আলো পরি ভালো পরি

আপডেট: আগস্ট ১০, ২০১৯, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ

শাশ্বতী চন্দ


সে ছিল এক আলোপরি। রূপে আলো করে রেখেছিল চারপাশ। শুধু রূপই বা কেন,স্বভাবটাও তার আলোর মত ছিল। ঝলমলে,হাসিখুশি। তার সামনে এসে দাঁড়ালেই যে কারো মন ভালো হয়ে যেত।
আর ছিল ভালোপরি। ভালোমানুষীতে মাখানো গোলগাল মুখটা দেখলেই যে কেউ বলবে, আহা এ যে বড্ড ভালো। সাধ যায়, দুদন্ড পাশে বসি। ভালোবাসি।
ওই যেখানে মেঘেরা ওড়ে সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে, আবার কখনো বা ঝলকে ঝলকে জল ঝরায়, ওই যেখানে ঝলমলে রামধনু আকাশের এমুড়ো থেকে ও মুড়ো পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয় মায়া মায়া সুখ, তার ওপরেই আলোপরি আর ভালোপরিদের দেশ। সে এক অপূর্ব দেশ বটে। দিনের বেলা মনে হয় অজস্র সোনার জরি যেন কেউ উপুড় করে দেয়। আর রাতে দুধ সাদা জ্যোৎস্না ফিনকি দিয়ে ছোটে। তার নিচে পাতা থাকে যেন ফুলের গালিচা। পরিরা সব উড়ে উড়ে ফুলের মধু খায়। জোছনার শোভায়,ফুলের হাসিতে আর পরিদের রূপের আলোয় সে এক চোখজুড়ানো মনভোলানো দৃশ্য।
আবার কখনো ভেসে বেড়ানো মেঘ ঝুপুর ঝুপুর করে ঝরিয়ে দিত বৃষ্টি। হীরকখন্ডের মত বিন্দুজলে ঝলসাত আলো। কেমন যেন রূপকথার মত সুন্দর হয়ে উঠত চারপাশ।
এমনই এক বর্ষার রাতে ফুলের ওপর উড়ে উড়ে খেলছিল আলোপরি আর ভালোপরি। কী যে মনে হল আলো পরির, দুম করে চড়ে বসল একটা বৃষ্টিদানার ওপর। পরীদের তো ওজন থাকেই না বলতে গেলে। বৃষ্টিদানাটা তাই আলোপরিকে পিঠে নিয়েই সর সর করে নেমে যেতে লাগল।
ভালোপরি প্রথমটায় হকচকিয়ে গিয়েছিল। ও সই কী করিস? ও সই যাস না ভাই বলে খানিক কাঁদাকাটা করার পর মনে হল, আলো সই তো বিদেশ বিভূঁইয়ে একা পড়ে যাবে। তাই সে নিজেও চড়ে বসে আরেকটা বৃষ্টিদানার ওপর। ব্যাস। সরসর করে নামতে লাগল সেও।
নরম ঘাসের গালিচায় ঝরে পড়ে দুজনে অবাক হয়ে দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চারদিকে তাকিয়ে দেখল, এও তো বড় সুন্দর দেশ। সবুজ ঘাস। ঝোপঝাড়। বড় বড় গাছের জঙ্গল। রূপার ফিতের মত নদী একা একা বয়ে চলেছে গান গাইতে গাইতে। ঝিমঝিমে জ্যোৎস্নায় দেখা যাচ্ছে ফুটে আছে কত ফুল।
ভালোপরি বলল, এই দেশের নাম নিশ্চয় পৃথিবী। আমি শুনেছি এই দেশের নাম আমার ঠাকুমা স্বপ্নপরীর কাছে।
আলোপরি বলল, বেশ সুন্দর। আমরা মাঝে মাঝে ঘুরতে আসব। বুঝলি সই।চল এখন কিছু মধু খেয়ে আসি। বহুক্ষন কিছু খাইনি। খিদে পেয়েছে।
যেই না দুজনে উড়তে যাবে, একি? ডানাদুটো ভিজে যে ঝুপ্পুস হয়ে নেতিয়ে গেছে। এ ডানা দিয়ে তো ওড়াই যাবে না।
ভালোপরি কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, আমাদের পরিদেশে তো এমন হয় না। কত তো ভিজি আমরা, বৃষ্টিতে, শিশিরের জলে। কই ডানা ভিজে এমন ল্যাবদু গোবর তো হয়ে যায় না।
আহা, সব দেশের তো আলাদা আলাদা নিয়ম আছে। এখানে হয় তো এমনই হয়। আলোপরি বলল।
কী হবে তাহলে এখন? কী করে ফিরব আমরা নিজেদের দেশে? সারা জীবন এই বিদেশেই পড়ে থাকতে হবে নাকি? তোর জন্য, বুঝলি তোর জন্য এই বিপদ হল। তুই কেন যে বৃষ্টিদানার ওপর চড়ে বসতে গেলি। ভালোপরি ডাক ছেড়ে কাঁদতে শুরু করে প্রায়।
হয়েছে হয়েছে, ফ্যাচকাঁদুনি , আর কাঁদতে হবে না। আমি নাহয় এলাম । তুই এলি কেন পিছন পিছন?
