ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ করে হোক উন্নয়নের সূচনা

আপডেট: জুন ১১, ২০১৯, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


বাংলাদেশ, আমাদের প্রিয় জন্মভূমিকে আমরা গর্ব করি। গানের সুরে উচ্চারণ করি : ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা, তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা, ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি এ দেশ স্মৃতি দিয়ে ভরা/ এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’ এই স্তুতি-ভালোবাসা থেকেই আমরা সহ¯্র কণ্ঠে গেয়ে উঠি, ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা/ তোমাতে বিশ^ময়ী, তোমাতে বিশ^মায়ের আঁঁচল পাতা,…’
প্রত্যেকেই বোধহয় নিজের জন্মভূমি নিয়ে এমন প্রশংসা আর তার প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হতে পারলেই পরিতৃপ্তি বোধ করে। আনন্দ খুঁজে পায়। দেশ ও মানুষ সম্পর্কে এতো স্তুতিবাক্য, আনুগত্য জানিয়েও সেই আমরাই বাঙালি জাতি সম্পর্কে প্রায়ই নানা অপকথা নিজেরাই উচ্চারণ করি। বাঙালির সময় জ্ঞান নেই; বাঙালি তো বেতন সরকার যতোই দেয়া হোক তারা ঘুস খাবেই; বাঙালি তাই অলস; বাঙালি আবেগপ্রবণ বলে কা-জ্ঞান নেই ইত্যাদি অজ¯্র আত্মঘাতী মন্তব্য করে দেশের ও মানুষের প্রতি নিজের সক্ষমতা-সক্রিয়তা সম্পর্কে সগৌরবে জানান দিই। একবারও ভাবি না আমারই উচ্চারিত বক্তব্যের সূত্রে আমি নিজেই সীমাবদ্ধ, নিজের দুশ্চরিত্রকেই জানান দিই বর্হিবিশে^। নিজেরাই নিজেদের অপমান-অসম্মান-অবজ্ঞা করি। বাঙালি মিথ্যে বলে, এমন বক্তব্যের পর যদি নিজেকেই প্রশ্ন করি, তাহলে আমি কি বাঙালি নই? উত্তরটা হ্যাঁ সূচক হলে আমিও তো মিথ্যুক, অলস, ঘুসখোর ইত্যাদি কালো চিহ্নগুলো আমার শরীর-মনে অঙ্কিত হয় না? হয় যদি, তবে এ সব বর্জন করার অভ্যেস গড়ে তুলতে হবে। পরিবার থেকে সমাজ-রাষ্ট্রে ও প্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে সর্বত্রই নিজেকে সংশোধনের অনুশীলন করা আবশ্যিক। আমার চিন্তা ও কাজে আমি নিজেসহ অন্যে উপকৃত হলে তা অবশ্যই অন্যের অনুকরণীয় হবে।
আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত তখনই হবে, যখন ঘুস-দুর্নীতি এবং নেতাদের সুপারিশ বন্ধ হবে। মুখে বলবো মুক্তিযুদ্ধের কথা, করবো তার উল্টো, এ ভাবে দেশে শান্তি-স্থিতি আর সামাজিক বৈষম্য দূর হবে না। হবে না উন্নয়ন। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পূর্বশর্ত আইনের সফল প্রয়োগ। ওসি মোয়াজ্জেম অভিযুক্ত হলে তাকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে নেয়া হয়। তদন্তকারী দল তাকেও অভিযুক্ত করে শাস্তির সুপারিশ করে। সে তালিকায় মোয়াজ্জেমও ছিলো। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর সে কী করে আত্মগোপন করার সুযোগ পেলো? নিশ্চয়ই তার আত্মগোপনের পেছনে পুলিশের ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের কোনো কেউকেটার ভূমিকা আছে। না হলে সে পালাতে পারেই না। ধরে নেয়া হলো, সে কারো পক্ষপাতমূলক আচরণের জন্যে কিংবা ঘুস দিয়ে পালিয়েছে, তাহলে পুলিশের দায়িত্ব ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে তাদের দায়িত্ব পালন করা। এ ভাবে মাদক স¤্রাট বদি পালিয়েছে ক্ষমতাসীন কারো সহযোগিতায়। আরো কতোজন অপরাধ করেই পাড়ি জমিয়েছে ইউরোপ-আমেরিকায়। বঙ্গবন্ধুর খুনিরা, অবিকল অভিযুক্ত তারেক রহমান চিকিৎসার নামে বিদেশে গিয়ে সেখানে নিরাপদে অবস্থান করার সুযোগ পাচ্ছে। তারা যে দেশে পালিয়ে আছে, সেই দেশের কোনো অভিযুক্ত কি আমাদের দেশে অবস্থানের সুযোগ পেতো? আমাদের সুন্দর দেশটাকে কলঙ্কিত করছে সেই তারা, যারা নানা ভাবে দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে যুক্ত, নিজের দেশের চেয়ে ভারত-সৌদি আরবের ভাষা-সংস্কৃতি শ্রেষ্ঠ মনে করে, তাদের কারণে। অথচ আমাদের অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য আছে। সেগুলো ধারণ করলে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব, অপ্রতিদ্বন্দ্বী হতো। আমরা বরং ঐতিহ্য ভাঙতেই বেশি পারদর্শী।
