একুশ মানে মাথা নত না করা

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৮, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই থেকে জয় বাংলা। বাহান্ন সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৭১, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা। এ ভাবেই বাঙালি ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা এবং গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক স্বাধিকার অর্জনের লড়াই সংগ্রামের পথ ধরে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দাবিতে একুশের শহিদরা রক্তের বিনিময়ে যে পথ রচনা করেছিলেন সেই পথ ধরেই একুশের শহিদদের স্বপ্ন ও আদর্শকে সম্বল করে এক দিন বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা এক সাগর রক্ত দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিল।
অমর একুশের প্রত্যয় সব অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও কূপমণ্ডুকতা থেকে মুক্তি। ভাষার অবিনাশী শক্তি মানুষের আত্মিক মুক্তি, সৃজনশীল বিকাশ এবং তার মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন ভাবে সম্পর্কিত। ভাষার এই মুক্তিই বাংলাদেশের মানুষকে বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত নিয়ে গেছে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে। এই লক্ষ্য অর্জন করেছে বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ প্রায় আড়াই দশকের লড়াই সংগ্রাম এবং একটি রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে।
১৯৪৮ থেকে ১৯৭১, এই সময়ের মধ্যে অনেকগুলো বাঁক পেরোতে হয়েছে বাংলাদেশের মানুষকে। অনেক সংগ্রাম, অনেক রক্তের মধ্য দিয়ে পেরোতে হয়েছে। ইতিহাসের এক নির্মম ও রক্তাক্ত অধ্যায় ছিল ১৯৪৭ সালে জিন্নাহর ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে উপমহাদেশের বিভক্তি। এই রক্তাক্ত অধ্যায়টির মধ্যে একটি বড় প্রহসন ছিল। প্রহসনটি হচ্ছে পূর্ব বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠিই পাকিস্তান গঠনের পক্ষে নিরঙ্কুশ ভাবে ভোট দিয়েছিল, কিন্তু মাত্র এক বছরের মধ্যেই ‘সাধের পাকিস্তান’ সম্পর্কে মোহমুক্তি ঘটে বাঙালির। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ যখন বললেন ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা’, তখনই পাকিস্তান সম্পর্কে পূর্ববাংলার বাঙালির মোহভঙ্গ ঘটে। রুখে দাড়ায় বাঙালি। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে একটি বিস্মকর তথ্য হল পুরনো ঢাকার মানুষ যাদের সাধারণত ‘ঢাকাইয়া কুট্টি’ বলা হয়, এরা এক ধরনের অশুদ্ধ উর্দুতে কথা বলে, এরাও রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রীতিমতো লড়াই করেছে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। এ থেকে ভাষার লড়াইয়ের ব্যাপ্তিটা বোঝা যায়।
’৫২ সালে ভাষার সংগ্রাম চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। সেই শুরু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালির সংগ্রামের।
পাকিস্তানের ওপর এর পরের বড় আঘাতটি ছিল ১৯৫৪ সালে। পূর্ব বাংলাকে তখন পূর্ব পাকিস্তান করে ফেলেছে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি। পূর্ব পাকিস্তানে প্রাদেশিক পরিষদের নিবার্চন হয় এই বছরে, ভারত ভাগের পরে পাকিস্তানে প্রথম নির্বাচন। ভরাডুবি হল পাকিস্তানের ‘প্রতিষ্ঠাতা দল মুসলিম লিগের’। প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে মুসলিম লিগ পেয়েছিল মাত্র নয়টি আসন।অবশিষ্ট ৩০০ আসনে বিজয়ী হয় আওয়ামি লিগের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট নৌকা প্রতীক নিয়ে। সেই যে হার, এর পর আর কোনও সময়েই মুসলিম লিগ এই দেশের রাজনীতিতে তাদের পূর্ব অবস্থা ফিরে পায়নি। বলা যায়, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা দলটি দেশটির একটি প্রদেশ থেকে নির্মূল হয়ে গেল। সেই যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুসলিম লিগের পরাজয় হল, সেটাই সূচনা করল স্বাধীন বাংলাদেশ অভিমুখে বাঙালির যাত্রার।