ইন্টারনেটে অসুখ-বিসুখ সার্চে যা করা উচিত নয়

আপডেট: জুলাই ১০, ২০১৮, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


ইন্টারনেটে গুগলকে বলা হয়ে থাকে সবজান্তা। কেননা এমন কোনো বিষয় নেই, যেটা গুগল হাজির করতে পারে না। প্রতিনিয়ত মানুষ তাই সবকিছুই খুঁজে বেড়ায় গুগলে। এমনকি অসুখ-বিসুখের কবলে পড়লে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগেই রোগের উপসর্গ ও চিকিৎসা সম্পর্কে সার্চ করে গুগলে।
তবে গুগলে উপসর্গ সার্চ করার ক্ষেত্রে লোকজন সাধারণ যেসব ভুল বেশি করে থাকেন, সে সম্পর্কে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য লক্ষণ ইন্টারনেটে মানে গুগলে সার্চ করার ক্ষেত্রে ১১টি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
* ডায়াগনস্টিক শব্দ ব্যবহার করে সার্চ করবেন না : যখন গুগলে আপনার উপসর্গ সার্চ করবেন, বেসিক কিওয়ার্ড ব্যবহার করে সার্চ করুন। যেমন ‘মাথাব্যথা এবং ব্রেইন টিউমার’ মতো ডায়াগনস্টিক শব্দের পরিবর্তে বেসিক কিওয়ার্ড ‘মাথাব্যথা’ লিখে সার্চ করুন। বেসিক কিওয়ার্ড এবং ডায়াগনস্টিক শব্দ একসঙ্গে ব্যবহার করে গুগলিং আপনার সার্চ রেজাল্টকে পক্ষপাতদুষ্ট করবে, যার ফলে আপনি অনেকগুলো সাইটে প্রবেশ করবেন ও আপনার মধ্যে অমূলক ভয় জন্ম নেবে (যা আপনাকে আতঙ্কে রাখবে) অথবা আপনি উপসর্গ উপেক্ষা করতে পারেন (যা চিকিৎসকের কাছে শরণাপন্ন হওয়া বিলম্ব করবে)।
‘হাইপ: এ ডক্টর’স গাইড টু মেডিক্যাল মিথস, এগজাজারেটেড ক্লেইমস, অ্যান্ড ব্যাড অ্যাডভাইস’ বইয়ের লেখক নিনা শ্যাপিরো বলেন, ‘সহজভাবে সার্চ করুন। বেসিক কিওয়ার্ড সার্চিং আপনাকে বিভিন্ন সম্ভাবনা ডেলিভার করবে, যার ফলে আপনি ভেঙ্গে পড়বেন না ও প্রকৃত কারণ জানতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন।’
* অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহার করবেন না : অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহার এড়িয়ে চলুন, যেমন- ‘উদর ব্যথার’ পরিবর্তে ‘পেট ব্যথা’ টাইপ করুন। অপ্রচলিত শব্দের ব্যবহারে গুগলিং আপনাকে মেডিক্যাল সাইট থেকে দূরে রাখবে। কিন্তু আপনার মেডিক্যাল সাইটই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, কারণ এটি আপনাকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেবে।
* আকর্ষণীয় সাইট দ্বারা প্রভাবিত হবেন না : একটি সাইটকে তার লুক দিয়ে বিচার করতে পারবেন না। সুন্দর পেজ লেআউট এবং আকর্ষণীয় ভিডিও ও গ্রাফিক্স, আপনি যে তথ্য পড়ছেন তা যে সঠিক তার নির্দেশক নয়। যেসব সাইটের নাম ডটকম, ডটনেট দিয়ে শেষ হয় এবং এমনকি যেসব সাইট সম্পূর্ণভাবে স্বাস্থ্যের ওপর ফোকাস করে তা সাধারণত বাণিজ্যিক সাইট, এসব সাইট বিজ্ঞাপন দ্বারা সাপোর্ট পেয়ে থাকে। এসব সাইট প্রসঙ্গে ম্যাটেল’স চিলড্রেন হসপিটাল ইউসিএলএ’র পেডিয়াট্রিক ইয়ার, নোজ অ্যান্ড থ্রোট মেডিসিনের পরিচালক ডা. শ্যাপিরো বলেন, ‘এসবের মানে এই নয় যে এসব সাইট অবধারিতভাবে ভুল, কিন্তু তারা পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে।’ যখন কোনো বাণিজ্যিক স্বাস্থ্য সাইট দেখবেন, তখন তথ্যের সঠিক রেফারেন্স ও মূল উৎসের লিংক দেওয়া হয়েছে কিনা দেখুন। নামকরা স্বাস্থ্য সাইটগুলো তাই করে। যেসব ওয়েবসাইটের নাম ডটএডু এবং ডটগভ দিয়ে শেষ হয়েছে তা যথাক্রমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত ও সরকারি সাইট। ডা শ্যাপিরো বলেন ‘সাধারণত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মেডিক্যাল ও সরকারি কেন্দ্র সংক্রান্ত সাইটগুলো সঠিক তথ্যভিত্তিক হয়ে থাকে এবং অতটা পক্ষপাতদুষ্ট নয়।’ ডটঅর্গ দিয়ে সমাপ্ত সাইট বাণিজ্যিক হতেও পারে, নাও হতে পারে। প্রায়ক্ষেত্রে ডটঅর্গ সাইট অলাভজনক প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হলেও যে কেউ তারা যে অলাভজনক তার ডকুমেন্ট বা প্রুফ সাবমিট করা ছাড়াই ডটঅর্গ ডোমেইন রেজিস্টার করতে পারে। কিছু ডটঅর্গ সাইট বিশ্বস্ত প্রফেশনাল মেডিক্যাল অ্যাকাডেমি দ্বারা পরিচালিত হয় (যেমন- ফ্যামিলি ডক্টর ডটঅর্গ, যা আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানস দ্বারা পরিচালিত হয় এবং এ সাইটে বিল্ট-ইন উপসর্গ চেকার রয়েছে)। কোনো সাইট সম্পর্কে সন্দেহ জাগলে এটির ‘অ্যাবাউট’ পেজ পড়ুন। ডা. শ্যাপিরো বলেন, ‘গুগল সার্চ রেজাল্ট পেজের শীর্ষে থাকা লিংক সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করুন, কারণ এগুলো স্পন্সরড লিস্টিং এবং সেভাবেই লেবেলকৃত।’
* মূল উপসর্গকে সেকেন্ড-গেস করবেন না : যদি আপনি কোনো নির্দিষ্ট উপসর্গে ভুগেন এবং যদি তা অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে প্ল্যাসেবো ইফেক্টের বিপরীত নসিবো ইফেক্টের শিকার হবেন না : যদি আপনি প্রত্যাশা করেন খারাপ অনুভব করবেন, তাহলে প্রত্যাশার কারণেই সেটা অনুভব হবে। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব কার্ডিওলজিতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, যেসব দেশের লোকেরা নিয়মিত স্ট্যাটিন ড্রাগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গুগল করে তাদের উচ্চ মাত্রায় স্ট্যাটিন ইনটলারেন্স হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সারকথা? আমরা যা অনলাইনে পড়ি তা অবচেতনভাবে আমাদের চিন্তার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