রাজশাহী মহানগরীর ঐতিহ্যম-িত অন্যতম প্রতিষ্ঠান ছিলো মিয়াপাড়ার সাধারণ গ্রন্থাগার। সেটি পুরাতন হওয়ায় ভেঙে নতুন অবয়বে নির্মিত হচ্ছে। বাড়তি যোগ হচ্ছে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র অর্থাৎ মিলনায়তন, যেখানে সুলভে সাংস্কৃতিক কর্মীরা নানা অনুষ্ঠান করতে পারবেন। কিন্তু আপত্তি সেখানে, উদ্যোক্তরা পুরাতন ভবনের শিল্পসমৃদ্ধ ডিজাইন ভেঙে আধুনিকতার নামে একটি সাধারণ ভবন নির্মাণ করে অর্থ লুটপাট করার কৌশলটিতে। রাজশাহী ধর্মসভা নির্মিত হয়েছে ২ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকায়। বরাদ্দকৃত অর্থের ৫০ শতাংশও সেখানে ব্যয় করা হয়নি বলে অভিযোগ করছে অনেকেই। কারণ ভবনের নির্মাণও অর্ধেক করা হয়নি। ধর্মসভা কমিটি যে ভাবে ভবনটি পুননির্মাণ চেয়েছিলেন, ভবনের ডিজাইনার তাদের সুপারিশে পাত্তা দেননি। তাদের ইচ্ছে মতো ডিজাইন করে নির্মাণ শুরু করেন। অবিকল অলকা হলটিও একটি দুর্দশাগ্রস্ত। রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন সেটি ভেঙে তাদের মতো করে নির্মাণ করলে নামকরণে প্রকৃত ভূমিদাতার নামে সেটি নামকরণ করা হয়নি। কেনো? কারণ ওই প্রতিষ্ঠাতারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন না। রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের নামকরণও এ ভাবেই পাল্টে মহানগরীতে শহিদ বীরেন সরকার ও সুরেশ পা-ের অবদান কোনো রাজনীতিক নেতার থেকে কম নয়। ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী রাজশাহী দখল করে তাঁদের আগে হত্যা করে। হত্যা করে অ্যাডভোকেট আব্দুস সালামের পুত্রদ্বয়কে। এঁদের নামে কোনো সড়ক কিংবা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়নি। পঞ্চাশ বছরের দেশে এই আত্মপ্রতারণার প্রতিযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। রানী হেমন্তকুমারী উনিশ শতকে এই শহরের বাসিন্দাদের বিশুদ্ধ পানীয় জল পানের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর নামে কেবল রাজশাহী কলেজের এক্িট ছাত্রাবাস নির্মিত হয়েছে প্রায় শত বছর আগে। সেই ভবনটি ভগ্নদশা। সেখানে হিন্দু ছাত্ররা থেকে পড়ালেখা করে। হোস্টেলটিকে ভগ্নদশার পরিবর্তন নেই। অথচ যোগ্য অধ্যক্ষ কলেজের অবকাঠামোগত নানা উন্নয়ন নাকি করছেন, কিন্তু ওই ভগ্নপ্রায় হোস্টেলটি ভেঙে পুননির্মাণের কোনো উদ্যোগই নেয়া হচ্ছে না। হবে তখনই যখন ছাদ ধসে কিছু ছাত্র নিহত-আহত হবে, তখন। কিছুদিন আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদ ধসে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু পর সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের টনক নড়ে। আমরা মনে করি, ঐতিহ্য বজায় রাখতে সাধারণ গ্রন্থাগার ভবনের সাবেক ডিজাইন বজায় রাখা একটি জাতির সচেতন মানুষের নৈতিক দায়বদ্ধতার স্বাক্ষর। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে সেক্সপিয়রের বাসভবন জার্মানিদের বোমায় ধ্বংস হয়ে যায়। যুদ্ধপর সেই ভবন পূর্বের ডিজাইনে নির্মাণ করে কবি ও নাট্যকারের প্রতি সম্মান জানিয়েছে ইংরেজ জাতি। এখন বাংলাদেশ যদি জাতি বলতে হিন্দু-মুসলমান নির্দিষ্ট করার গোপন প্রকল্প হয়, রাষ্ট্রধর্ম বিল অক্ষত রেখে গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে গতিশীল করার ব্রত, তাহলে সে হবে আরেক আত্মপ্রতারণার আয়োজন। এই দেশটা সবার, তাহলে সুযোগ-সুবিধা দেয়া-নেয়ার ক্ষেত্রে ধর্ম-সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি বিবেচনা কেনো করা হবে। সেটাও হবে সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষত চিহ্নের স্বাক্ষর। কোনো ধর্ম-সম্প্রদায় যদি অপরাধ অন্যায় বৈষম্য সৃষ্টির মধ্যে নিজেদের গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তারা কবে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। আজকের বিশে^ ধর্ম নয়, শুভ চিন্তা ও কাজই প্রণম্য। আদরণীয়। দেশের বিদ্বান ও নেতাদের সে বিষয়ে ভাবতে হবে। আমলা নির্ভরতা পরিত্যাগ করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্তে দেশ চলানোর আয়োজন করতে হবে। নতুবা পিছিয়ে পড়াদের দলে নাম লিখাতে হবে।
জাতির গৌরবময় অর্জন, আইনের প্রয়োগ, নিরাপত্তা বিধান, মানুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত করা, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের বিস্তৃতি ঘটানো, বৈষম্যের অবসান এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য উন্নত বিশে^র মতো সরকার কর্তৃক নির্ধারণ, যোগাযোগ ব্যবস্থায় আধুনিকীকরণ ইত্যাদি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবেই বলতে পারবো, আমরা উন্নয়নের সড়কে পা রেখেছি। তার আগে সবই আস্ফালন। দেশকে “সকল দেশের রানী” বলে সম্মান জানানো সবই আত্মপ্রতারণা।