এক যে ছিল রাজা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৯, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

সোলায়মান সুমন


এক দেশে ছিল এক রাজা। নাম তার বীরেন সিং। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া। পুকুরভরা মাছ, বাগানে নানা জাতের ফল, ফুল। তারপরও রাজার মনে সুখ নাই। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে, এক রাক্ষস এসে প্রজাদের জমির ধান, পুকুরের মাছ, লাঙলের গরু সব খেয়ে ফেলে। রাজদরবারে রাজা চিন্তিত অবস্থায় বসে আছেন। রাজন্যদের সাথে বসে পরামর্শ করছে। প্রাসাদেও নিরাপত্তার জন্য প্রহরী বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাই হয়ত সে রাক্ষস এখনো প্রাসাদে আক্রমণ করতে পারেনি। কিন্তু সারা দেশ এভাবে পাহারা বসানো তো সম্ভব নয়। নিরীহ জনগণ মাঝে মাঝে রাক্ষসের আক্রমণে প্রাণ হারাচ্ছে। রাক্ষসের ক্ষুধার গ্রাস থেকে সাধারণ মানুষও রেহাই পাচ্ছে না। যেখানে ধান, গরু, মাছ, ছাগল পাচ্ছে না, সেখানে মানুষ ধরে পটাপট গিলে ফেলছে রাক্ষসটা। শুধু নিজে আরাম আয়েশে থাকলে কি চলবেÑ সাধারণ মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার দায়িত্ব তো তারই। চিন্তিত রাজা দিনের পর দিন অমাত্যবর্গের সাথে পরামর্শ করে চলল। প্রতিদিন রাজদরবারে সভা বসে,আলোচনা হয়। সমাধান কিছুই হয় না। এভাবে দিনের পর দিন কেটে যেতে থাকল। রাজা বীরেন সিং ভীষণ চিন্তিত, ‘ রাক্ষস প্রজাদের গপাগপ খেয়ে ফেলছে, একসময় তো আমার রাজ্যে মানুষই থাকবে না!’ কাদের শাসন করবে সে? প্রজারাই তো তাঁর ঐশ্বর্য। বেশ কয়েকদিন পরের কথা। তাঁর রাজদরবারে সিংহদ্বারে এক দরবেশ এসে প্রহরীর কাছে রাজার সাথে সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। প্রহরী দরবেশকে বলল, ‘রাজা দরবারে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে অমাত্যবর্গের সাথে পরামর্শ করছে এখন যাওয়া যাবে না।’ দরবেশ বলল, ‘প্রহরী আমি তোমার রাজার মুসকিল আসান করার জন্যই বহুদূর থেকে এসেছি।’ প্রহরী ভীষণ বিরক্ত হল। অন্যকেউ হলে কিছু উৎকোচের বিনিময়ে সে তাকে দরবারে প্রবেশের ব্যবস্থা করতে পারত। কিন্তু এ তো ফকির-সন্ন্যাসী এর কাছ থেকে তো কানাকড়িও আদায় করা যাবে না। প্রহরীর মনের কথা বুঝতে পেরে দরবেশ বললেন, ‘দেখ বাবা প্রহরী, জগতের সকল মুশিবতের কারণ হচ্ছে লোভ আর ক্রোধ। এ থেকে তুমি বিরত থাকার চেষ্টা করো।’ দরবেশের এ কথা শুনে প্রহরী ঘাবড়ে গেল। ‘ঠিক আছে ঠিক আছে, আপনাকে আর উপদশে দিতে হবে না।’ সে দরবেশকে অপেক্ষা করতে বলে দরবারে এলো। সে রাজ কে বলল,‘মহারাজ, আপনার অনুমতি পেলে একটি কথা বলতাম।’
