত্রী বর্তমান আছে। কিন্তু সে বিয়ে উপহারের কাছে গোপন করে উপহারকে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। তখন তার স্বামীকে প্রশ্ন করল যে তার প্রথম বিয়ের স্ত্রী আছে তা না জানিয়ে তাকে কেন সে বিয়ে করেছে? বা কেনই বা সে প্রথম স্ত্রীর কথা গোপন করেছে? এবিষয় নিয়ে প্রায়ই তাদের স্বামী স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া ঝাটি হতো। যখন তার স্বামী তাকে মারপিট করত আর তখন উপহারের শিশিরকে খুব মনে পড়ত। এভাবে ২৬ বছর পার হয়ে গেল। উপহার শিশিরের স্মৃতি ভুলতে পারত না। সময় অসময় সর্বদা শিশিরকে মনে পড়ে। শিশিরকে সে ভুলতে পারে না। সেই কিশোরী বয়স থেকে শিশিরকে সে মনে প্রাণে গভীর ভালোবাসে। এত বছর পর তাকে দেখার জন্য উপহারের প্রাণ ব্যাকুল হয়ে উঠল। কিভাবে শিশিরের সন্ধান পাওয়া যাবে তা ভাবতে লাগল। ঢাকায় চাকরি করে তার এক বন্ধু আছে, নাম তার সিরাজ। সিরাজকে শিশিরের ঠিকানা অনুসন্ধান করে দিতে বলল। অনেক চেষ্টা তদ্বির করে অবশেষে শিশিরের সন্ধান পেয়ে তার মোবাইল নম্বর যোগাড় করে উহারকে দিল।
উপহার শিশিরকে মোবাইল ফোন করে তার সাথে কথা বলে নিশ্চিত হল যে এই সেই শিশির যাকে সে একদিন ভালোবেসে ছিল। ২৬ বছর পর নতুন করে পরিচিত হওয়ার পর, মাঝে মাঝেই মোবাইল ফোনে কথা হয়। প্রত্যেকে তারা একে অপরের খোঁজ খবর নেয়। পুরাতন প্রেম এই শেষ বয়েসে এসে নতুন করে পরিচয়ের মাধ্যমে আরো গাঢ় থেকে গাঢ়তর হল। তাদের বয়স এখন যে ৫০ বছর পেরিয়ে গিয়েছে সে কথা তারা ভুলে গিয়েছে। তারা এখন সর্বদা কিশোর-কিশোরীর মত সদায় স্বপ্নময় গভীর প্রেমে ডুবে থাকে। দুজন দুজনাকে দেখার জন্য মনে মনে খুবই ব্যাকুল হয়ে পড়ল, কিন্তু একে অপরের নিকট তা প্রকাশ করে নাই। শুধু মাত্র মনে মনে বলেছে। একদিন উপহার মনে মনে স্থির করল যে সে শিশিরকে না জানিয়ে তার বাড়িতে গিয়ে হঠাৎ হাজির হয়ে অবাক করে দিয়ে শিশিরের দুচোখে চোখ রেখে রাঙা ঠোঁটে হেসে বলবে,‘সারপ্রাইজটা কেমন দিলাম প্রিয়তমা?’ হঠাৎ করে উপহারকে দেখে শিশির বিস্মিত পলকহীন দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে উঠবে,‘আমি তো স্বপ্ন দেখছি না উপহার! তুমি কি সত্যিই এসেছো!’ কাছে এসে শিশির উপহারকে স্পর্শ করে বলবে,‘সত্যি কি তুমি উপহার!’ এই কথাগুলো কল্পনা করে উপহার রাত ২টার ট্রেনে উঠল ফরিদপুরের উদ্দেশে শিশিরের সাথে দেখা করার জন্য। গভীর রাতে দ্রুত গতিতে ট্রেন চলছে। ট্রেনের ঝাকুনিতে সে দুলছে। দুলতে দুলতে তার দুচোখে নিদ্রা নেমে নেমে এসেছে।
অপরদিকে শিশিরও মনে মনে স্থির করেছে যে সে উপহারকে না জানিয়ে তার পাবনার বাড়িতে গিয়ে হঠাৎ করে হাজির হয়ে উপহারকে অবাক করে দিবে। ২৬ বছর পর এভাবে তার বাড়িতে দেখে অবাক হয়ে মহা খুশিতে উল্লাসিত হয়ে দৌড়িয়ে এসে তাকে ঝাপটে ধরে বলবে,‘তুমি কি সত্যিই আমার ভালোবাসার শিশির। আমার সাথে আলিঙ্গনের পর আলিঙ্গন করে উন্মাদিনীর মত আমাকে নিয়ে তার বিছানার ওপর পড়ে যাবে। এই সব রঙিন কল্পনা করে উপহার যে দিন যে রাতে যে সময় রওয়ানা দিয়েছে সেই একই সময় শিশিরও ফরিদপুর হতে পাবনার অভিমুখে বাসে করে রওয়ানা দিল। তার চোখে এখন কেবল উপহারের স্বপ্ন। পরের দিন শুক্রবার সকাল বেলা ৯ ঘটিকার সময় উপহার ফরিদপুর রেল স্টেশনে এসে নেমে অটোবাইকে করে সরাসরি শিশিরের বাড়ি এসে পৌঁছিল। এসে দেখল ঘরের দরজায় বড় একটি চক চকে পিতলের তালা ঝুলছে। পাশের ঘরের লোকের নিকট হতে অবগত হল যে শিশির পাবনা বেড়াতে গিয়েছে। একথা শুনে উপহার অতি পুলকের স্বপ্ন আহত মনে শিকারির গুলিতে আহত পাখির মত শিশিরের উঠানে নেচা খেয়ে বসে পড়ে এক দৃষ্টিতে দরজায় ঝুলন্ত পিতলের তালার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
অপরদিকে ওই একই দিনে সকাল ১০ ঘটিকার সময় শিশির পৌঁছিল পাবনা বাস স্টেশনে। সেখান হতে রিকশা করে উপহারের বাড়িতে পৌঁছিয়ে বাড়ির লোকজনের নিকট হতে অবগত হল যে উপহার গতকাল ফরিদপুরে তার আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে। একথা শুনে শিশির ব্যর্থ মনে বুক ভরা চাপা ব্যথা নিয়ে ধীরে ধীরে ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে পাবনা বাস টার্মিনালের দিকে ফিরে যাচ্ছে। তার মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে। তার কাছে মনে হচ্ছে এই পৃথিবীটা যেন ঘুরছে। কল্পলোকের উপহারও যেন তার বুকে হাতড়ি দিয়ে আঘাত করতে করতে ঘুরতে ঘুরতে দূরে চলে যাচ্ছে। সে আঘাতের যন্ত্রণা যেন তার বুকের মাঝে মহা প্রলয়ের সিন্ধু জলের তরঙ্গের মত তার হ্নদয় নদীর তীরে আঘাত করছে। আর সেই আঘাতে সুদীর্ঘ কালের ভালোবাসার নদীর তীর ভেঙে তা নদীর অথৈ জলে বিলিন হয়ে যাচ্ছে।