তোকে কি আমি একা যেতে দিতে পারি? কী জানি কত বিপদ আছে বিদেশ বিভূঁইয়ে। তুই যে আমার সেরা সখী, প্রাণের সখী।
তারপর দুজনে গলা জড়াজড়ি করে খুব হাসে। এত হাসে এত হাসে যে চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে মুক্তাবিন্দুর মত জল। তারপর এ ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে চুপ করে বসে থাকে।
আলোপরি বলে, শোন সই। আমাদের ডানাদুটো খুলে চল ওই ঝোপের ওপর মেলে দিই। রোদ উঠলেই ডানা শুকিয়ে যাবে। তারপর আমরা ফিরে যাব নিজেদের দেশে। ততক্ষনে চল একটু চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখি। আবার কবে আসা হয় না হয়।
সেই বনের পাশেই কুটির বেঁধে থাকত গোপাল আর তার বোন সুধা। ওদের বাবা মা দুজনেই মারা গিয়েছে বাজের আঘাতে। আর কোনো আত্মীয় স্বজন নেই ওদের। থাকার মধ্যে আছে দুটো গরু। তাদের যতœ করে গোপাল। মাঠে চরায়। দুধ দোওয়ায়। আর সেই দুধ দিয়ে দৈ, ঘি, পায়েস বানিয়ে হাটে বিক্রি করে ওরা চাল কেনে। কাপড় কেনে।দুই ভাই বোনেরই তো পড়াশোনার বয়েস। খেলাধুলা করার বয়স। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে কাজ করে খেতে হয় তাদের।
এবার সেই গোপাল ভোর হতে না হতে গরু দুটোকে বনে চরাতে নিয়ে এসেছে। ঝোপের ওপর এগুলো কী? রূপার পাতের মত ঝলমল করছে? কৌতূহলী হয়ে এগোতেই দেখে, ওমা। এ যে দেখি দূটো ডানা। চকচকে ফিনফিনে সুন্দর দুটো ডানা। কার ডানা? প্রজাপতির? না। প্রজাপতির কি এত সুন্দর ডানা হয়? ডানাদুটো তুলে বোনকে দেখানোর জন্য গোপাল দে দৌড় দে দৌড়।
এদিকে আলোপরি আর ভালোপরি ভাবল, অনেক ঘোরাঘুরি হয়েছে। এবার গিয়ে দেখি ডানা দুটো শুকিয়েছে কিনা। এবাবা। গিয়ে তারা চমকে গেল। ঝোপের ওপর ডানা তো নেই। শুধু ডানায় লাগানো সোনার ছোট ছোট ফুলগুলো দু চারটে ঝরে পড়ে আছে ঘাসের ওপর। যেন বা সোনার ফুল ফুটেছে ঘাসে।
ভালোপরি এবার সত্যি সত্যি ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল, কে চুরি করল আমাদের ডানা? এবার কী করে ফিরব? আর কি দেখা হবে না গোলাপসই পদ্মসইয়ের সঙ্গে?
কান্না তো এবার আলোপরিরও পাচ্ছে। কিন্তু হাল ছাড়লে তো হবে না। তাই ভালোপরিকে টানতে টানতে চলল ডানা খুঁজতে।
বেশিক্ষণ খুঁজতেও হল না। একটু দূরেই কুটিরের কাছে এসে শুনতে পেল একটা বাচ্চা মেয়ের গলা, ডানাদুটো সত্যি খুব সুন্দর দাদা। কিন্তু এই ডানা দেখে বাড়িতে নিয়ে এলি বলে গরু দুটো যে পালিয়ে গেল। দুধ না হলে আমরা খাব কী বলতো?
জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল আলোপরি আর ভালোপরি। ঘরের মধ্যে দাড়িয়ে আছে দুটো ছোট ছোট ছেলে মেয়ে। দুজনের হাতে দুটো ডানা। ওদের ডানা। হই হই করে ঘরে ঢুকে পড়ে আলোপরি আর ভালোপরি, ওগুলো আমাদের ডানা। দাও। দাও। ইশ! বললেই হল তোমাদের ডানা! তোমরা কে তাই তো জানি না। মেয়েটি গলা বেঁকিয়ে বলল। আমরা পরি।ওগুলো আমাদের ডানা।ভিজে গিয়েছিল বলে শুকাতে দিয়েছিলাম। তোমরা পরি? অবশ্য পরির মতই সুন্দর তোমরা। তবু তো বিশ্বাস করব না তোমরা পরি যদি না প্রমাণ দাও।
প্রমাণ? প্রমাণ? পরি হওয়ার জন্য যে প্রমাণ দিতে হয় তাই তো আলো পরি ভালোপরি জানত না। ভালোপরি বলল, কী করে প্রমাণ দেব বলো?
মেয়েটি বলল, আমরা বড় দুঃখী। আমি সুধা। আর এ আমার দাদা গোপাল। তোমাদের ডানা পেয়ে খুশিতে এত মশগুল হয়েছিল দাদা যে গরুগুলোকে ছেড়েই চলে এসেছে বাড়িতে। গরুগুলো যে হারিয়ে গেল। আমি গরুর দুধ থেকে দৈ,পায়েস, রাবড়ি বানিয়ে বিক্রি করেই তো চাল ডাল কিনতাম।এবার যে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে। তোমরা যদি পরিই হবে তাহলে আমাদের এত সোনাদানা মনিমানিক্য দাও যাতে আমাদের সারাজীবন আর খাওয়ার কষ্ট না থাকে। এবাবা। সোনাদানা মনিমানিক্য আমরা কোথায় পাব? আমাদের ডানাতে কিছু সোনার ফুল আছ সেগুলো নিতে পার। নেবে?
ধুস। ওই টুকু সোনায় কী হবে? কেন? পরিরা শুনেছি নানা জাদু জানে। জাদু করে এনে দিতে পারবে না?
না না। ওই সব জাদু টাদু আমরা কেন, কোনও পরিই জানে না। ওগুলো মানুষের বানানো কথা।
তবে? কাঁদো কাঁদো হয়ে ওঠে সুধা, আমরা খাব কী?
ভালোপরির বড্ড মায়া হল সুধার করুণ মুখটা দেখে। বলল, তোমাদের উঠানে স্থলপদ্মের গাছ দেখছি। আনো দেখি কিছু পদ্মফুল পেড়ে।দেখি কী করা যায় তোমাদের জন্য। ভেবো না। তোমাদের ব্যবস্থা না করে আমরা যাব না।
পদ্মফুল পেড়ে গোপাল সাজি ভরে সাজিয়ে দিল। সেই পদ্মফুলের মধু বের করে আনল ভালোপরি বিশেষ কৌশলে। তারপর পদ্মপাতার ডোঙায় ভরে সুধার হাতে দিয়ে বলল, যাও দেখি এবার। বিক্রি করে এসো।
সে দেশের রাজার, একমাত্র ছেলে, নয়নের নিধি, বুকের পাঁজর। তার অরুচি রোগ হয়েছে। রাজভোগে, দুধে পায়েসে, পুষ্পান্নে সব দেখলেই সে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। রাজা বললেন, যাও তবে হাটে। কী খেতে ভালো লাগে নিজেই দেখে খেয়ে এসো।
রাজপুত্র চলল হাটে। মিষ্টান্ন,মাছ, রাবড়ি, সন্দেশ, কিছুই তার খেতে ইচ্ছেই করছে না। থেমে গেল সুধার সামনে, তরল সোনার মত কী এটা বিক্রি করছ মেয়ে তুমি?