‘বলো।’ ‘এক দরবেশ আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে। সে রাজদরবারে প্রবেশের অনুমতি চাইছে।’ ‘আমি আছি মহা দুশ্চিন্তায়। সন্ন্যাসীর সাথে দেখা করার সময় আমার আছে? এই নাও।’ রাজা একটা সোনার মোহর বের করে প্রহরীর হাতে দিল, ‘এটা দিয়ে ওকে বিদেয় করো।’ মোহরের দিকে তাকিয়ে প্রহরীর চোখ জোড়া ছানাবড়া হয়ে গেল। দরবেশ যে রাজার মুসকিল আসান করতে চাইছে, সে কথা প্রহরী চেপে যায়। প্রহরী নজের আচকানের গোপন পকেটে সোনার মোহরটি চালান করে সিংহদ্বারে এসে দরবেশকে বলল, ‘চলে যান, সন্ন্যাসী বাবা। রাজা ভীষণ ব্যস্ত। আজ আর দেখা হবে না।’ দরবেশ মুচকি হেসে বলে,‘ঠিক হে। জো মার্জি তোমার বাদশাহের।’ এই বলে দরবেশ চলে গেলেন। সেদিন রাতে রাজা বীরেন সিং স্বপ্নে দেখলেন, আঁধার পথে তিনি হাঁটছেন। হাঁটছেন তো হাঁটছেন। তাঁর সামনে গভীর কুয়াশা। হঠাৎ সে কুয়াশার গভীরতা ভেদ করে এক দরবেশ বেরিয়ে এসে রাজা বীরেন সিংকে বললেন, ‘তোর দরবারে এসেছিলাম, কিন্তু তোর প্রহরী বলল, তুই ব্যস্তÑ তোর সাথে দেখা হবে না। তোর দুশ্চিন্তার সমাধান দিতেই আমি এসেছিলাম। তোর রাজ্যের প্রকৃত মালিক তোর প্রজারা। তাদের উপেক্ষা করে রাজ্যে সুখ ফিরাতে পারবি না। আমার মত সাধারণ প্রজারা তোর কাছে যেতে পারে না। তাদের আরজি তুই শুনিস না। এই তোর প্রজা পালন?’ ‘দরবেশ বাবা আমার ভুল হয়ে গেছে। এক রাক্ষসের অত্যাচারে আমার সব হিত-জ্ঞান ধ্বংস হয়ে গেছে।’
‘আরে বাদশাহ, সেই সমস্যার সমাধান দিতেই তো আমি এসেছিলাম তোর দরবারে।’ ‘দরবেশ বাবা, দয়া করে আমাকে বলে দিন কীভাবে ওই রাক্ষসটাকে হত্যা করে প্রজাদের জীবন রক্ষা করতে পারব।’ ‘পারবি কিন্তু তার জন্য তোর সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রয়োজন হতে পারে। ত্যাগ করতে পারবি?’ ‘যদি একটু বুঝিয়ে বলেন…!’ রাজা সামান্য ভয় পায়। দরবেশ রহস্যের হাসি হেসে ওঠে। ‘আপনি বলেন। পারব আমি পারব।’ রাজা দৃঢ়তার সাথে বলেন। ‘এমন কোনো নিষ্পাপ যুবকের সন্ধান কর, যার কোনো লোভ নেই। মিথ্যা কথা কোনো দিন বলেনি। সবাই তাকে ভালবাসে- বিশ্বাস করে।’ ‘এমন মানুষ কোথায় পাবো? এ বড় শক্ত কাজ।’ ‘পেতেই হবে। সেই ওই রাক্ষসকে হত্যা করার ক্ষমতা রাখে।’ ‘আপনি বলে দিন। কোথায় তাকে পাবো?’ ‘শোনো যে কথা বলি, তোর দেশে প্রসূন নামের এক ছোট্ট নগর আছে। সেখানে এক রাখাল বালক আছে। নাম তার আইজান। তাকে সে নগরের সবাই ভীষণ ভালবাসেÑ বিশ্বাস করে। এখনো সে নিষ্পাপ। তার কাছে সাহায্য চাহ। সেই পারে এ রাক্ষসের হাত থেকে দেশবাসীকে রক্ষা করতে।’ আরো অনেক কিছু জানার ছিল রাজার কিন্তু হঠাৎ দরবেশ উধাও হয়ে গেল। পরের দিন রাজা ঘোষণা দিলেন, প্রসূন নগর কোথায় আছে যত শীঘ্র সম্ভব সন্ধান করা হোক। একদিন যায়, দুদিন যায়, তিন দিন যায় হদিস পাওয়া যায় না প্রসূন নগরের রাজন্যবর্গ বলে, স্বপ্নে দেখা নগরের সন্ধান বাস্তবে কি পাওয়া সম্ভব! কিন্তু এ কথা সাহস করে রাজা বীরেন সিংকে কেউ বলতে পারে না। সবাই কানাঘুসা করে, দুশ্চিন্তায় রাজার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এমন অদ্ভুত গ্রামের নাম তারা কোথাও শোনেনি।

কিন্তু রাজা বীরেন সিংহের বিশ্বাস তাঁর স্বপ্ন শতভাগ সত্যÑ সেদিন যে এক দরবেশ তাঁর সাথে দেখা করতে দরবারে আসতে চেয়েছিলেন সেটা তো সত্য। তাছাড়া স্বপ্নটা রাজার মোটেও স্বপ্ন মনে হয়নি। মনে হয়েছিল, বাস্তব ঘটনা। তিনি যেন জেগেই ছিলেন। যাক সে কথা। এরই মধ্যে রাক্ষস আরো একবার আক্রমণ করে বসে। আবার শত শত নিরীহ প্রজার প্রাণ চলে গেল। এরপরও অনেক দিন কেটে যায়। খোঁজ চলতে থাকে। খোঁজ পাওয়া যায় নাÑ যায় না। অবশেষে প্রসূন নগরের সন্ধান পায় রাজার গুপ্তচরেরা। দেশের শেষ প্রান্তে পাহাড় দিয়ে ঘেরা নিভৃত ছোট্ট এক নগর। রাজ্যের একেবারে সীমান্তে সে নগরটি অবস্থিত। স্থানীয় মানুষের কাছে সেটি প্রসূন নগর হিসেবে পরিচিত। তাদের ভাষা সংস্কৃতি একেবারে ভিন্নÑ স্বতন্ত্র। দেরি না করে রাজা নিজে সে নগরে যাবার প্রস্তুতি নেন। সে কী দীর্ঘ যাত্রা! দুর্গম পথ! পাঁচ দিন ছয় রাত কেটে যায়। তারপর রাজা বীরেন সিং পৌঁঁছায় পাহাড়ের ছায়াঘেরা স্বর্গের মত সুন্দর এক নগরে। এই সেই নগর যার নাম প্রসূন। এক নগরবাসী গাছের তলায় বসে আপন মনে মাটির পুতুল বানাচ্ছিলো। রাজা ও রাজার সফরসঙ্গীদের দেখেও সে এতটুকু বিচলিত হল না। সে আপন মনে নিজের কাজ করে চলেছে। এতে রাজা মনঃক্ষুণœ হলেও কিছু বললেন না। এখন বিস্ময় বালক আইজানকে খুঁজে বের করাই তাঁর একমাত্র কাজ। মৃৎশিল্পীটিকে আইজানের কথা জিজ্ঞেস করতেই সে দূর পাহাড়ের চূড়া দেখিয়ে দেয়। মৃৎশিল্পীর অভিব্যক্তি দেখে রাজা বুঝতে পারেন, সত্যি আইজান এই নগরের সবার প্রিয় একটি বালক। সবাই তাকে চেনে। রাজার সফরসঙ্গীরা তাঁর সাথে পাহাড়ের চূড়ায় যেতে চাইলেও তিনি সবাইকে অপেক্ষা করতে বলে নিজে পাহাড়ের চূড়ার দিকে এগিয়ে যান। রাজা বীরেন সিং পাহাড়ে উঠতে উঠতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সূযের্র হলদে আলো ক্ষীণ হতে হতে পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। রাজা যখন হাফাতে হাফাতে ক্লান্ত