ঈশ্বরদী পৌরসভার কাউন্সিলর জনি মানব সেবাই যার নেশা

আপডেট: জুন ১০, ২০১৯, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী


কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন জনি-সোনার দেশ

ঈশ্বরদীতে ধনী অথবা গরীব কেউ মারা গেলে প্রথমেই যিনি সবার আগে শহরবাসীকে মৃত্যুর খবরটি নিজ উদ্যোগে জানানোর জন্য মাইক হাতে রাস্তয় বেরিয়ে পড়েন, তিনি কোন পেশাদার প্রচারকর্মী নন, তিনি ঈশ্বরদী পৌরসভার কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন জনি। একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে গত ৫ বছর ধরে ঈশ্বরদীতে নিজ উদ্যোগে এবং নিজ খরচে ব্যতিক্রমী এই প্রচার কাজ করার কারণে যার ওপর অন্য এক আলো এসে পড়েছে। নিজ এলাকার বাইরে থেকেও এখন প্রতিনিয়ত তার কাছে অনুরোধ আসে মৃত মানুষের খবর জানানোর মাইকিং করার জন্য। একজন জন প্রতিনিধি হয়েও গত ৫ বছর ধরে মাইক নিয়ে ‘একটি শোক সংবাদ’….. বলে আন্তরিকতার সঙ্গে মৃত মানুষের খবর জানিয়ে চলেছেন এই পৌর কাউন্সিলর। ঈশ্বরদী পৌরসভার ৭নম্বর ওয়ার্ডই শুধু নয় এখন পুরো ৯টি ওয়ার্ডসহ সমগ্র পৌর শহরে ‘শোক সংবাদ’ জানানোর একমাত্র বাহক হয়ে উঠেছেন ঈশ্বরদী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জনি। ইতোমধ্যে ৫ শতাধিক মৃত ব্যক্তির শোক সংবাদ মাইকে প্রচার করে এলাকায় যিনি অন্যভাবে সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। মাইকে শোক সংবাদের আওয়াজ শুনলেই সবাই বলেন, জনি ছিল বলেই এত দ্রুত খবরটি পাওয়া গেল। ঈশ্বরদীতে কেউ মারা গেলে শোক সংবাদ মাইকিং করার জন্য কাউকে খুঁজতে হয়না, জনি নিজেই নিজ উদ্যোগে বেরিয়ে পড়েন মাইকিং করতে। এলাকার ছোট-বড় সবাই এই পৌর কাউন্সিলরের ব্যতিক্রমী কাজের প্রসংশা করেছেন। তিনি শুধু যে মাইকিং করেই তার জনপ্রিয়তার তুঙ্গে আরোহন করছেন তা নয়। তার মানবসেবার নানান ধরণ দেখে অনুপ্রাণিত না হয়ে পারেননি তার এলাকার সাধারণ মানুষও। পৌরসভা কিংবা যে কোন নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার বিষয়ে এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিদিন ভৌর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত যখন যে যার প্রয়োজনে জনিকে ডাকেন তার ডাকে সাড়া দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে হাজির হন তিনি। ঈশ্বরদীর যেকোন এলাকার যে কোন মানুষ অসুস্থ্য হলে এই কাউন্সিলর নিজ খরচে তার শুধু চিকিৎসার ব্যবস্থা করেই ক্ষান্ত হননা তাকে পাবনা, রাজশাহী, ঢাকা এমনকি প্রয়োজন পড়লে ভারতে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে হাজার হাজার দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত মানুষকে নতুনভাবে বাঁচার পথ দেখিয়ে সবার কাছে প্রসংশার পাত্র হয়ে আছেন। তিনি এ পর্যন্ত ৮টি বেওয়ারিশ লাশ দাফনেরও ব্যবস্থা করেছেন নিজ খরচে। গত দশ বছরে এসব বেওয়ারিশ লাশগুলোর কবরে এসে কেউ কোন খবর নেয়নি, অথচ এদের মৃত্যুর দিনগুলিতে আনোয়ার হোসেন জনি নিজ উদ্যোগে দোয়ার ব্যবস্থা করেন। এ বিষয়ে জনি বলেন, ওদের লাশ দাফনের পর থেকে এখন পর্যন্ত তাদের পরিচয় পাওয়া যায়নি, ওদের জন্য দোয়া করারও কেউ নেই, তাই ওদের জন্য আমি নিজেই দোয়ার ব্যবস্থা করি।