* খুব তাড়াতাড়ি সার্চিং বন্ধ করবেন না : মেডিক্যাল তথ্যের জন্য শুধুমাত্র একটি লিংকে ক্লিক করেই আপনার সার্চিং বন্ধ হওয়া উচিত নয়। তথ্যের ভারসাম্যের জন্য আপনাকে কয়েকটি লিংকের লেখা পড়তে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ‘চোয়াল ব্যথা’ লিখে সার্চ করলে যে রেজাল্ট আসবে তার কোনো একটি লিংকের লেখা আপনাকে অনুধাবন করতে সাহায্য করতে পারে যে আপনার চোয়াল ব্যথা দাঁতের সমস্যার কারণে হতে পারে, কিন্তু অন্য একটি ওয়েবসাইটে আপনি এ ব্যথার ভিন্ন কারণও পেতে পারেন। কোনো একটি সাইট আপনার উপসর্গের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা দিলেও তথ্যের ভারসাম্যের জন্য কিছু নামকরা ওয়েবসাইটের লেখা পড়া উচিত।
* সাইটের তথ্যসূত্র এড়িয়ে যাবেন না : যখন আপনার সার্চিং আপনাকে কোনো নিউজ আর্টিকেলে নিয়ে যাবে, আপনার মনে হতে পারে যে এটি উপসর্গের বর্ণনা দিচ্ছে, এর মূল উৎস ট্র্যাক করুন এবং নিজের জন্য পড়ুন, বিশেষ করে কোনো নতুন স্বাস্থ্য গবেষণার ক্ষেত্রে। অনেক সায়েন্টিফিক আর্টিকেল এমনভাবে লেখা হয় যে তা কেবলমাত্র মেডিক্যাল প্রফেশনাল নয়, রোগীদের কাছেও বোধগম্য। আপনার জ্ঞাত কিছু প্রাথমিক গবেষণার ক্ষেত্রে কোনো অ্যাকাডেমিক জার্নালের পেপারে আরো গবেষণার ক্লু থাকতে পারে। গবেষণাটির প্রিন্ট বের করুন এবং এটি আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে আসন্ন আলোচনায় সহায়ক স্টার্টিং পয়েন্ট হতে পারে। প্রাসঙ্গিক সায়েন্টিফিক পেপার পাওয়ার একটি ভালো মাধ্যম হচ্ছে গুগল স্কলার।
* যেকোনো জার্নালের আর্টিকেল সঠিক ভাববেন না : একটি পিয়ার-রিভিউড অ্যাকাডেমিক পেপার কোনো বিশেষ বিষয়ের প্রাথমিক উৎস হতে পারে, কিন্তু এটির তথ্য আপনার জন্য অবধারিতভাবে প্রাসঙ্গিক নাও হতে পারে অথবা এমনকি বিষয়টি এখন আর প্রাসঙ্গিক-ই নয়। প্রথমত, আর্টিকেলটি কোন বছরে প্রকাশিত হয়েছে তা চেক করুন, যদি এটি ১০ বছর আগে লেখা হয়, তাহলে তাতে পুরোনো তথ্য থাকতে পারে। গবেষণার স্যাম্পল সাইজ লক্ষ্য করুন, যদি ছোট হয়, তথ্য প্রাসঙ্গিক নাও হতে পারে- দীর্ঘমেয়াদী অথবা স্বল্পমেয়াদী গবেষণা যেমনই হোক না কেন। এছাড়া গবেষণাটি মানুষ নাকি প্রাণীর ওপর সম্পাদন করা হয়েছে তাও লক্ষ্য করুন। এটি কি বহু বিষয়ের এলোমেলো তূলনামূলক গবেষণা অথবা আগেকার অনেক গবেষণার রিভিউ স্টাডি? ফ্লোরিডার জ্যাকসনভিলের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান এবং আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানস বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সদস্য রবার্ট রাস্পা সতর্ক করেন, ‘যদি তথ্য প্রাথমিক হয়, তা আপনাকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। আপনার নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন যে আর্টিকেলটি কোনো নামকরা পিয়ার-রিভিউড জার্নাল অনুসারে লেখা হয়েছে।’
