এটিএম জালিয়াতি : চার মাসেও কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ

আপডেট: অক্টোবর ৬, ২০১৯, ১:০৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


ডাচ-বাংলা ব্যাংকের একাধিক বুথ থেকে জালিয়াতি করে অর্থ আত্মসাতের পর চার মাস পেরিয়ে গেলেও কোনও কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া এক ইউক্রেনিয়ানকেও পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করছেন তারা। কিন্তু এই ঘটনার সঙ্গে আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত থাকায় সবাইকে শনাক্ত করতে একটু সময় লাগছে। আর পালিয়ে যাওয়া ইউক্রেনের নাগরিক ভিতালিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
এই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমরা এটিএম জালিয়াতির এই চক্রের সবাইকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া ভিতালিকে ধরারও চেষ্টা চলছে। জালিয়াত চক্রের কাছ থেকে উদ্ধার করা এটিএম কার্ডের আদলে তৈরি কার্ডগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে জালিয়াতির কৌশলও জানার চেষ্টা চলছে।’
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ১ জুন সন্ধ্যায় রাজধানীর খিলগাঁও তালতলা এলাকার ডাচবাংলা ব্যাংকের একটি বুথ থেকে অভিনব পদ্ধতিতে জালিয়াতি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সময় স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ইউক্রেনের এক নাগরিককে আটক করে পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওইদিন রাতেই পান্থপথের হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেনে অভিযান চালিয়ে ইউক্রেনের আরও পাঁচ নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলো—ভ্যালেনটাইন (পাসপোর্ট নম্বর ইওয়াই ০৫১৫৬২), ওলেগ (পাসপোর্ট নম্বর ইএক্স ০৮৯৯৬৩), ডেনিস ( পাসপোর্ট নম্বর এফএল ০১৯৮৩৪), নাজেরি (পাসপোর্ট নম্বর এফটি ৫০০৫০১), সারগি (পাসপোর্ট নম্বর এফএইচ ৪২৪৩৯৪) ও ভোলোবিহাইন (পাসপোর্ট এফটি ৩৭৯৯৮৩)। অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে ভিতালি (পাসপোর্ট নম্বর এফই ৮০৪৪৪৮) নামে এক ইউক্রেনিয়ান পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ডাচ-বাংলা ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি জালিয়াতির মামলা ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর পক্ষ থেকে একটি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে একটি মামলা করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ওপর তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জালিয়াতির ঘটনার পর পুলিশ ওই সময়ে ইউক্রেন থেকে আসা বিদেশি নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করে। ওই সময় পুলিশ জানতে পারে—ইউক্রেন থেকে আরেকটি প্রতারক দল ঢাকায় এসে জালিয়াতি করে টাকা তুলে নিয়ে যায়। সন্দেহভাজন ওই তিন নাগরিক হলো শেরি, রোমান ও দিমিত্রি। তাদের আসা-যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া, এই চক্রটির সঙ্গে বাংলাদেশি এক তরুণের সঙ্গে বিমানবন্দরে কথা বলার কিছু ফুটেজ পাওয়া গেছে। কিন্তু ওই ফুটেজ দেখেও তাকে শনাক্ত করা যায়নি।
সূত্র জানায়, এটিএম জালিয়াতির ঘটনায় ইউক্রেনের এই চক্রটির সঙ্গে বাংলাদেশি একটি চক্র জড়িত রয়েছে বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। কিন্তু চক্রটি এত নিখুঁতভাবে জালিয়াতি করেছে যে, তাদের সবাইকে শনাক্ত করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন। কারণ একই চক্র ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একইভাবে জালিয়াতি করেছে।

এদিকে, সিআইডির একটি সূত্র জানায়, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)-এর সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এফবিআইয়ের একটি টিমের সঙ্গে তারা বৈঠকও করেছে সিআইডি। তবে, জালিয়াত চক্রের সব সদস্যকে এখনও শনাক্ত করা যায়নি।
সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক জালিয়াত চক্রটি অনেক চতুর। তারা এমনভাবে জালিয়াতি করেছে, তাদের চক্রটিকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এই জালিয়াত চক্রটিকে শনাক্ত করতে হলে ক্ষতিগ্রস্ত সব দেশ একজোট হয়ে কাজ করতে হবে। না হলে ভবিষ্যতেও এই চক্র আবার কোথাও না কোথাও এটিএম মেশিনে হানা দিতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এটিএম জালিয়াতির ক্ষেত্রে প্রতারক চক্রটি ‘টুপকিন’ নামে একটি ম্যালওয়ার ব্যবহার করেছিল বলে তারা জানতে পেরেছেন। তারা এও জেনেছেন, টাকা উত্তোলনের সময় পুরো প্রক্রিয়াটি ইউক্রেন থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। তবে, এই চক্রটিকে ধরতে ইউক্রেন থেকে তেমন সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। বরং হাতেনাতে গ্রেফতার হওয়া নাগরিকদের ‘নিরপরাধ’ দাবি করে তাদের ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে ইউক্রেনের দিল্লি দূতাবাস থেকে। বিষয়টি নিয়ে তারা কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন বলেও জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা।-বাংলা ট্রিবিউন