উদ্বাস্তু

আপডেট: নভেম্বর ১৫, ২০১৭, ১:২২ পূর্বাহ্ণ

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন


নিজ ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে যারা তারাই উদ্বাস্তু। পৃথিবীতে উদ্বাস্তু শব্দটির উৎপত্তি কয়েক হাজার বছর ধরে। ভিটে মাটি অর্থাৎ থাকার জায়গা হারিয়ে যারা অন্যের কাছে থাকার জন্য আশ্রয় প্রার্থী তারাও উদ্বাস্তু। মানুষ উদ্বাস্তু হয় দুই কারণে এক. প্রাকৃতিক সৃষ্ট দুযোর্গ, দুই. মানব সৃষ্ট সহিংসতা, সংঘাত এবং কুটচাল। নদী ভাঙ্গন, বন্যা, জলউচ্ছ্বাস এসব কারণেও মানুষ উদ্বাস্তু হয়। ভিটে মাটি নদী গর্ভে বিলীন হওয়া কারণে উদ্বাস্তু হয়। এটা এক ধরনের প্রাকৃতিক নিয়ম যা আদিকাল থেকে চলে আসছে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনায় কবলে পড়ে উদ্বাস্তু হওয়ার সংখ্যা খুবই নগন্য। নদী গর্ভে ভিটেমাটি বিলীন হয়ে যাওয়া উদ্বাস্তুর আশ্রয় মেলে । পার্শ্ববর্তী গ্রামের মানুষ তাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য এগিয়ে আসে। মানবসৃষ্ট সহিংসতার রোষানলে বা কূটচালে বা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে যারা উদ্বাস্তু হয়, এদের আশ্রয় পাওয়া কষ্টকর হয়ে যায়। দেশের অভ্যন্তরে ছোটখাট রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা পারিবারিক কোনো সহিংসতা বা ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে যারা উদ্বাস্তু হয় এবং তারা দেশ ত্যাগ করতে পারে না। এ ধরনের উদ্বাস্তুদের আশ্রয় মেলে না। এ রকম কারণে যারা উদ্বাস্তু পরিণত হয় তাদেরকে সাধারণত রাস্তার ফুটপাতে, রেলস্টেশনে দিনাতিপাত করতে দেখা যায়। কারণ এরা উদ্বাস্তু হয় প্রভাবশালী মহলের কূটচালে। তাই প্রতিবেশীরা এদের আশ্রয় দিতে ভয় পায়। সাধারণত দেশের অভ্যন্তরে এ ধরনের উদ্বাস্তু হতে দেখা যায় কোনো গ্রামের দু একটি বা সংখ্যালঘু কয়েকটি পরিবারকে। ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মহল বিশেষ কোনো মানুষকে ভিটে মাটি ছাড়া করে। প্রভাশালী মহলের ছত্রছায়ায় সমাজ নিয়ন্ত্রিত- তাই এ ধরনের প্রক্রিয়ায় যারা উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়, তাদের খবর তা কিন্তু গণমাধ্যমে আসে না। দেশের অভ্যন্তরে এ ধরনের শ্বেত উদ্বাস্তুর সংখ্যাও কিন্তু নেহাত কম না। এদের যথাযথ পরিসংখ্যন পাওয়া যায় না কারণ যারা থাকার জায়গা অর্থাৎ ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয় তারা প্রভাবশালীদের ভয়ে মুখ খুলে না। আর্ন্তজাতিকভাবে নিজ দেশে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়, জাতি বা গোষ্ঠি, বর্ণ বা ধর্মের মানুষ সহিংসতার শিকার হয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয় আর এই উদ্বাস্তুরা অন্য দেশে চলে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করে। এ ধরনের চলে আসা উদ্বাস্তুদের শরণার্থী বলে।
শরণার্থী বা উদ্বাস্তু হিসাবে চিহ্নিত হন সেই ব্যক্তি যিনি নিজ ভূমি ছেড়ে অথবা আশ্রয়ের সন্ধানে অন্য দেশে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করেন। জাতিগত সহিংসতা, ধর্মীয় উগ্রতা, জাতীয়তাবোধ, রাজনৈতিক আর্দশগত কারণে সমাজবদ্ধ জনগোষ্ঠির নিরাপত্তাহীনতাই উদ্বাস্তু হওয়ার প্রধান কারণ। তবে যিনি শরণার্থী বা উদ্বাস্তুরূপে স্থানান্তরিত হন তিনি আশ্রয় প্রার্থী হিসাবে পরিচিত হন। আশ্রয়প্রার্থীর দাবিগুলি রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত হতে হবে। পারিবারিক বা সামাজের প্রভাবশালীদের ষড়যন্ত্রের কবলে পড়া উদ্বাস্তুরা এ সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না।
