এক দশকের ব্যবধান পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি বেড়েছে ১৭৫%

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


সুদিন ফিরছে সোনালি আঁশের। বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়াসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এ খাতে ৪১ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হলেও গত অর্থবছরে তা ১১৪ কোটি ৩৬ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে রফতানি বেড়েছে প্রায় ১৭৫ শতাংশ। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে ।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাটের পাশাপাশি জুট ইয়ার্ন, টুওয়াইন, চট ও বস্তা রফতানি করা হয়। এর পাশাপাশি রফতানি হয় হাতে তৈরি বিভিন্ন পাটজাত পণ্য ও কার্পেট।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি থেকে ৪১ কোটি ৭৪ লাখ ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। পরের দুই বছরে তা যথাক্রমে ৮৭ কোটি ৩২ লাখ এবং ১২১ কোটি ৮২ লাখ ডলারে উন্নীত হয়। এরপর ২০১১-১২ অর্থবছরে ১০৫ কোটি ৫০ লাখ এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১১৪ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি হয়। পরের দুই অর্থবছরে রফতানি ১০০ কোটি ডলারের নিচে নেমে আসে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৯৩ কোটি ৮০ লাখ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হয়। তবে পরের অর্থবছরগুলোয় ঘুরে দাঁড়িয়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১০৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১০৭ কোটি ৯০ লাখ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১১৪ কোটি ৩৬ লাখ ডলারে উন্নীত হয় রফতানি আয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানিতে। পাশাপাশি দেশীয় চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোয় দেখা দেয় কর্মহীনতা, যার প্রভাব পড়ে পাটের উৎপাদনেও। তবে পরবর্তী সময়ে রফতানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ, কৃষকের ন্যায্য দাম প্রাপ্তি, রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিলগুলোকে সক্রিয় করা ও দেশের অভ্যন্তরে পাট পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। যেমন জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছে। এরই মধ্যে ২৩৫ রকম বহুমুখী পাটপণ্য তৈরি করা হয়েছে, যা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রফতানিও হচ্ছে। এছাড়া পলিথিনের বিকল্প ‘সোনালি ব্যাগ’, ভিসকস, কম্পোজিট জুট টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস পণ্য, চারকোল এবং পাট পাতার পানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পাট শিল্পে নতুন দিগন্তের উন্মোচনে কাজ করা হচ্ছে। ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০’-এর আওতায় ১৭টি পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটের বস্তার চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো বহুমুখী পণ্য ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ও অপচয় রোধে কাজ করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে দেশের পাট শিল্প।
এ বিষয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেন, এ খাতের উন্নয়নে একমুখী পদক্ষেপ না নিয়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাটের বহুমুখী পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। প্রচলিত ও দীর্ঘদিনের বাজারের পাশাপাশি নতুন বাজারে পণ্য রফতানি করা হচ্ছে। বেসরকারি খাতকে পাটপণ্য উৎপাদন ও রফতানিতে সব ধরনের সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনকে (বিজেএমসি) স্বচ্ছ ও দক্ষভাবে পরিচালিত করা হচ্ছে। আগের তুলনায় লোকসানও কমে এসেছে। আবার পাটের উৎপাদন বাড়াতে কৃষককে প্রণোদনা ও আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যার সুফল আমরা এখন পাচ্ছি।
জানা গেছে, বিশ্বে উৎপাদিত কাঁচা পাটের ৫৫ শতাংশ উৎপাদন করছে ভারত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবদান ৪০ শতাংশ। তবে পাট খাতের বৈশ্বিক রফতানি আয়ের ৭২ শতাংশই এখন বাংলাদেশের দখলে। রফতানি আয়ে ভারতের অংশীদারিত্ব হলো ১৯ শতাংশ। এছাড়া চীন, নেপাল ও পাকিস্তানের প্রত্যেকের প্রায় ১ শতাংশ করে অবদান রয়েছে। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি থেকে প্রায় ১০৮ কোটি ডলার আয় করলেও ভারত আয় করেছে প্রায় ৩২ কোটি ডলার। যদিও বাংলাদেশের এ আয় আরো বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববাজারে শুধু পাটের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে ৫০০ বিলিয়ন পিস। এর ১০ শতাংশও দখল করতে পারলে শুধু এই একটি পণ্য থেকে বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জুট ডাইভারসিফায়েড প্রডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেডিপিএমইএ) সভাপতি ও ক্রিয়েশন প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাশেদুল করিম মুন্না বলেন, বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের কারণে পাটের সম্ভাবনা অফুরন্ত। আগামী ১০ বছরে পাট শিল্প থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার আয় করা মোটেও কোনো স্বপ্ন নয়। এজন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কারখানা স্থাপন করতে হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য প্রবেশের জন্য গবেষণা বাড়ানো ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদামাফিক পণ্য তৈরির জন্য দেশে দক্ষ জনবল তৈরি করা প্রয়োজন।