শরীরে পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেন, চূড়াটা তখন সন্ধ্যার নীলাভ আবছা আলোয় মেখেছিল। কী যে মনোরম সে দৃশ্য! নানা রঙের ফুল আর পাতাবাহারে ভরে আছে চারপাশ। পাহাড়ী ভেড়া আর ছাগলের পাল নিশ্চিন্তে চারদিকে চরে বেড়াচ্ছে। গাছে গাছে বাড়ি ফেরা পাখিদের উদ্বেল কণ্ঠের মিষ্টি কোরাস। রাজা বীরেন সিং এক বুক মুগ্ধতা নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকল। এই মুগ্ধ পরিবেশ ও নির্মল হাওয়ায় সমস্ত ক্লান্তি যেন তাঁর নিমেষেই দূর হয়ে গেছে। মখমলের গালিচার মত সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাজা ভাবেন, রাজপ্রাসাদটাকে সে স্বর্গের মত সুন্দর করার জন্য কত কীনা করেছেন।
শ্বেপাথরের ইমারতকে স্বর্ণ, হীরা, চুনি,পান্না, মুক্তা দিয়ে সাজিয়েছেন। কত শিল্পী, শ্রমিক দিনের পর দিন কাজ করেছে। রাজকোষ ফাঁকা হয়েগেছে। প্রাসাদের কাজ সুসম্পন্ন করার জন্য প্রজাদের উপর অতিরিক্ত কর আরোপ করতে হয়েছে তাঁকে। তারপরও কি এমন সুন্দর হয়েছে তাঁর প্রাসাদ? হয়নি। আসলে বিধাতার মত সুন্দর সৃজন আর কারো দ্বারা কি সম্ভব! ঘাসের বুকে নানা রঙের ফুটে থাকা ফুলগুলোর উপর রাজা আদরের স্পর্শ বুলিয়ে দেয়। দূর থেকে মিষ্টি ঠা-া বাতাস এসে রাজার প্রাণ জুড়িয়ে দিল। চূড়া থেকে নিচের নগরটিকে মনে হচ্ছে শিল্পীর আঁকা স্বর্গের ছবি। হঠাৎ দূর থেকে বাঁশির সুমধুর সুর ভেসে এলো। রাজা ভাবল এ নিশ্চয় রাখাল বালক আইজানের বাঁশির সুর। এত সুমধুর সুরে বাঁশি বাজানো তারই দ্বারা সম্ভব। হ্যাঁ, ওই তো দূরে একটা বিশাল বটগাছ দেখা যাচ্ছে। বাঁশির সুরের টানে ভেড়ার পাল গাছটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রাজা এগিয়ে গিয়ে এক রাখাল বালককে গাছের নিচে বসে মনের আনন্দে বাঁশি বাজাতে দেখলেন। রাজা বালকটির কাছে গেলে বালকটি বাঁশি বাজানো বন্ধ করে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাল, ‘আপনি আমাকে কিছু বলবেন?’ ‘হুম।’ রাজা গম্ভীর মুখে বললেন, ‘তোমার নাম আইজান?’
‘জ্বি।’ ‘তুমি নিশ্চয় জানো, দেশে একটা রাক্ষসের উপদ্রব শুরু হয়েছে। সে রাতের আঁধারে বেরিয়ে আসে প্রজাদের জান-মাল ধ্বংস করে আবার কোথায় হারিয়ে যায়।’ ‘শুনেছি, কিন্তু আমি কী করতে পারি? আপনার বেশ-ভুষায় মনে হচ্ছে আপনি এদেশের রাজা?’ ‘ঠিক অনুমানটাই করেছ। আমিই এদেশের রাজা কিন্তু আমি ঐ রাক্ষসকে মারতে ব্যর্থ হয়েছি। এভাবে যদি দিনে দিনে আমার প্রজারা শেষ হয়ে যায়, আমি শাসন করব কাদের? আমার নামের প্রশস্তিধ্বনি তুলবে কারা। কারা আমাকে খাজনা দিবে?
