একাদশ সংসদ নির্বাচন: নওগাঁ-১ আসন || আওয়ামীলীগের অবস্থান শক্ত হলেও নড়বড়ে অবস্থানে বিএনপি

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৮, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

আবদুুর রউফ রিপন, নওগাঁ


(ছবিতে উপর বাম থেকে) সাংসদ ও নওগাঁ জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার, নিয়ামতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য ডা. ছালেক চৌধুরী, সাপাহার উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুন নূর, পোরশা উপজেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা ও বিএনপি নেতা শাহ আহমেদ মোজ্জাম্মেল চৌধুরী-সোনার দেশ


সারা দেশে বইছে আসন্ন সংসদ নির্বাচনের হাওয়া। কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে দৌড়-ঝাঁপ করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেক মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। সেই নির্বাচনী হাওয়াও বইতে শুরু করেছে নওগাঁর প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায়। নওগাঁ জেলার পশ্চিমে ভারত সীমান্ত ঘেষা বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে অবস্থিত পোরশা, সাপাহার ও নিয়ামতপুর উপজেলা। এই তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত নওগাঁ-১ আসন। জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকা আসন নম্বর ৪৬।
বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনটি আওয়ামীলীগের দখলে যায় নবম সংসদ নির্বাচনে। পর পর দু’বার বিএনপি ক্ষমতায় না থাকায় বর্তমানে পাল্টে গেছে এই আসনের ভোটের হিসাব-নিকাশ। বর্তমান সরকারের বদৌলতে স্থানীয় সাংসদ ও জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার প্রত্যন্ত অবহেলিত এই অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছেন উন্নয়নের ছোঁয়া। আধুনিক মান সম্মত যোগাযোগ ব্যবস্থা এই অঞ্চলের প্রধান দৃশ্যমান উন্নয়ন যা এই অঞ্চলের মানুষের কাছে ছিলো স্বপ্ন।
জেলার তিনটি উপজেলাই বরেন্দ্রভূমি। এক সময় বছরে ধান চাষ হতো মোটেই এক মৌসুমে। তা ছিল শুধু রোপা ও আমন। কিন্তু বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে পানি সেচ সমস্যার অনেকটাই সমাধান করেছে। ফলে উপজেলাগুলোতে ইরি-আমনসহ সারা বছরই বিভিন্ন ফসল ফলানোর সুবিধা পাচ্ছে। গড়ে উঠছে নতুন নতুন আম বাগান। খাদ্যের চেয়ে উপজেলাগুলোতে পানিই ছিল বড় সঙ্কট। বেহাল অবস্থা ছিল সড়ক পথের। এখন উপজেলাগুলোতে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। গ্রামে গ্রামে জ্বলছে বৈদ্যুতিক বাতি। সড়কের উন্নয়ন হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও হয়েছে আগের তুলনায় অনেক সহজতর ।
এ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৯ শ ২৯জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৯১ হাজার ৫২ জন এবং নারী ভোটার এক লাখ ৯৫ হাজার ৯২৭ জন।
নির্বাচনী এলাকা ঘুরে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নওগাঁ-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে কোন প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী না থাকায় বর্তমানে আ’লীগের অবস্থান খুবই শক্তিশালী। অপরদিকে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই আসনে তৈরি হয়েছে আগাম নির্বাচনী আমেজ। নির্বাচন ও সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে ভোটারদের মধ্যে চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। প্রতিটি দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা প্রতিটি ইউনিয়নে কর্মিসভা, আলোচনা সভা, সমাবেশ ও গণসংযোগ করে চলেছেন। নির্বাচনী মাঠ দখল এবং মনোনয়ন নিশ্চিত করতে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ব্যাপক দৌড়ঝাঁপও শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন ধর্মীয় , সামাজিক ও দলীয় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা তাদের প্রয়োজনীয়তা ও উপস্থিতি জানান দিতে কার্পণ্য করছেন না।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার বিপুুল ভোটের মাধ্যমে তিনবারের নির্বাচিত বিএনপির সাংসদ ডা. ছালেক চৌধুরীকে পরাজিত করেন। এরপর দশম সংসদ নির্বাচনেও বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার জয়লাভ করেন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে এখন পর্যন্ত নওগাঁ জেলার সাধারণ সম্পাদক ও ধর্ম মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদারের একক নাম শোনা যাচ্ছে। এই আসনে আওয়ামীলীগের আর কোন মনোনয়ন প্রত্যাশী না থাকায় বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার বেশ শক্তিশালী ও সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন।
