আলোর ফেরিওয়ালা পলান সরকার আর নেই, প্রধানমন্ত্রীর শোক প্রকাশ || আজ সকাল ১০টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন

আপডেট: মার্চ ২, ২০১৯, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক ও বাঘা প্রতিনিধি


স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে বই উপহারের মাধ্যমে কার্যক্রমের শুরু। ক্রমান্বয়ে পাড়া-মহল্লার সবাইকে বই বিলি করতেন। ধীরে ধীরে তা গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। পায়ে হেঁটে হেঁটে গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি বই হাতে পৌঁছে দিতেন ছোট-বড় সবার দোরগোড়ায়। এভাবে টানা ত্রিশ বছর তিনি বই বিলি করেছেন। এভাবেই সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন। বই বিলির মাধ্যমে কার্যত তিনি আলোরই ফেরি করে বেড়াতেন। একুশে পদকপ্রাপ্ত সেই আলোর ফেরিওয়ালা পলান সরকার আর নেই। তিনি আর কখনো বই হাতে গ্রামে গ্রামে ঘুরবেন না, পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দিবেন না।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে ৯৮ বছর বয়সে বাঘার বাউসা পূর্বপাড়া নিজ বাড়িতে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। মৃত্যুকালে তিনি ছয় ছেলে ও তিন মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও আত্মীয়-স্বজন রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের নেতাকর্মীরা শোকপ্রকাশ করেছেন।
এর আগে গত বছরের ২১ ডিসেম্বর পলান সরকারের স্ত্রী রাহেলা বেগম ৮৫ বছর বয়সে মারা যান। পলান সরকারের ছেলে হায়দার আলী জানান, বার্ধক্যজনিত কারণে কয়েক দিন ধরে তার বাবা শয্যাশায়ী ছিলেন। কাল (আজ) শনিবার হারুনুর রশিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে পলান সরকারের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান তিনি।
পলান সরকারের জন্ম ১৯২১ সালে। তার আসল নাম হারেজ উদ্দিন। তবে পলান সরকার নামেই তাকে চেনে দশ গ্রামের মানুষ এবং সারা দেশ। জন্মের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় তার বাবা মারা যান। সংসারে টানাটানির কারণে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই পড়াশোনায় ইতি টানতে হয় তাকে। তবে নিজের চেষ্টাতেই চালিয়ে যান পড়ালেখা। স্থানীয় একটি উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন পলান সরকার। তিনি ছিলেন বইপাগল মানুষ। প্রতিবছর স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যারা ১ থেকে ১০-এর মধ্যে মেধা তালিকায় স্থান পাবে, তাদের তিনি একটি করে বই উপহার দিতেন। এখান থেকেই শুরু হয় তার বই বিলির অভিযান। এরপরে তিনি সবাইকে বই দিতেন। ডাক্তারি পরীক্ষায় ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর নিজেই হেঁটে হেঁটে বই বিলি করতেন। একটানা ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে করেছেন এই কাজ। রাজশাহী অঞ্চলের বেশ কয়েকটি গ্রামে তিনি গড়ে তুলেছেন বই পড়ার এক অভিনব আন্দোলন। প্রকৃতঅর্থে পলান সরকার ছিলেন চলমান লাইব্রেরি। আর এই লাইব্রেরির হাজার হাজার পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দিতেন পলান সরকার।
তবে শেষের দিকে পলান সরকার বই পড়ার আন্দোলনটাকে শুধু তার পাঠাগারকেন্দ্রিক না রেখে একটু অন্যভাবে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। আগে তিনি শুধু বাড়ি বাড়ি গিয়েই বই দিয়ে আসতেন। পড়া শেষ হলে পুরোনো বইটা নিয়ে নতুনটা দিয়ে আসতেন। কয়েক বছর থেকে তিনি বই বিতরণের জন্য এলাকাভিত্তিক পাঁচটি বিকল্প বই বিতরণ কেন্দ্র তৈরি করেন। এ জন্য কোনো বাজারের বইপ্রেমী কোনো দোকানিকে তিনি বেছে নেন। দোকানমালিক তার দোকানে মালামালের পাশাপাশি পলান সরকারের বইও রাখেন। সেখান থেকে স্থানীয় লোকজন বই নিয়ে যান। পড়া বই তারা নিজেরাই আবার ফেরত দিয়ে নতুন বই নিয়ে যান। মাসে এক-দুবার করে পলান সরকার দূরবর্তী এই কেন্দ্রগুলোতে ছেলের সঙ্গে মোটরসাইকেলে চেপে গিয়ে নতুন বই দিয়ে পুরোনো বই নিয়ে আসতেন। একইভাবে অন্য কেন্দ্রে গিয়ে বইগুলো বদলে নিয়ে আসতেন। তবে এই কাজগুলো ছেলে হায়দার আলীকে দিয়েই বেশি করাতেন। এ ছাড়া পাঠাগারে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন। পুরস্কার হিসেবে তাদের হাতেও পলান সরকার বই তুলে দিতেন।
নিজের টাকায় বই কিনে পাঠকের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বই পড়ার আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য পলান সরকার ২০১১ সালে একুশে পদক পান। এছাড়া ২০০৭ সালে সরকারিভাবে তার বাড়ির আঙিনায় একটি পাঠাগার করে দেয়া হয়। তাঁকে নিয়ে ‘সায়াহ্নে সূর্যোদয়’ নামে শিমুল সরকার একটি নাটক নির্মাণ করেছেন। দেশের জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকগুলোতেও তাকে নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়। ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষে বিশ্বের ভিন্ন ভাষার প্রধান প্রধান দৈনিকে একযোগে পলান সরকারের বই পড়ার এই আন্দোলনের গল্প ছাপা হয়। সারা পৃথিবীর ৪০টি প্রধান দৈনিকে লেখাটি ছাপা হয়। সারাদেশে পলান সরকারকে বহুবার সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে।
