আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে নতুন উদ্যোগ পোশাক শ্রমিকদের জন্য আসছে ‘ব্যাংকিং বুথ’

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের পর যুক্ত হচ্ছে ‘ব্যাংকিং বুথ’। প্রাথমিকভাবে দেশের বড় পোশাক কারখানাগুলোয় এটি স্থাপন করা হবে। পরবর্তী সময়ে সারা দেশে বুথ ব্যাংকিং ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন ধারার এ ব্যাংকিং সেবা চালুর প্রস্তুতি এরই মধ্যে চূড়ান্ত করেছে ব্যাংক এশিয়া। নতুন প্রজন্মের মধুমতি ব্যাংকও সেবাটি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যাংকিং বুথে আমানত জমা, টাকা উত্তোলন, হিসাব খোলাসহ বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রম ছাড়া সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ধারার এ ব্যাংকিং চালু হলে দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে। ‘ব্যাংকিং বুথ’ দেশের পোশাক খাতসহ ছোট-বড় শিল্প খাতগুলোয় জনপ্রিয় করে তুলতে পারলে মালিক, ব্যাংক, শ্রমিকসহ সব পক্ষই উপকৃত হবে। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে তিনটি ব্যাংকের কাছে ব্যাংকিং বুথ স্থাপনের জন্য খসড়া নীতিমালা পাঠানো হয়েছে।
সূত্রমতে, দেশের তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রদানের জন্য প্রায় দুই বছর ধরে কাজ করছে ব্যাংক এশিয়া। এজন্য ব্যাংকটি ‘আরএমজি ডিজিটাল ব্রাঞ্চ’ নামের একটি ব্যাংকিং সেবা চালুর অনুমোদন চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন পাঠায়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক আরএমজি ডিজিটাল ব্রাঞ্চ অনুমোদন না দিয়ে ‘ব্যাংকিং বুথ’ স্থাপনের প্রস্তাব দেয়।
এ প্রসঙ্গে ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আরফান আলী বণিক বার্তাকে বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে ব্যাংক এশিয়া ‘আরএমজি ডিজিটাল ব্রাঞ্চ’ নামে একটি সেবা চালুর জন্য দুই বছর ধরে কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই মডেলটি কিছুটা পরিবর্তন করে ব্যাংকিং বুথ চালু করতে বলেছে। ব্যাংক এশিয়ার পরিচালনা পর্ষদ এরই মধ্যে ব্যাংকিং বুথ স্থাপনের বিষয়টি অনুমোদন দিয়েছে। শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়ে ব্যাংকিং বুথ চালুর অনুমতি চাওয়া হবে।
তিনি বলেন, দেশের পোশাক শ্রমিকরা নগদ টাকায় বেতন গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে সবসময়ই তাদের নগদ টাকা নিয়ে ঝুঁকিতে থাকতে হয়। অনেক পোশাক কারখানায় ব্যাংকের এটিএম বুথ স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এটিএম বুথে শুধু টাকা উত্তোলন করা যায়। প্রস্তাবিত ব্যাংকিং বুথে বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রম ছাড়া সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা চালু থাকবে।
ব্যাংকিং বুথ সম্পর্কিত বাংলাদেশ ব্যাংকের খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘ব্যাংকিং বুথ’ বলতে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সময়ে সময়ে নির্দেশিত নীতি-পদ্ধতির আলোকে সীমিত পরিসরে ব্যাংকিং সেবা প্রদানের জন্য ব্যাংকের কোনো পূর্ণাঙ্গ শাখার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত স্বল্পব্যয়ী ব্যবসা কেন্দ্রকে বোঝাবে। ব্যাংকিং বুথ নিকটস্থ পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক শাখার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে। ব্যাংকিং বুথের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং নিরাপত্তাসহ বুথ স্থাপনা ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে। ব্যাংকিং বুথের ফ্লোর স্পেস হবে অনধিক এক হাজার বর্গফুট। এ বুথের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য কমপক্ষে দুজন কর্মকর্তা নিযুক্ত থাকবেন। ব্যাংকিং বুথ স্বল্পব্যয়ী ব্যাংকিং সেবা আউটলেট হিসেবে গণ্য হবে। এজন্য প্রচলিত শাখাভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার জন্য নির্ধারিত ফি, চার্জ, কমিশনের চেয়ে ব্যাংকিং বুথে সেবা প্রদানের ফি কম হবে। কোনোভাবেই এসব ফি বেশি হবে না।