* ‘অ্যাবাউট আস’ সেকশন এড়িয়ে যাবেন না : কিছু সাইটের অ্যাজেন্ডা থাকে, তাই পরামর্শের পেছনে কারা আছে তা জানতে ‘অ্যাবাউট আস’ বা ‘আমাদের সম্পর্কে’ সেকশনে ক্লিক করুন। যদি সাইটে কারা তথ্য প্রদান করছে তার সূত্র না থাকে, তাহলে তা ভালো সাইটের লক্ষণ নয়। কিছু সাইট সম্পূর্ণভাবে ওষুধ কোম্পানি বা সংস্থা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়, যা হার্বাল মেডিসিন বা ভেষজ ওষুধ বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করে। ডা. শ্যাপিরো বলেন, ‘যদি কোনো সাইট ওষুধ বিক্রয় করে অথবা যদি সাইটে স্পন্সর থাকে, তাহলে তথ্যের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সন্দেহ থেকে যায়।’
* শুধুমাত্র সাধারণ গুগলের ওপর নির্ভর করবেন না : গুগল স্কলারের পাশাপাশি গুগল অ্যাডভান্সড সার্চ ব্যবহার করুন, যা হাই-ক্যালিবার সার্চ-রিফাইনমেন্ট টেকনিক প্রোভাইড করে- এটি সহায়ক হতে পারে, বিশেষ করে বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে অরিজিনাল সোর্স খুঁজে পেতে। অ্যাডভান্সড সার্চের মাধ্যমে আপনি সাইটের মধ্যেই সার্চ করতে পারবেন এবং আপনার সার্চকে তারিখ দিয়ে রিফাইন করতে পারবেন, তাই আপনি অধিক সাম্প্রতিক ও প্রাসঙ্গিক আর্টিকেল খুঁজে পাবেন।
* চিকিৎসকের কাছে তাদের প্রিয় স্বাস্থ্য সাইটের নাম জানতে দ্বিধাবোধ করবেন না : চিকিৎসকরা জানেন যে, তাদের অনেক রোগী গুগলে সার্চের মাধ্যমে উপসর্গ সম্পর্কে জানেন। সিয়াটল ম্যামা ডকের প্রতিষ্ঠাতা এবং সিয়াটলের পিডিয়াট্রিশিয়ান ওয়েন্ডি সু সোয়ানসন জনপ্রিয় ফিজিশিয়ানদের ব্লগ কেভিনএমডি ডটকমে লিখেন: ‘এটি একটি নতুন পৃথিবী…আমরা রোগীদেরকে বিশ্বস্ত ও মূল্যবান কণ্ঠস্বরের দিকে গাইড করবো এবং তাদের অনলাইন জ্ঞানকে কনফার্ম বা রিডিরেক্ট করতে সাহায্য করবো।’ তাই পরবর্তীতে আপনি যখন কোনো চেকআপের জন্য চিকিৎসকের কাছে যাবেন, তখন জেনে নিন যে তিনি রোগীদেরকে মেডিক্যাল তথ্যের জন্য কোন সাইট সাজেস্ট করেন।
* কেবলমাত্র গুগলে সার্চ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসবেন না : ইন্টারনেটে কি পড়েছেন শুধুমাত্র তার ওপর ভিত্তি করে কখনো মেডিক্যালীয় সিদ্ধান্ত নেবেন না এবং অবশ্যই এমন সাইটের লেখা পড়ে নয় যা আপনাকে ভালো অনুভব করার জন্য কিছু কিনতে সাজেস্ট করে। আপনি যে আর্টিকেল প্রাসঙ্গিক মনে করেন তার প্রিন্ট বের করুন অথবা এমন আর্টিকেলের প্রিন্ট বের করুন যা সম্পর্কে আপনি জানতে আগ্রহী- এসব নিয়ে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন এবং এটি হচ্ছে চিকিৎসকের কাছে যাওয়াকে অধিক ফলপ্রসূ করার একটি উপায়। অনলাইনে আপনার উপসর্গ খুঁজুন কিংবা না খুঁজুন, অসুস্থতা অনুভব করলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।