ঈশ্বরদীতে শেখ হাসিনার ট্রেনে গুলি : ৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, ২৫ জন যাবজ্জীবন

আপডেট: জুলাই ৪, ২০১৯, ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী


দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগারে নেয়া হচ্ছে-সোনার দেশ

ঘটনার ২৫ বছর পর ঈশ্বরদীর বহুল আলোচিত শেখ হাসিনার ট্রেনবহরে গুলিবর্ষণের মামলার রায় গতকাল বুধবার সকালে জনাকীর্ণ আদালতে ঘোষণা করা হয়েছে। পাবনার স্পেশাল ট্রাইবুনালের অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-১ এর ভারপ্রাপ্ত বিচারক রুস্তম আলী এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ৫২ জন আসামীর মধ্যে ৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, ২৫ জনের যাবজ্জীবন এবং ১৩ জনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এর মধ্যে ৫ জন ইতোমধ্যে মৃত্যু বরণ করেছেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৯ জন হলো মামলার প্রধান আসামী ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মকলেছুর রহমান বাবলু, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু, পাবনা জেলা বিএনপির মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক কেএম আক্তারুজ্জামান আক্তার, মাহবুবুর রহমান পলাশ, আজিজুর রহমান শাহীন, রেজাউল করিম শাহীন, মোস্তফা নূরে আলম শ্যামল, শহীদুল ইসলাম অটল ও অবাঙালি নেতা শামসুর রহমান শিমু ওরফে শিমুয়া।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ২৫ জনের মধ্যে রয়েছে, আমিনুল ইসলাম আমিন, আজাদ হোসেন ওরফে খোকন, ইসলাম হোসেন জুয়েল, আলাউদ্দিন বিশ্বাস, সাবেক পৌর কমিশনার শামসুল আলম, আনিসুর রহমান সেকম, আক্কেল আলী, রবিউল ইসলাম রবি, এনাম, আবুল কাশেম ওরফে হালট কাশেম, কালা বাবু, মামুন, সেলিম আহমেদ, কল্লোল, তুহিন, শাহ আলম লিটন, আবদুল্লা আল মামুন রিপন, লাইজু, আবদুল জব্বার, পলাশ, আবদুল হাকিম টেনু, আলমগীর, আবুল কালাম, একেএম ফিরোজুল ইসলাম পায়েল।
১০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ১৩ জনের মধ্যে রয়েছে, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নেফাউর রহমান রাজু, আজমল হোসেন ডাবলু, পৌর কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন জনি, রনো, বরকত আলী, চাঁদ আলী, এনামুল কবীর, মুক্তার, হাফিজুর রহমান মুকুল, হুমায়ন কবীর দুলাল, জামরুল, তুহিন বিন সিদ্দিক ও ফজলুর রহমান প্রাং।
মোট ৫২ জন আসামীর মধ্যে বিগত ২৫ বছরে ৫ জন যথাক্রমে এহেতেশাম ওরফে ন্যাটা, আলমগীর হোসেন, ওসিয়া, খোকন ও আলমগীর হোসেন তুহিন মৃত্যুবরণ করেছেন।
ঘটনা প্রবাহ:
তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দলীয় কর্মসূচিতে ট্রেনবহর নিয়ে ট্রেনযোগে খুলনা থেকে ঈশ্বরদী হয়ে সৈয়দপুর যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশনে পথসভার শুরুতেই বিএনপির নেতা-কর্মীরা অতর্কিতে ওই ট্রেন ও শেখ হাসিনার কামরা লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও বোমা নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় দলীয় কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করে শেখ হাসিনা দ্রুত ঈশ্বরদী ত্যাগ করেন।
পরে রেলওয়ে থানার (জিআরপি) ওসি নজরুল ইসলাম বাদি হয়ে তৎকালীন ছাত্রদল নেতা ও বর্তমানে ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টুসহ ৭ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন। একই বছর চুড়ান্ত প্রতিবেদনও দাখিল করে পুলিশ। কিন্তু আদালত এই প্রতিবেদন গ্রহণ না করে পুনরায় তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর সিআইডি তদন্ত শেষে ১৯৯৭ সালের ৩ এপ্রিল আদালতে চার্জশীট দাখিল করে। সিআইডির তদন্তে নতুন ভাবে ঈশ্বরদীর শীর্ষস্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ ৫২ জনকে এই মামলার আসামী করা হয়। মামলা নম্বর এসটি ৪২/৯৭।
মামলায় যাদের নতুনভাবে আসামী করা হয় তাদের মধ্যে ঈশ্বরদী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি মকলেছুর রহমান বাবলু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র শামসুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন বিশ্বাস, পাবনা জেলা বিএনপির মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদ কেএম আক্তারুজ্জামান আক্তার, পাকশীর সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, সাহাপুরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নেফাউর রহমান রাজু, সাবেক ছাত্রনেতা মাহবুবুর রহমান পলাশ, রেজাউল করিম শাহীন, আজিজুর রহমান শাহীন, সেলিম আহমেদ, পৌরসভার কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন জনি, বিএনপি নেতা ইসলাম হোসেন জুয়েল, শহীদুল ইসলাম অটল, আবদুল জব্বার। আসামীদের মধ্যে গত ২৫ বছরে ওসিয়া, আলী আজগর, খোকন, তুহিন ও আলমগীর ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাবেক ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ এমপি, ঈশ্বরদী উপজেলা চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা নূরুজ্জামান বিশ্বাস, পৌর মেয়র আবুল কালাম আজাদ মিন্টু, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোকলেছুর রহমান মিন্টু, ম্যাজিস্ট্রেট তোফাজ্জল হোসেনসহ ৩৮ জনের সাধারণ সাক্ষি এবং আসামী পক্ষে ৫৬ জনের সাফাই সাক্ষি গ্রহণ করা হয়।
হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী গত ৩০ জুন মামলার আরো সাফাই সাক্ষির দিন ছিল। আসামীপক্ষ সাফাই সাক্ষি না দিয়ে আবারো সময়ের প্রার্থনা করলে আদালত নামঞ্জুর করে উপস্থিত ৩০ আসামীর জামিন বাতিল করে জেলহাজতে প্রেরণ করেন।
চাঞ্চল্যকর এই মামলার প্রধান আসামী পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও ঈশ্বরদী পৌরসভার সাবেক মেয়র মকলেছুর রহমান বাবলু, ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু, উপজেলা বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবীর দুলালসহ আরো ১৭জন আদালতে হাজির না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। মামলার প্রধান আসামী মকলেছুর রহমান বাবলু ও আরেক আসামী আবদুল হাকিম টেনু গত মঙ্গলবার আদালতে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন, পাবনার জজকোর্টের পিপি অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান মুক্তা ও অ্যাডভোকেট গোলাম হাসনাইন। আসামী পক্ষে ছিলেন, অ্যাড. মাসুদ খোন্দকার, অ্যাড. নূরুল ইসলাম গেদা ও অ্যাড. সনত কুমার সরকার। পলাতক আসামীদের পক্ষে শুণানী করেন, অ্যাড. একেএম শামসুল হুদা। রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে ২৫ বছর আগের চাঞ্চল্যকর ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটলো।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