রাজ্য শাসনের সুখ কি তখন আমার থাকবে?’ রাজা দীর্ঘশ^াস ছাড়েন। রাখাল বালক রাজার কথায় হাসে। ‘সে তো ঠিক কথা। কিন্তু আমি আপনার জন্য কী করতে পারি?’ রাজা বীরেন সিং বালকের হাসি দেখে বিরক্ত হন। কিন্তু সে বিরক্তি লুকিয়ে অনুনয়ের সাথে বলেন, ‘তুমিই সব পারো। আমি তোমাকে দেখেই বুঝেছি, তুমিই সেই আইজান। এক দরবেশবাবা স্বপ্নযোগে আমাকে বলেছে তুমি পারো ঐ রাক্ষসটাকে হত্যা করতে।’ ‘হুম। কিন্তু আমার দ্বারা সম্ভব, এতটা তিনিই বা নিশ্চিত হলেন কীভাবে? ‘তোমার দ্বারাই সম্ভব। ঐ রাক্ষসকে মারার জন্য যে শক্তি দরকার তা তোমার মধ্যে আছে। দরবেশ বাবার স্বপ্নের কথা হুবহু সব মিলে যাচ্ছে। তুমিই পারবে। বিনিময়ে তুমি যত সম্পদ চাও তাই পাবে।’‘আমার সম্পদের উপর কোনো লোভ নেই। কিন্তু আমার দ্বারা যদি দেশের মানুষের উপকার হয় আমি তা করব। তাতে আমার জীবন যাবে, যাক।’ ‘তাহলে চলো রাজপ্রাসাদে।’ ‘জ্বি। চলেন।’ রাখাল যুবক আরেক সুরে বাঁশি বাজাতে শুরু করল। পালে পালে গরু, মহিষ, ভেড়া, ছাগল ঝোপ-ঝাড় থেকে বেরিয়ে এসে সারি বেঁধে দাঁড়াতে লাগল। ওরা আইজানকে অনুসরণ করে পাহাড়ের উপতক্যা বেয়ে নিচে নামতে থাকে। রাজা অবাক হলেন আইজানের তেলেসমাতি কা- দেখে। আজ রাতে রাক্ষস বধ করবে রাখাল যুবক আইজান। রাজা তাকে বর্ম পরে নিতে বললেন। সে অস্বীকার করে বলল, ‘তার দরকার হবে না। আমি তো তাকে শারীরিক শক্তি দিয়ে বধ করব না। তো বর্ম কী হবে?’ ‘অন্তত তুমি একটা তরবারি নাও।’ রাজা অনুরোধ করেন। ‘নাহ, বলছি তো আমি ওকে শারীরিক শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করব না। আমি আমার সততা, আত্মবিশ্বাস, পবিত্রতার আলো দিয়ে ওকে খতম করব।’ রাজা তো জানেন। রাখাল যুবক আইজান কোনো সাধারণ মানুষ না। নিশ্চয় তার নিজস্ব কোনো অলৌকিক শক্তি আছে। সে তার মত করেই রাক্ষসটাকে শেষ করুক। রাক্ষসের বিনাশ হলেই তো হল।
সেদিন সারা রাত আইজান জেগে থেকে রাক্ষসের অপেক্ষা করতে লাগল। রাজা বীরেন সিং তরবারি হাতে তার পাশে পাশেই থাকলেন। সমস্ত রাজ্যে প্রহরীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, রাক্ষসের কোনো খবর পেলেই তারা ছুটে এসে রাজা ও আইজানকে জানাবে। কিন্তু কোথাও থেকে কোনো খবর এলো না। এভাবে সাত সাতটি দিন কেটে গেল। রাক্ষসের কোনো খবর নাই। রাজা-প্রজা, উজির-নাজির সবাই ভাবল, রাক্ষস হয়ত আইজানের খবর শুনে ভেগেছে। এদিকে আইজানের সাথে রাত জেগে জেগে রাজা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আইজান বলল,
‘রাজা সাহেব আপনি বিশ্রাম নেন। আপনাকে আর রাত জেগে আমার সাথে থাকতে হবে না। আমি জেগে থাকব। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।’ যদিও রাজা রাক্ষস বধের পুরো সম্মানটা আইজানকে দিতে চান না। কিন্তু শারীরিক অবস্থার কথা ভেবে আইজানের কথা মেনে নিলেন। অষ্টম রাতে আইজান একাই শহর পাহারা দিতে লাগল। ঠিক মাঝ রাতে তার চোখ দুটো ঘুমে ভারি হয়ে এসেছিল। হঠাৎ বুপ-বুপ একটা আওয়াজ শুনল। ডাহুক পাখি আতঙ্কিত হলে এমনি আওয়াজ করে। প্যাঁচাগুলো ফড়ফড় পাখা ঝেড়ে উড়ে পালাল। নিশ্চয়ই মন্দ কিছু একটা ঘটেছে। সামান্য দূরের বাঁশ ঝাড়টাকে অস্বাভাবিকভাবে নড়ে-চড়ে উঠতে দেখল আইজান। সে ওদিকে এগিয়ে গেল। বাঁশ ঝাড় থেকে একঝাঁক সাদা বক উড়ে গেল আকাশে। কিন্তু হঠাৎই একটা বিশাল হাত বাঁশ ঝাড়ের আড়াল থেকে একটা উড়ন্ত বক ধরে ফেলল। আইজান দৌঁড়ে গেল সেদিকে। ওহ! কী ভয়ানক দৃশ্য। বকগুলোকে গপাগপ মুখে পুরে চিবিয়ে খাচ্ছে এক বিশাল রাক্ষস। আইজানকে দেখে তেড়ে এলো রাক্ষসটি। আইজান পিছিয়ে গেল। রাক্ষসটি সাদা ফেনার মত থুথু ছিটালো আইজানকে লক্ষ করে। আইজান সরে গেল। যেসব স্থানে থুথু পড়ল সেখানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। এবার আইজান তার কোমরের ভাঁজ থেকে বাঁশিটা বের করল। বাঁশিতে এক অদ্ভুত ূসুর তুলল সে। সে সুরের মূর্ছনায় রাক্ষসের সমস্ত শরীর থরথর করে কেঁেপ উঠল। রাক্ষস এক বীভৎস চিৎকার দিল। সে চিৎকারে রাজার সকল প্রজার ঘুম ভেঙে গেল। মশাল হাতে ওরা সবাই বাইরে বেরিয়ে এলো। রাজকর্মচারিÑ অমাত্যবর্গ ছুটে এলো। তারা সকলে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল সেই রাক্ষসের ভয়ানক সব কীর্তি- কর্ম। রাক্ষসটি তার দু’কানে হাত দিয়ে ছটফট করছে আর চিৎকার করে চলেছে। কী
ভয়ানক সে চিৎকার! গাছ-পালা, দালান-কোঠা সব কেঁপে কেঁপে উঠছিল। আইজান তার বাঁশির সুর তীব্র করে তুলল। রাক্ষসের ছটফটানি আরো বেড়ে গেল। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর রাক্ষসটির চোখ-মুখ-কান দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে। ধীরে ধীরে তার শরীরটা ফুটো বেলুনের মত চুপসে যেতে থাকল। রাক্ষসের বীভৎস চেহারাটাও পাল্টে মানবীয় রূপ পেতে থাকে। প্রজারা অবাক
হয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল, এত আমাদের রাজা মশাই, বীরেন সিং। একি দেখছে তারা! রাজার নিঃসাড়-নিথর দেহটা প্রজাদের সামনে রক্ত-কাদায় মাখামাখি হয়ে পড়েছিল। সবার অবাক দৃষ্ট সেদিকে তাকিয়ে থাকল। প্রজাদের মনে অনেক প্রশ্ন এসে জমা হয়েছে। কে দেবে সেসব প্রশ্নের উত্তর? রাজার দরবারি, অমাত্যবর্গ ভয়ে পাথর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এবার প্রজারা না ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে! কারণ তারাই তো ছিল রাজার তোষামোদকারীÑ কাছের লোকÑ সকল কাজের সঙ্গী। কিন্তু তেমন কিছু ঘটার আগেই সেখানে সেই দরবেশের অবির্ভাব ঘটল। তিনি সবাইকে বুঝিয়ে বললেন, ‘তোমাদের রাজার উপর এক রাক্ষসের প্রেতাত্মা ভর করেছিল। এসব তারই কুকীর্তি। তোমাদের রাজাও সেটা জানতো না।’ সেই প্রেতাত্মার হাত থেকে তোমাদের বাঁচাতে হলে তোমাদের রাজার মৃত্যু ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। রাক্ষসের সেই প্রেতাত্মা একমাত্র মানুষের উপর ভর করলেই দৃশ্যমান হয়।’ প্রজারা সবাই বলল, ‘তাহলে এবার আমাদের নতুন রাজা কে হবে? রাজা ছাড়া তো রাজ্য অচল।’ প্রজাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বলে উঠল, ‘রাখাল যুবক আইজান হবে আমাদের নতুন রাজা। সেই আমাদের রাক্ষসের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। তাছাড়া তার মত সৎ, আদর্শবান, নির্লোভ রাজা সারা ব্রহ্মা- খুঁজলেও পাবো না।’