ব্যাংকিং বুথ কর্তৃক খোলা যেকোনো ব্যাংক হিসাব নিয়ন্ত্রণকারী শাখার হিসাব বলে গণ্য হবে। হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কেওয়াইসিসহ প্রচলিত বিধিবিধান যথাযথভাবে পরিপালন করতে হবে। ব্যাংকিং লেনদেনসহ বুথের সামগ্রিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণকারী শাখার বুকস অব অ্যাকাউন্টসে অন্তর্ভুক্ত হবে। ব্যাংকিং বুথের ক্যাশ ইন ট্রানজিট ও ক্যাশ অন কাউন্টারের বীমা আচ্ছাদন নিশ্চিত করতে হবে। নগদ অর্থ ও গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট ব্যাংকিং বুথে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ভল্ট স্থাপন করা যেতে পারে।
নীতিমালায় আরো বলা হয়েছে, ব্যাংকিং বুথের সব ব্যাংকিং লেনদেন রিয়েল টাইম বেসিসে সম্পাদিত হবে এবং গ্রাহকদের তাৎক্ষণিকভাবে এসএমএস ও প্রিন্ট রসিদ প্রদান করতে হবে। ব্যাংকিং বুথে প্রদত্ত ব্যাংকিং সেবার পরিসর এবং যেকোনো লেনদেনের ঊর্ধ্বসীমা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। এ ধরনের বুথে বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত কোনো কার্যক্রম সম্পাদন করা যাবে না। ব্যাংকিং বুথকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইসিসি গাইডলাইনস ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার আলোকে ব্যাংকের নিরীক্ষা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে। মানি লন্ডারিং ঝুঁকি এড়ানোর জন্য প্রচলিত বিধিবিধানের আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যাংকিং বুথের সেবা প্রদান সময় হবে স্বাভাবিক ব্যাংকিং সময়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে ব্যাংক তার ব্যবসা ও গ্রাহকসেবার স্বার্থে অন্য সময়েও ব্যাংকিং বুথ খোলা রাখতে পারবে।
নিরবচ্ছিন্ন ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং বুথে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসংবলিত তথ্যপ্রযুক্তি কাঠামো থাকতে হবে বলেও নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকের নাম ও ব্যাংকিং বুথযুক্ত নামের সাইনবোর্ড ব্যাংকিং বুথের বাইরে সহজে দৃশ্যমান হয়, এমন স্থানে স্থাপন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ব্যতীত নতুন ব্যাংকিং বুথ চালু ও বিদ্যমান ব্যাংকিং বুথ স্থানান্তর বা বন্ধ করা যাবে না। যেকোনো দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ব্যবসা চলমান পরিকল্পনা থাকতে হবে। কোনো কারণ দর্শানো ব্যতিরেকেই যেকোনো সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ব্যাংকিং বুথের’ অনুমোদন বাতিল করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে বলে নীতিমালায় যুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে প্রস্তাবিত ব্যাংকিং বুথের মৌলিক তফাত হলো মালিকানার প্রশ্ন। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে আউটলেটের মালিকানা এজেন্টের হাতে থাকে। এজেন্টই আমানত সংগ্রহ, নগদ প্রদান, ঋণ বিতরণসহ সব কাজ করে। কিন্তু বুথ ব্যাংকিংয়ের মালিকানাসহ যাবতীয় কার্যক্রম সরাসরি ব্যাংক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হবে। বড় কোনো কারখানা বা শিল্পাঞ্চলে ব্যাংকিং বুথ চালু করা সম্ভব হলে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয় পক্ষই উপকৃত হবে।