ঈশ্বরদীতে তেলচুরি রোধে লোকোসেডে সিসি ক্যামেরা || তেলচুরির কৌশল পরিবর্তন: ফাঁদপাতা অভিযানেও থামছে না তেলচুরি

আপডেট: জানুয়ারি ৯, ২০১৮, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী


ঈশ্বরদীর রেলওয়ে লেকোসেড থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার তেল চুরি রোধকল্পে ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা (সিসি ক্যামেরা) বসিয়েও ঠেকানো যাচ্ছে না তেলচুরি। প্রভাবশালী তেল চোর সিন্ডিকেট এবার তাদের কৌশল পরিবর্তন করে চলন্ত ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে প্রতিদিন লোপাট করছে রেলওয়ের লাখ লাখ টাকার ডিজেল। এই তেল চুরির সঙ্গে সরাসরি রেলওয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত রয়েছেন বলে বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে ঈশ্বরদীসহ আশেপাশের এলাকায় খোঁজ নিয়ে পাওয়া গেছে তেল চুরির নতুন কৌশলের চমকপ্রদ তথ্য। বিভিন্ন বিশ্বস্ত সূত্র জানান, স্থানীয়ভাবে লোকোসেড এলাকায় ইঞ্জিন দাঁড়ানো অবস্থায় কিংবা লোকোসেডের অভ্যন্তরের বিভিন্ন ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে আগে যেভাবে প্রকাশ্যে ভ্যান ভর্তি করে লেকোসেড এলাকা থেকে তেল পাচার করা হতো- তা এখন সিসি ক্যামেরার কারণে করা যাচ্ছে না। এ কারণে তেল চোররা রেলের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজসে চলন্ত ইঞ্জিন থেকেই এখন তেল চুরি করছে। প্রতিনিয়ত ঈশ্বরদীর পাতিবিল, পাকশী, ভেড়ামারা, আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা, দর্শনা, ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনের পূর্ব-পশ্চিমে, আমনুরা, রহনপুর, নওগাঁ, আত্রাই, রাণীনগর, আবদুুলপুর, সিরাজগঞ্জসহ রেলওয়ের বিভিন্ন রুটের ‘নিরাপদ স্থানে’ ট্রেনের গতি কমিয়ে বিশেষ কৌশলে এসব তেল ইঞ্জিন থেকে পাচার করা হয়। জানা গেছে, যাত্রী ও মালবাহী উভয় ট্রেনেই হয়ে থাকে তেল চুরি, তবে মালবাহী ট্রেনে তেল চুরি সহজ বলে তেল চোররা মালবাহী ট্রেনেই বেশিরভাগ সময় তেল চুরি করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তেল চোররা প্রতিনিয়ত ট্রেনের ইঞ্জিনে উঠে কর্তব্যরত ড্রাইভার (এলএম) ও সহকারী ড্রাইভারদের (এএলএম) প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চলন্ত ট্রেনের ইঞ্জিনে তেলের টাংকির সঙ্গে পাইপ লাগিয়ে কয়েক পরতের মোটা পলিথিনের বস্তায় তেল ভর্তি করে। এর পর ওই পলিথিনের বস্তাগুলি চটের বস্তায় ভরে বিশেষ কায়দায় চলন্ত ট্রেনের গতি কমিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে দেয়। সেখানে অপেক্ষমান তেল চোর সদস্যরা সে সব তেলভর্তি বস্তাগুলি কুড়িয়ে ইঞ্জিন চালিত ভ্যানে করে নিয়ে যায় তাদের নির্দিষ্ট স্থানে। সেখান থেকে হাত বদল হয়ে এসব তেল খুচরা বাজারে বিক্রি করা হয়ে থাকে।
রেলওয়ের ঈশ্বরদী লেকোসেড এলাকায় কর্মরত একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে ইঞ্জিন আসার পর ফুয়েলিং তেলের টাংকিতে তেল লোড করার সময় সংশ্লিষ্ট ড্রাইভার লোকোমাস্টারকে (এলএম) ফুয়েল স্লিপ হস্তান্তর করে থাকেন লোকোসেডের ইনচার্জ (ফোরম্যান) সহ দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা। তারা বেশিরভাগ সময়ই ইঞ্জিনে লোড করা তেলের পরিমাপ না করে তাদের ফুয়েল স্লিপ প্রদান করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ইঞ্জিনে কতটুকু তেল অবশিষ্ট ছিল তার কোনো হিসেব খাতায় রাখা হয় না। ইঞ্জিনে সেভিং তেল পরিমাপ না করে ড্রাইভারদের ফুয়েল স্লিপ হস্তান্তর করায় খুব সহজেই তেল চুরি করে হজম করছে এই সিন্ডিকেট।
উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসএই) নাজমুল হক, ফুয়েল ইনচার্জ আবুল কাশেম, লোকোসেডের ইনচার্জ সিনিয়র উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ফোরম্যান) আবু ওসমান আলী, ফুয়েল ইনচার্জ আবুল কাশেমসহ একাধিক কর্মকর্তা এখান থেকে ইঞ্জিনে তেল প্রদানের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন।
এসব বিষয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসএই) নাজমুল হক বলেন, ঈশ্বরদী লেকোসেডের ১৬টি পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। এখান থেকে তেল চুরির কোন সুযোগ নেই। ট্রেন চলন্ত অবস্থায় কীভাবে তেল চুরি করা হয় তা ড্রাইভাররা বলতে পারবেন। লোকোসেডের ইনচার্জ সিনিয়র উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ফোরম্যান) আবু ওসমান আলী বলেন, আমি তেল চুরির সঙ্গে জড়িত নই।
রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (ডিএমই লোকো) হাসানুজ্জামান তেল চুরির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ট্রেন থেকে তেল চুরির ঘটনাটি নতুন নয়, মাঝে মাঝে চলন্ত ট্রেনের ইঞ্জিনে ‘ফাঁদপাতা অভিযান’ চালিয়ে তেল চোর ড্রাইভারদের হাতেনাতে ধরে শাস্তিও দেয়া হয়, কিন্তু স্থায়ীভাবে তেলচুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। তবে এদের প্রশাসনিক কোনো সাপোর্ট করা হয় না।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