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আইজানকে রাজা করাই হবে সঠিক সিদ্ধান্ত।’Ñ প্রজারা এক সাথে বলে উঠল। রাজন্যবর্গ প্রজাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন, সে তো রাজ- পরিবারÑ এমন কি রাজ বংশের কেউ না। সে সামান্য রাখাল । প্রজারা প্রতিবাদ করে বলে, ‘তাতে কী? সংখ্যার শুরুটা তো শূন্য থেকেই হয়। আর রাজ পরিবারের প্রজাশাসনের ইতিহাস তো আমাদের সামনেই আছেÑ তাঁরা কতটা নির্দয় আর প্রজাশোষক ছিলেন! আইজান আমদের মুক্তির পথ দেখিয়েছে। আজ আমরা কোনো বাধাই মানব না। আইজান হবে আমাদের রাজা।’ ক্রুদ্ধ প্রজাদের বিরুদ্ধে রাজন্যবর্গ আর দ্বিমত করার সাহস পেলেন না। দরবেশ চুপচাপ সবার কথা শুনছেন আর মনে মনে হাসছেন। রাখাল যুবক আইজান প্রজাদের বোঝান যে, পাহাড় আর বনের সৌন্দর্যের মধ্যে বসাবাসেই তার আনন্দ। এসব পাথরের দালানে তার জীবন দুর্বিসহ হয়ে পড়বে।
তাকে প্রসূন নগরে ফিরে যাবার অনুমতি দেয়া হোক। কিন্তু কে শোনে কার কথা? প্রজারা চিৎকার করে শ্লোগান দিতে থাকে, আইজান,
আইজান, আইজান। বৃদ্ধ মন্ত্রী হারুন এবার হাত তুলে সবাইকে চুপ করতে বলে, ‘থামুন, আপনারা থামুন। আমি আইজানের সাথে কথা বলছি।’ সে আইজানকে বলে, ‘দেখ, প্রজারা যখন তোমাকে মানে আপনাকে চাইছে। আপনার তাদের মতামতকে আপনার সম্মান করা উচিত।’ আইজান কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। সে ভীষণ দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায়। আইজান কিছুক্ষণ ভাবার পর বলে, ‘ঠিক আছে রাজ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে না আসা পর্যন্ত আমি রাজ্যশাসন করব। তারপর সে প্রসূন নগরন ফিরে যাবে।’ প্রজারা আনন্দে নেচে ওঠে। সবাই আইজান, আইজান বলে শ্লোগান দিতে থাকে। এক বিশেষ দিনে আইজানের রাজ্যাভিষেক ঘটে। প্রজাগণ পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে, বার
বার রাজা আইজানের নামের জয়ধ্বনি তুলে তাকে বরণ করে নিল। রাজন্যবর্গ, বণিক, প্রতিবেশি রাজ্যের রাজাগণ সোনা, রূপা, হীরা, জহরতসহ নানা মূল্যবান উপঢৌকন পাঠিয়ে নতুন রাজাকে সম্মান জানালেন। এরপর দিন যায় রাত যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়, বছর যায় রাজ্যের প্রজারা রাজা আইজানের শাসনে সুখেই দিন কাটতে থাকে। দেশ দিন দিন সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলে। রাজা আইজান তাঁর প্রিয় প্রসূন নগরের কথা এক সময় ভুলে যান। এখন সে আর বাঁশিও বাজান না। তিনি রাজ্য নিয়ে মহাব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। রাজা আইজানের এখন আর বালক নন। পূর্ণ যুবক। একদিন রাতে তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ সেই রাক্ষসের আত্মাটা জানালা দিয়ে বাতাসের সাথে রাজার শয়ন
কক্ষে প্রবেশ করে। তারপর সে রাজা আইজানের শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে। ঠিক যেভাবে ওটা রাজা বীরেন সিংয়ের ভেতরে প্রবেশ করেছিল।