বিশ্বজুড়ে উদ্বাস্তু বা শরণার্থীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০০৫ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান, ইরাক, সিয়েরালিওন, মায়ানমার. সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান এবং ফিলিস্তিন প্রধান শরণার্থী হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিল। আইডিপি তথ্যানুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শরণার্থী মানুষ এসেছে দক্ষিণ সুদান থেকে, যার সংখ্যা ছিল পাঁচ মিলিয়ন। জনসংখ্যা অনুপাতে আইডিপির হিসাব অনুযায়ী ২০০৫ সালে বেশি শরণার্থী রয়েছে আজারবাইজানে। আজারবাইজানের প্রায় আট লাখ শরণার্থী অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে যা ২০০৬ সালের তথ্য থেকে জানা যায়। বিশ্বজুড়ে এখন শরণার্থীর, আশ্রয়প্রার্থী, অভ্যন্তরীণ বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা ছয় কোটি ৫৬ লাখ। এই সংথ্যা ২০১৫ সালের চেয়ে তিন লাখ বেশি।
১৯৫১ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক শরণার্থীদের মর্যাদা বিষয়ক সম্মেলনের অনুচ্ছেদ ১ এ তে সংক্ষিপ্ত আকারে শরণার্থীর সংজ্ঞা তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি যদি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন ও দেথতে পান যে, তিনি জাতিগত সহিংসতা, ধর্মীয় উন্মাদনা, জাতীয়তাবোধ, রাজনৈতিক আদর্শ, সমাজবদ্ধ জনগোষ্ঠির সদস্য হওয়ায় তাকে ওই দেশের নাগরিক অধিকার থেকে দুরে সরানো হচ্ছে, সেখানে ব্যাপক ভয় ভীতিকর পরিবেশ বিদ্যমান এবং রাষ্ট্র তাকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে পারছে না। তখনই সে শরণার্থী হিসাবে বিবেচিত হবেন। মায়ানমারের রোহিঙ্গারা কি উদ্বাস্তু না শরণার্থী হিসাবে বিবেচিত হবে এটাই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ রাষ্ট্র স্বয়ং সেনাবাহিনী দ্বারা এদের উচ্ছেদ কার্যক্রম চালাচ্ছে নিরাপত্তা বিধান করা করা তো দূরের কথা।
১৯৬৭ সালের সম্মেলনের খসড়া দলিলে উদ্বাস্তুর সংজ্ঞাকে বিস্তৃত করা হয়। আফ্রিকায় এবং ল্যাটিন আমেরিকায় অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক সম্মেলনে যুদ্ধ এবং অন্যান্য সহিংসতায় আক্রান্ত ব্যক্তি কর্তৃক নিজ দেশত্যাগ করাকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ পাক হায়েনার আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য ভারতে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় গ্রহণ করে। সেই সময় ভারতের সীমান্তবর্তী জেলা সমূহে অসংখ্য শরণার্থী শিবির ভারত সরকার খুলেছিলেন। ১৯৬৭ সালের সংজ্ঞানুসারে শরণার্থীকে প্রায়শই ভাসমান ব্যক্তি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ্ওই সম্মেলনে গৃহিত সংজ্ঞানুসারে আরো বলা হয়, যদি যুদ্ধের কারণে নির্যাতন, নিপীড়নে আক্রান্ত না হয়েও মাতৃভূমি ত্যাগ করেন অথবা জোরপূর্বক নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হন, এ ধরনের ব্যক্তিরাও শরণার্থী হিসাবে বিবেচিত হবেন। দুনিয়া জুড়ে শরণার্থী বাড়ছে আর এই শরণার্থীর চাপ পড়ছে দরিদ্র দেশগুলির ওপর। তাই জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপো গ্রান্ডি সতর্ক করে বলেছেন, উদ্বাস্তু মানুষের চাপ নিতে হচ্ছে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর। বিশ্বের দরিদ্র এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে বিশ্বের উদ্বাস্তুর ৮৪ শতাংশ অবস্থান করছে। তার প্রশ্ন ছিল, বিশ্বের ধনী দেশগুলো যেখানে উদ্বাস্তু নিতে রাজি হচ্ছে না সেখানে কী করে আমি আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এশিয়ার স্বল্পউন্নত দেশগুলোকে উদ্বাস্তু নিতে বলবো?