সুধা ভয়ে ভয়ে বলল, এটা মধু। পদ্মমধু।
পদ্মমধু? আগে তো শুনিনি । দাও তো একটু চেখে দেখি।
একটু পদ্মমধু জিভে নিয়েই আনন্দে চিৎকার করে উঠল রাজপুত্র, উফফ। এতো অমৃত। দাও দেখি ব্যাপারি, তোমার ওই সাদাফুলের মত খই। মেখে খেয়ে দেখি পদ্মমধুর সঙ্গে।
দুগ্রাস খেয়েই রাজপুত্র বলল তার আশেপাশের সেপাই সামন্তকে, এত ভালো জিনিস থাকতে তোমরা আমাকে ওইসব হাকরুপাকরু জিনিস দিতে খেতে? উফফ। সবগুলোকে পদ্মকাঁটা দিয়ে খোঁচা দেওয়া উচিত।
রাজা তো কাছাকাছিই ছিলেন। খবর পেয়ে এসে হাজির হলেন। রাজাকে দেখে রাজপুত্র বলল, বাবা, আমি রোজ খাব এই জিনিস।
নিশ্চয়। অবশই। রাজা খুশি মনে বললেন, ও মেয়ে। তুমি রোজ বানিয়ে দেবে। কেমন? বলো এবার কী চাই তোমার? সোনাদানা, মনিমানিক্য? সুধা হাতজোড় করে বলল, না রাজামশাই। ওসব চাই না। আমাকে একটা পদ্মবাগান বানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন দয়া করে?
রাজা বললেন, সে আর এমন কথা কী? আমারই তো একটা পদ্মবাগান আছে। রাজপ্রাসাদের লাগোয়া। স্থলপদ্মের গাছ প্রচুর। ভিতরে দিঘি আছে। তাতে জলপদ্ম ফুটে থাকে অসংখ্য। সেই বাগানটা তোমাকেই দিলাম হে।
খুশিতে নাচতে নাচতে ঘরে ফিরল সুধা। দাওয়ায় চুপ করে বসেছিল আলোপরি আর ভালোপরি, সুধার ফেরার অপেক্ষাতেই। তাদের সব বলল সুধা।
আলোপরি বলল, সোনাদানা মনিমানিক্য নিলে না তবে?
না গো। মধুর চেয়ে দামি কোনো সোনা হয়? আর ভালোবাসার চেয়ে সুন্দর মনি মানিক্য? আমি সেগুলোই নিয়েছি। আমি তো তোমাদের পেয়েছি। এবার আমাকে পদ্মমধু বানানোর কৌশল আরেকটি বার শিখিয়ে দাও।
আলোপরি ভালোপরি গলা মিলিয়ে বলল, নিশ্চয়।
সুধাকে পদ্মমধু বানানোর কৌশল শিখিয়ে,পিঠে ডানা লাগিয়ে আলোপরি আর ভালোপরি নিজেদের দেশে ফিরে গেল চোখ মুছতে মুছতে। চোখ তো মুছবেই। মাত্র একদিনেই বড্ড মায়া পড়ে গিয়েছিল যে সুধা আর গোপালের ওপর।
এখন গোপাল আর সুধা পদ্মবাগানের ভিতরই কুটির বেঁধে থাকে। সকালে উঠেই গোপাল তুলে আনে পদ্মফুল। না । সব আনে না। সব তুলে নিলে গাছের কষ্ট হবে না বুঝি?
তারপর সেই পদ্মফুল থেকে মধু তৈরি করে ডোঙায় ঢেলে ঢেলে রাখে সুধা। প্রথম ডোঙাটা রাজার বাড়ি পাঠায়। রাজপুত্রের জন্য। বাকিগুলো, না না, সে আর হাটে গিয়ে বসে না, লোকে ঘরে এসে কিনে নিয়ে যায়।
বাকি সময় সুধা পদ্মবাগানে ঘুরে বেড়ায়, গাছের যতœ নেয়, ভাত রাঁধে, পদ্মমধু দিয়ে মেখে খায় খুব সুখে।
আলোপরি ভালোপরি কিন্তু সুধা গোপালকে ভোলেনি। প্রতি পূর্নিমায় তারা তাদের রূপালী ডানায় ভর করে নেমে আসে পদ্মবাগানে। উড়ে উড়ে মধু খায়। সুধা আর গোপাল এসে বসে বাগানের মাঝে। তাদের হাসিতে বাগান ঝনঝন করে বাজে।
কী? দেখতে ইচ্ছে করছে জ্যোৎস্নায় পদ্মফুলের ওপর উড়ে বেড়ানো আলোপরি আর ভালোপরিকে? চোখ বন্ধ করো। আঙুল রাখো দুচোখের ওপর। দেখতে পেয়েছ? জানতাম পাবে।