তাছাড়া পর পর দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় এবং দল ক্ষমতায় থাকার সুবাদে নওগাঁ-১ আসনের তিনটি উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা, পানির সুব্যবস্থা, বনায়ন, শিক্ষার প্রসারে ভালো অবদান রেখেছেন বাবু সাধন চন্দ্র মজুমদার। এরই মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ, সাধারণ মানুষের উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। সব মিলিয়ে নওগাঁ-১ আসনের সংসদ সদস্য সাধন চন্দ্র মজুমদার নিজের ও নিজ দল আওয়ামীলীগের গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মী জানায়, সাংসদ সাধন চন্দ্র মজুমদার যতটুকু সময় ঢাকায় থাকেন তার চেয়ে অনেক বেশি থাকেন তাঁর নিজ এলাকায়। ফলে সাধারণ মানুষ তাঁকে সব সময় কাছে পায়। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে কোনো মাধ্যম লাগে না। এতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যে কোন সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে সহজে যেতে পারে। এতে তিনি যেমন এলাকার বিষয়ে সরাসরি জানতে পারেন, ঠিক তেমনি সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত ও এলাকার সমস্যা তাঁর কাছে তুলে ধরতে পারেন।
এলাকার অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা মনে করেন, সাধন চন্দ্র মজুমদার ওই তিন উপজেলায় একটি আকর্ষণীয় ভাবমূর্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এ কারণে তাঁর সমান্তরালে দ্বিতীয় কোনো আওয়ামী লীগ নেতা নির্বাচন করার মতো অবস্থানে নেই।
অপর দিকে, বিএনপি থেকে দলটির নিয়ামতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য ডা. ছালেক চৌধুরী, সাপাহার উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুন নূর, পোরশা উপজেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা ও বিএনপি নেতা শাহ আহমেদ মোজ্জাম্মেল চৌধুরী মনোনয়ন প্রত্যাশী।
নওগাঁ-১ আসনের তিন উপজেলায় উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিএনপির দলীয় কোন্দল বেশ প্রকট। তৃণমূলের কর্মীরা বুঝে উঠতে পারছে না কোন নেতার খুঁটি কত মজবুত।
১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য ডা. ছালেক চৌধুরী। তাঁর সময়ে তিনি ওই এলাকায় যোগাযোগ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বেশ অবদান রেখেছিলেন। বর্তমানে এই তিন উপজেলায় বিএনপির দলীয় কোন্দলের কারণে তাঁর একক নেতৃত্ব গড়ে উঠেনি। ফলে তৃণমুল নেতাকর্মীদের মাঝে এক ধরনের হতাশা কাজ করছে। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কাছ থেকে নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখে পরিস্থিতি অবলোকন করছেন তৃনমূল নেতাকর্মীরা।
গত ৮-৯ বছর ডা. ছালেক চৌধুরী তৃণমূল নেতকর্মীদের সঙ্গে তেমন যোগযোগ রক্ষা করতে পারেন নি। অনেক সময়ই নেতাকর্মীদের সঙ্গে বাজে আচরন করেছেন বলে একধিক নেতাকর্মীদের অভিমান রয়েছে।
এদিকে, ১৯৯১ সাল থেকে বিএনপির মনোনয়ন চেয়ে আসছেন সাপাহার উপজেলার বিএনপি সভাপতি সাবেক অধ্যক্ষ আবদুন নুর। শান্ত ভদ্র এবং মৃদুভাসী নেতা হিসেবে নেতাকর্মীদের মাঝে তাঁর একধরনের গ্রহণ যোগ্যতা রয়েছে। সাপাহার উপজেলার মত অপর দুই উপজেলা পোরশা ও নিয়ামতপুরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর তেমন যোগাযোগ গড়ে উঠেনি বলে জানান বিভিন্ন পর্যায়ের বিএনপি নেতাকর্মীরা।
এছাড়া, বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী পোরশা উপজেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা বয়সে বেশ তরুণ। দলীয় কর্মকাণ্ডের চেয়ে প্রচার-প্রচারনায় বেশ এগিয়ে আছেন তিনি। পোরশা উপজেলায় বাইরে নিয়ামতপুর ও সাপাহার উপজেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে তেমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন নি এ নেতা।
ওই এলাকার বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই এলাকায় বিএনপির দলীয় কার্যক্রম নিয়ে তাদের তেমন কোন ভাবনা নেই। তাদের মুল ভাবনা বিএনপি থেকে কে মনোনয়ন পাবেন। যাগ্য নেতা মনোনয়ন পেলে এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এই আসনে বিএনপি প্রার্থীই জয়ী হবে বলে তাঁদের বিশ্বাস। এ ছাড়া এই আসনে দলের বাইরে গিয়ে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হবেন না বলেও বিএনপি নেতাকর্মীরা জানান।
অন্যদিকে, জাতীয় পাটির আকবর আলী কালু মনোনয়ন প্রত্যাশী। তবে জাতীয় পার্টির একাধিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাতীয় পার্টির ভোট পাওয়ার চেয়ে ১৪ দলের সাথে দরকষাকষিই বড় কথা।
এ ছাড়াও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন ইসলামী আন্দোলনের (ইসা) পোরশা উপজেলা শাখার সাবেক সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ।
সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নওগাঁ-১ আসনের তিনটি উপজেলায় নওগাঁ জেলার শেষ প্রান্তে হওয়ায় বেশ অবহেলিত। তারা সেই যোগ্য নেতাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন। যিনি এই অবহেলিত এলাকার হয়ে কাজ করবেন। এই এলাকা অসমতল ও উচুঁ-নিচুঁ বরেন্দ্র এলাকা হওয়ায় এই এলাকার মুল সমস্যা পানি। এখনো এই এলাকার অনেক লোককে দূর দূরান্ত থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হয়। তাছাড়া যোগাযোগ সমস্যা এই এলাকার বড় সমস্যা। নওগাঁ জেলার মধ্যে শিক্ষার হার এই এলাকায় সবচেয়ে কম। দরিদ্র ও সমতল নৃ-গোষ্ঠীর লোক এই এলাকায় বেশি বসবাস করে। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে এই ইস্যুগুলোই প্রাধান্য পাবে। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হলে যে প্রার্থী এই সমস্যাগুলো সমাধানের আস্থা অর্জন করতে পারবেন তিনিই বিজয়ী হবেন বলে সাধারণ ভোটারদের বিশ্বাস।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