তার ৬ ছেলের মধ্যে বড় ছেলে মোজাফফর হোসেন বাউসা মহাবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, দ্বিতীয় ছেলে আবিবুর রহমান বাউসা মহাবিদ্যালয়ের কর্মচারী, তৃতীয় ছেলে আবদুল হানিফ খোর্দ্দ বাউসা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক, চতুর্থ ছেলে আবদুল হাকিম ভূষিমাল ব্যবসায়ী, ৫ম ছেলে হায়দার আলী খাগড়বাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক, ৬ষ্ঠ ছেলে আবদুর রশিদ রবি মোবাইল ফোন কোম্পানির প্রকৌশলী। আর তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে রাবেয়া খাতুন, দ্বিতীয় মেয়ে রাজিয়া খাতুন ও তৃতীয় মেয়ে রোকিয়া খাতুনও বিবাহিত। এর মধ্যে রাবেয়া ও রাজিয়ার স্বামী ইতোমধ্যে মারা গেছেন। তবে ছোট মেয়ে রোকিয়া খাতুন এমএ পাশ করে স্বামীর সংসার করছে। মেয়েদের নিজ এলাকায় বিয়ে দেয়া হয়।
তার মৃত্যুতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতক সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে।
রাসিক মেয়র : একুশে পদকপ্রাপ্ত পলান সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য ও নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। গতকাল শুক্রবার এক শোক বার্তায় তার শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন মেয়র। শোক বার্তায় মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, পলান সরকার অত্যন্ত সাদা মনের মানুষ ছিলেন। গ্রামে গ্রামে বই বিলি করে বইপড়া আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেলেন তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী : একুশে পদকপ্রাপ্ত পলান সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি ও মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
গতকাল শুক্রবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এক শোক বার্তায় বলেন, পলান সরকারের মৃত্যুতে জাতি একজন বিশিষ্ট সমাজকর্মীকে হারালো। পলান সরকার রাজশাহীর ২০টি গ্রামজুড়ে গড়ে তুলেছিলেন অভিনব শিক্ষা আন্দোলন এবং নিজের টাকায় বই কিনে পড়তে দিতেন পিছিয়ে পড়া গ্রামের মানুষকে। তাঁর অবদান রাজশাহীর মানুষসহ বাঙালি জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে বলেও উল্লেখ করেন শাহরিয়ার আলম।
আরইউজে : বইপড়া আন্দোলনের কারিগর একুশে পদকপ্রাপ্ত পলান সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন (আরইউজে)। গতকাল শুক্রবার এক শোকবার্তায় আরইউজে সভাপতি কাজী শাহেদ এবং সাধারণ সম্পাদক তানজিমুল হক বলেন, দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে রাজশাহীর বাঘার প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বই বিতরণ করেছেন পলান সরকার। ছড়িয়েছেন জ্ঞানের আলো। একারণে তিনি ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ নামে দেশ-বিদেশে খ্যাতি লাভ করেন। তার মৃত্যু সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তার মহৎ কর্মকাণ্ড এ দেশের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণে রাখবেন। আরইউজে সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পলান সরকারের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
নগর ছাত্রদল : একুশে পদকপ্রাপ্ত সমাজসেবী পলান সরকারের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ও মরহুমের শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন নগর ছাত্রদলের সভাপতি আসাদুজ্জামান জনি, সিনিয়র সহ-সভাপতি মুর্ত্তজা ফাহিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মাকসুদুর রহমান সৌরভ, সহ-সভাপতি সারওয়ার জাহান শিবলী, গোলাম রাব্বানি, যুগ্ম সম্পাদক আকবর আলী জ্যাকি, নাহিন আহম্মেদসহ নগরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, থানা, ওয়ার্ড ছাত্রদলের সকল নেতৃবৃন্দ।
এছাড়া তার মৃত্যুতে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক এস এম আব্দুল কাদের, বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিন রেজা, উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট লায়েব উদ্দীন লাভলু, আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বাবুল, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শফিউর রহমান শফি, বাউসা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শোক সপ্তন্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। শোক জানিয়েছেন, বাঘা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবদুল লতিফ মিঞা, সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান, বাঘা উপজেলা জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার সভাপতি আমানুল হক আমান, সাধারণ সম্পাদক লালন উদ্দীন পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