২০০৪ সালে ঈশ্বরদী পৌরসভার নির্বাচনে প্রথম তিনি ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত পর পর তিনটি পৌর নির্বাচনেই জনি সবার চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে কাউন্সিলর হিসেবে হ্যাট্রিক জয়লাভ করেন। শুধু পৌরসভার নির্বাচনেই নয়, ঈশ্বরদী শিল্প ও বণিক সমিতির নির্বাচনেও ২০০৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যতবার নির্বাচন হয়েছে প্রতিবারই তিনি সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে আনোয়ার হোসেন জনি ১৯৯৪ সালে ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে প্রথম ছাত্র সংসদের নির্বাচনে অংশ নিয়ে কমন রুম সম্পাদক হিসেবে জয়লাভ করেন। পরবির্তিতে ছাত্রাবস্থায় বার্ষিকী সম্পাদকও নির্বাচিত হন সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে। ঈশ্বরদীর পূর্বটেংরি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য পদে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও জনি সবার চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে ১ নম্বর সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ পৌর কাউন্সিলর অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক পদেও নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়লাভ করেছেন।
এসবের বাইরে জনি নিজ উদ্যোগে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাসহ নানান সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত থাকেন সবসময়।
ঈশ্বরদী পৌর এলাকার সাঁড়াগোপালপুর এলাকার বাসিন্দা খন্দকার তৌফিক আলম সোহেল বলেন, প্রথম শ্রেণির একটি পৌরভার কাউন্সিলর হয়ে আনোয়ার হোসেন জনি যা করছেন তা বাংলাদেশে আর কোন পৌর কাউন্সিলর করেন কিনা সন্দেহ আছে। পৌরসভার সংরক্ষিত ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর ও ২ নম্বর প্যানেল মেয়র ফরিদা খাতুন বলেন, আনোয়ার হোসেন জনির এই মানব সেবামুলক কাজে আমরা ঈশ্বরদী পৌরসভার অন্যান্য কাউন্সিলররাও অন্যরকম সম্মানিত বোধ করি।
গতকাল শনিবার দুপুরে শহরের স্টেশন রোডে মাইকিং করার সময় দেখা হয় আনোয়ার হোসেন জনির সঙ্গে। এ প্রসঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, এখন থেকে ৫-৬ বছর আগে শহরের পূর্ব নূর মহল্লার বস্তিতে একজন অসহায় দুস্থ মানুষ মারা যায়। সেদিন ওই মৃত ব্যক্তির মরদেহ গোসল করিয়ে কাফনের কাপড় পরানোর পর যখন গোরস্থানে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল, তখন জানাজায় অংশগ্রহণ করার লোক ছিলনা। এই অবস্থায় আশেপাশের লোকজনকে ওই শোক সংবাদ জানানোর জন্য প্রথম তিনি মাইক হাতে রিকশায় ওঠেন। তার মাইকিং শুনে অনেক মানুষ ওই মৃত ব্যক্তির জানাজা নামাজে অংশ নেয়। পরবর্তিতে নিজ এলাকায় কোন গরীব, অসহায় ও দুস্থ মানুষ মারা গেলে আমি নিজ খরচে মাইকিং করে মৃত মানুষের জানাজার খবর জানানোয় অভ্যস্থ হয়ে পড়ি। জনি বলেন, এই মানবসেবামূলক কাজ করতে আমার কোন লজ্জাবোধ হয়না বরং আমার ভাল লাগে যে আমি ভাল কিছু করতে পারছি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