উৎসব

আপডেট: জুন ১৪, ২০১৮, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


যে কোনো উৎসব মানেই নানা আয়োজন। আর এসব আয়োজনের মাধ্যমে আনন্দ পাওয়া এবং দেওয়াই প্রতিটি উৎসবের মূল উপজীব্য। উপলক্ষ্য যাই হোক উৎসব মানুষকে মিলায় এবং সে মিলনক্ষেত্রের আনন্দের রেশ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। উৎসব বিভেদ ভোলায়, মনের কলুষতা দূর করে। হিংসা বিদ্বেষ ভুলে একে অন্যের সহৃদ হয়ে উঠে উৎসব আয়োজনে। আসছে ঈদ অর্থাৎ ঈদুল ফিতর। দীর্ঘ এক মাস সংযম পালনের পরে আসে খুশির ঈদ। আমরা জানি রমজান মাসে প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ১৭ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা মোটেই কোনো সহজ কাজ নয়। এর উপরে রয়েছে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা। দীর্ঘ রৌদ্র তপ্তদিন মুসলিম সম্প্রদায়ের বিশেষ কিছু মানুষ (শিশু, অসুস্থ) বাদে সবাই রোজা রাখেন। এছাড়াও রয়েছে রোজার নানা নিয়ত- যেগুলো রক্ষা না করলে রোজা হয় না। অত্যন্ত কঠোর নিয়ম পালনের ভেতর দিয়ে অতিবাহিত হয় পবিত্র রজমান মাস।
উৎসব মানুষকে মানবিক হতে শেখায়। উৎসব যদি সীমাবদ্ধ থাকে, গ-িবদ্ধ থাকে বিশেষ শ্রেণি-পেশার কিংবা সম্প্রদায়ের মানুষের ভেতরে তাহলে সকলে তার অংশীদার হতে পারে না। উৎসব জাতি ধর্ম- বর্ণ গোত্র বিশেষের একার নয়- সকলকে উৎসব আয়োজনে সম্পৃক্ত করাই উৎসবের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ। যদি কেউ বিমুখ হয় কিংবা কোনো কারণে উৎসবের বাইরে থাকতে বাধ্য হয় তাহলে উৎসবের আনন্দ ম্লান হয়ে যায়।
উৎসব মানুষকে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে। ঈদের আনন্দ চলে বেশ কয়েকদিন ধরে। জাতি-ধর্ম- গোত্র নির্বিশেষে ঈদ আনন্দে শামিল হয়। উৎসব মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভোলায়। তাই তো লক্ষ্য করি একে অন্যকে ভালোবেসে বুকে টেনে নেন, কোলাকুলি করেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। উৎসব মানুষকে কাছে আসার সুযোগ করে দেয়। এজন্যই ঈদুল ফিতরে সবাই মিষ্টি মুখ করায় সবাইকে। সেমাই (নানা রকমের) ঈদের এক অন্যতম আকর্ষণীয় খাবার। ধনী-গরীব নির্বিশেষে নানা রকম সেমাই রান্না হয় বাড়ি বাড়ি। শুধু সেমাই নয়, নানা রকম হালুয়াও ঈদের আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়।
আত্মীয়-স্বজনের সাথে সারা বছরে দেখা- সাক্ষাৎ না থাকলেও এসময় সবাই চেষ্টা করে আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সকলের সাথে দেখা করার, কুশল বিনিময় করার।
উৎসব মানুষকে ত্যাগের আদর্শে উজ্জীবিত করে, এজন্যই ঈদে প্রত্যেকে যাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দান করে।
ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের নানা পরিকল্পনা থাকে। এক্ষেত্রে ধনী-গরীব ভেদাভেদ নেই। সকলেই তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন পোশাক পরে। নতুন পোশাকে মনে আনন্দ আসে। সে আনন্দ রঙ্গিন হয়ে উঠে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে। মানুষ শুধু কুশল বিনিময়ই করে না মুরুব্বীদের সালাম করে আশীর্বাদ চায়। ঈদ আনন্দে মনে এক অদ্ভুত ভালোবাসা কাজ করে, মন পবিত্র হয়ে ওঠে। পবিত্র মনে যে কাজ করা যায়, সে কাজও পবিত্র ও সুন্দর হয়ে ওঠে।
দেশ, জাতির কল্যাণে যদি আমরা ঈদের আদর্শ ও অনুভূতিকে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে নিঃসন্দেহে। রমজানের আদর্শকে ধারণ করে যদি এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি মুসলমানেরা সারা বছর অতিবাহিত করেন তাহলে এদেশের মানুষের মত সুখি, সমৃদ্ধ ও উন্নত জাতি বিশ্বে বিরল হবে। রমজানের আদর্শ যেন শুধুমাত্র রমজান মাসের ভেতরে সীমাবদ্ধ না থাকে। সারা বছর সকলের কর্মে ও চিন্তায় যেন সে আদর্শের প্রতিফলন ঘটে। তাহলে সব মানুষ সৎ আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ভালো কাজ করবে- সে ভালো কাজের সুফল আপামর জনগোষ্ঠী ভোগ করবে, দেশ উন্নত হবে।
হিংসা-বিদ্বেষ মন থেকে আপনা-আপনিই দূরীভুত হবে। আর হিংসা-বিদ্বেষ না থাকলে যে কোনো কাজে মানুষ আন্তরিক হবে- আন্তরিকতা কাজের মান বাড়বে, কাজের মান বাড়লে সর্বত্র গ্রহণযোগ্য হবে। দেশের উন্নয়নের জন্য তখন সরকার, জনপ্রশাসন কিংবা সমাজসেবীদের দুর্ভাবনা করতে হবে না। আন্তরিকতা থাকলে অসম্ভব বলে কোনো কাজ থাকে না। যারা ¯্রষ্টার প্রতি অনুগত তাঁরা ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া বা লোভলালসার অনেক উর্ধ্বে অবস্থান করেন। কোন্ েখারাপ কাজ তাঁদের দ্বারা হওয়া সম্ভব নয়। যে দেশে আপামর জনগণ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে সে দেশে কোনো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটতে পরে না। ধর্মীয় সংস্কার এবং কুসংস্কার- এ দুটোর ভেতরে পার্থক্য আছে। ধর্মীয় অনুশাসন যদি সময়ের প্রচলনে কুসংস্কারে পরিণত হয় সেটি দেশ-জাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। কুসংস্কার মানুষকে অন্ধ করে ভালো-মন্দের বিচার করার ক্ষমতা রহিত করে। কুসংস্কারমুক্ত মানুষ প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী মানুষ-জ্ঞানই মানুষকে সুপথে পরিচালিত করে।
যে কোনো ধর্মীয় উৎসব পালনের সময় ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা মনে রেখে উৎসব আয়োজন করা উচিৎ। নচেৎ ধর্মের অপব্যাখ্যা ধর্মকে অধঃপতিত করে। এটি কারও কাম্য নয়।
আসন্ন ঈদ উৎসব সফল হোক- সকলের অন্তরে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ ও ভালোলাগা। সকলের অন্তরে ছড়িয়ে পড়–ক ভালোলাগার রেশ, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বের মহান আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হোক প্রতি ঘরে।