আমৃত্যু পত্রিকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতে চান দিল আফরোজ খুকি

আপডেট: নভেম্বর ১২, ২০১৯, ১:১৬ পূর্বাহ্ণ

বুলবুল হাবিব


রাজশাহীর একমাত্র নারী হকার দিল আফরোজ খুকি। ষাটোর্ধ্ব এই নারী ৪০ বছর ধরে পায়ে হেঁটে হেঁটে শহর ঘুরে প্রতিদিন পত্রিকা বিক্রি করেন। যারা পত্রিকা কেনাবেচার সাথে যুক্ত তারা সবাই এক নামে চিনেন দিল আফরোজ খুকিকে। বিশেষ করে রাজশাহীর রেল স্টেশন, বাস টার্মিনাল, রেলগেট, সাহেববাজার, আরডিএ মার্কেট ও নিউ মার্কেটের দোকানদাররা সবাই এক নামে চিনেন খুকিকে।
খুকি প্রতিদিন সকালে তার নগরীর শিরোইল মহল্লার বাসা থেকে বের হয়ে হেঁটে রেলগেট মার্কেটে পত্রিকার এজেন্টদের কাছ থেকে পত্রিকা ক্রয় করেন। তারপর সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে রাজশাহীর রেল স্টেশন, শিরোইল বাস টার্মিনাল, সাগরপাড়া, আলুপট্টি, সাহেববাজার, আরডিএ মার্কেট ও নিউ মার্কেটে পত্রিকা বিক্রি করেন। এইসব স্থানে তার কিছু নিয়মিত কাস্টমার আছে তাদের কাছে পত্রিকা বিক্রি করেন আবার রাস্তায় চলাচলকৃত বা বাজারে কেনাবেচা করতে আসা মানুষদের কাছেও পত্রিকা বিক্রি করেন। এদের মধ্যে অনেকে পত্রিকা নেন আবার অনেকে পত্রিকা নেন না। তবে পত্রিকা বিক্রির বিনিময়ে তিনি কখনো অতিরিক্ত কোনো টাকা পয়সা নেননি কারো কাছে।
বৃহস্পতিবার সকালে রেলগেট মার্কেটে তার সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ১৯৮০ সালে তার স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে পত্রিকা বিক্রি করছি।’ তার দাবি পত্রিকা বিক্রির উপার্জন দিয়ে তিনি মহানগরীর শিরোইলে তার বাড়িটি তৈরি করেছেন।
দিল আফরোজ আরো বলেন, যখন ঢাকায় স্বামীর সঙ্গে থাকতেন তখন তিনি ঢাকার লালমাটিয়া কলেজে চাকরি করতেন।’
দিল আফরোজের পত্রিকা বিক্রি শুরু রাজশাহীর স্থানীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক দুনিয়া’ দিয়ে। এরপর স্থানীয় দৈনিক ‘সোনালী সংবাদ’ ‘উপচার’ ‘নবচেতনা’, ‘সানশাইন’ ও ‘সোনার দেশ’ সহ ঢাকার অনেক পত্রিকা ও ম্যাগাজিন বিক্রি করেছেন। তবে বর্তমানে পত্রিকা বিক্রি কম হওয়ায় এখন শুধু রাজশাহীর স্থানীয় দৈনিকগুলোই বিক্রি করেন।
দিল আফরোজ বলেন, আগে বেশি পত্রিকা বিক্রি হতো। লোকজনের কাছে গেলে পত্রিকা নিতো। এখন কম পত্রিকা বিক্রি হয়। লোকজন তেমন পত্রিকা কিনতে চায় না।’
তারপরও আমৃত্য এই পেশার সাথে থেকেই জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান তিনি।
পত্রিকার ক্রয় করার সময় এজেন্টদের সাথে তার লেনদেনও ভালো। টাকাপয়সা কখনো বকেয়া রাখেন না বলে জানালেন পত্রিকার এজেন্টরা। দাম পরিশোধ করেই তিনি পত্রিকা ক্রয় করেন।
রাজশাহীর স্থানীয় দৈনিক সানশাইনের সার্কুলেশন ম্যানেজার লিটন ইসলাম বাবু জানান, আমি ১৩ বছর ধরে খুকি আপাকে দেখছি আমার কাছ থেকে পত্রিকা নিতে। কখনো কোনো বকেয়া রাখেন নি তিনি। আগে টাকা পরিশোধ করে তারপর পত্রিকা কিনেন। দুই তিন বছর আগেও সানশাইন পত্রিকা নিতো একশো কপির মতো। এখন কখনো তিরিশ কপি কখনো ২০ কপি নেন।
রাজশাহীর আরেকটি স্থানীয় দৈনিক সোনালী সংবাদের সার্কুলেশন ম্যানেজার হারুণও জানালেন টাকা পয়সা পরিশোধ করেই তারপর পত্রিকা কিনেন খুকি। তার পত্রিকাও আগে দেড়শো কপির মতো কিনলেও বর্তমানে ৩০ থেকে ৫০ কপির মতো কিনেন বলেন জানান তিনি।
রাজশাহী হকার্স শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জামিউল করিম সুজন জানান, আমি ২০০০ সালে পত্রিকা বিক্রির সাথে যুক্ত হই। তখন থেকেই খুকি আপাকে দেখছি পত্রিকা কিনে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে।
তবে খুকির পরিচিত আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশিরা বলছেন, কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন এই নিঃসন্তান নারী। তার স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে আরো একগুয়ে স্বভাবের হয়ে উঠেন তিনি। বাবার কাছ থেকে পাওয়া জমিতে বাড়ি তৈরি করে একাই থাকেন। কারো কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা নেন না। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে পত্রিকা বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করেন।
একই মহল্লার সত্তরোর্ধ্ব আব্দুল কাদিরের শিরোইল বাস স্টেশনে পান বিড়ির ছোট্ট একটি দোকানও আছে। তিনি বলেন, ‘আমারই ছোট বোনের বান্ধবী খুকি। বিয়ের পর স্বামী মারা যাবার পর থেকেই সে কিছুটা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তারপর থেকে তাকে পত্রিকা বিক্রি করতে দেখি। আমিও তার নিয়মিত গ্রাহক। প্রতিদিন সকালে আমাকে পত্রিকা দিয়ে যায়’।
দিল আফরোজের বড় বোনের বাড়ি তার বাড়ির পাশেই। তার বড় বোনের ছেলে শামস উর রহমান (৫০) বলেন, খালা বহুবছর ধরে পত্রিকা বিক্রির সাথে জড়িত আছে। তাকে নিষেধ করা হলেও শুনেন না। কতজনের কাছ থেকে যে তার খালা পত্রিকা বিক্রির টাকা পাবে তার ইয়ত্তা নাই।’