হৃদয় বিদারক বিষয় হলো, ইতোমধ্যেই হাঙ্গেরিসহ কতিপয় পূর্ব ইউরোপীয় দেশ শরণার্থীদের ওপর নানা অমানবিক আচরণ করে আসছে। গত ৩১ আগস্টে রয়টার্স এবং এএফপির প্রচারিত ছবিতে শরণার্থী শিশু যে সব প্লাকার্ড বহন করে তাতে লিখা ছিল “ও ধিহঃ ঃড় মড় ঃড় এবৎসধহু” “ও ধিহঃ ঃড় ষরাব রহ ংবপঁৎরঃু” ডব ফড়হঃ ধিহঃ ঃড় ংঃধু রহ ঐঁহমধৎু. ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী ব্যস্ততম হাইওয়েতে একটি ট্রাকলরিতে ৭১ জন নিরীহ শরণার্থী নিহত হয়। এই মর্মান্তিক খবরটি বিশ্ব বিবেককে তেমন নাড়া দিতে পেরেছে বলে মনে হয় না। সম্প্রতিকালে ভূমধ্য সাগরের জাহাজে ফাটল দেখা দেয় এতে ১১১ টি নিরীহ শরণার্থীর প্রাণ ঝরে যায়। তাছাড়া হাঙ্গেরি গত ২৯ আগস্ট থেকে সার্বিয়ার সীমান্তে ১৭৫ কিলোমিটার জুড়ে ন্যাটোর আদলে তিন ভাজের রেজর তারের বেড়া তৈরি করতে শুরু করেছে। অধিকন্তু পাথরা কু-া সীমান্তে ৪-৪ এবং অস্ত্রের সাহায্যে সীমান্ত পাহাড়া জোরদার করা হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে কেন ধনী দেশগুলো শরণার্থী নিতে রাজি হয় না। অথচ দরিদ্র এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলিতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের সাহায্যে এগিয়ে আসে তার কারণ কী। কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, এদের উদ্বাস্তু করার পেছনে এই ধনীদেশগুলির পরোক্ষ কারসাজি রয়েছে। ধনী দেশগুলি তাদের ভোগবাদি জীবনযাপনের জন্য পরোক্ষভাবে ইন্ধন জুগিয়ে উদ্বাস্তু করেছে আর স্বল্পউন্নত দেশগুলো বা মধ্যম আয়ের দেশগগুলো যেন শিরদাড়া উঁচু করে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হতে না পারে তার জন্য আশ্রয়রত শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার জন্য অনুরোধ জানায় আর তারা আশ্রয়দেয়া শরণার্থীদের সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দেয়।
পৃথিবী জুড়ে ভোগবাদির বৈশিষ্ট্য এক এবং অভিন্ন। শক্তির নিত্যতা সূত্রানুযায়ী এদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। শক্তির নিত্যতার সূত্রতে বলা আছে, শক্তি অবিনাশী। এটা একরূপ থেকে অন্য রুপে রুপান্তরিত হয় মাত্র। ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থায় সরপৎড় লেবেলে উদ্বাস্তু করা একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি, কোনো ব্যক্তির সম্পদ ভোগ করার লক্ষ্য নিয়ে তার উপর মানসিক উৎপীড়ন চালানো হয়। এক পর্যায়ে মানসিক পীড়নে ব্যক্তিটি অনেক উল্টাপাল্টা কাজ করতে শুরু করে আর সমাজের কাছে উৎপীড়নকারীরা এটা প্রমাণ করে যে ব্যক্তিটি মানসিক রোগী। তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে আর এই সুযোগে তার সম্পদকে তারা কুক্ষিগত করে নেয়। বাংলাদেশের গ্রাম বা শহরে মহল বিশেষের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে অনেক ব্যক্তিকে মানসিক রোগী হয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে আর নইলে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ফুটপাতে রাত কাটায়। কথিত ওই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরাঘুরি করা মানসিক রোগিটির সম্পদ ভোগ করছে একটি মহল বিশেষ যারা তাকে মানসিক বিকারগ্রস্ত হিসাবে সমাজে পরিচিত ঘটিয়েছে। এই হলো সরপৎড় লেবেলে সম্পদ ভোগ করার জন্য মানুষকে উদ্বাস্তু বানানোর একটি একটি কৌশল। গধপৎড় লেবেলে এই উদ্বাস্তুকরণের ষড়যন্ত্রটি আরেকটু গভীরভাবে কৌশলায়িত হয় যা জনগণের চোখকে আড়াল করতে ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িকতা বা বর্ণবাদ বিষয়টি বিশেষভাবে চাপিয়ে দিয়ে সহিংসতার রোষানলে ফেলে মানুষকে উদ্বাস্তু করা হয়।
সম্পদ ও সম্পত্তির মালিকানার কারণে বিশ্বজুড়ে নিরীহ বা সংখ্যালঘু ( ধর্মীয়, বর্ণ বা ভাষার অনুপাতে) মানুষকে উদ্বাস্তুতে পরিণত করছে। কর্তৃত্ববাদীদের রোষানলে পড়ে মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। তাই পৃথিবীর সমস্ত সম্পত্তি যেদিন সমাজিক মালিকানার অর্ন্তভুক্ত হবে, সেদিন আর একটি উদ্বাস্তু পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাই ব্যক্তি মালিকানার বিলোপ ঘটিয়ে সামাজিক মালিকানায় সম্পদ ও সম্পত্তি আনার যে ব্যবস্থা রয়েছে তা প্রবর্তনের জন্য বিপ্লবী গণআন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজন। সম্পত্তির সামাজিক মালিকানা আনায়ন ব্যতিত পৃথিবীতে শরণার্থীর বা উদ্বাস্তু রোধ করা সম্ভব না।
লেখক:- কলামিস্ট