এডুকেশন ওয়াচ-২০১৭ শিক্ষকদের আদর্শ মনে করে না অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী

আপডেট: মে ১৪, ২০১৮, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


ছাত্র-ছাত্রীদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান বিতরণের পাশাপাশি নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়ার দায়িত্বও শিক্ষকের। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বিকাশ অনেকাংশেই নির্ভর করে শিক্ষকের ওপর। কিন্তু দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় এর প্রতিফলন নেই। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই এখন আর নৈতিকতার ক্ষেত্রে নিজের শিক্ষককে আদর্শ বা অনুকরণীয় মনে করে না।
নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা বিষয়ে জানতে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জরিপ চালায় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযান। এতে বিভিন্ন পর্যায়ের ১ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী, ৫৭৬ শিক্ষক, ১ হাজার ২৮০ অভিভাবক ও স্কুল কমিটির সদস্যের মতামত নেয়া হয়। ‘ছাত্ররা শিক্ষকদের নৈতিকতা ও সততার উদাহরণ হিসেবে দেখতে চায়, কিন্তু বর্তমান সমাজে আশা করা যায় না’ শীর্ষক জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে এ বিষয়ে মতামত দিতে বলা হয়। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, প্রাথমিকের ৫০ শতাংশ, মাধ্যমিকের ৬৪ ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিষয়টির সঙ্গে একমত পোষণ করে। অর্থাৎ অধিকাংশ শিক্ষার্থীই নৈতিকতার ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষককে অনুকরণীয় বা আদর্শ বলে মনে করে না। এমনকি ৬৫ শতাংশ অভিভাবক ও প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষকও বিষয়টির সঙ্গে সহমত পোষণ করেন।
শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক, শ্রেণীকক্ষে পাঠদান, শিক্ষক, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, সংস্কৃতি ও শিখন মূল্যায়নসহ বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রমে কীভাবে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও চরিত্র গঠন হচ্ছে, তা নিরূপণ করতে জরিপটি পরিচালিত হয়। জরিপে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে ‘বিদ্যালয়ের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ: শিক্ষায় প্রাণের উজ্জীবন’ শীর্ষক এডুকেশন ওয়াচ-২০১৭ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে গণসাক্ষরতা অভিযান। গতকাল রাজধানীর এলজিইডি মিলনায়তনে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
প্রকাশিত প্রতিবেদনের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষকের আদর্শ হয়ে ওঠার বিষয়টি আলোকপাত করেন এডুকেশন ওয়াচ সভাপতি ফজলে হাসান আবেদ। তিনি সেখানে বলেন, বর্তমানে দেশে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ১০ লাখ শিক্ষক। তাদের প্রত্যেকে নানাভাবে শ্রেণীকক্ষের ভেতরে ও বাইরে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনকে স্পর্শ করছেন। শিক্ষকদের পাঁচজনের একজনও যদি তাদের পেশাগত অঙ্গীকার, প্রেরণা ও চরিত্রবলে শিক্ষার্থীদের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে দেশব্যাপী একটি পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সামাজিক বিকাশের বিষয়গুলো গুরুত্ব দেয়া হয় না। এমনকি শিক্ষকদের তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ ও বিশ্বাস সম্পর্কে আত্মসমালোচনা করতে উৎসাহিত করা হয় না। তাই প্রত্যেক শিক্ষক যাতে শিক্ষার্থীদের কাছে আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব বিবেচিত হতে পারেন, সেজন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণে সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এছাড়া কীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলে, প্রশিক্ষিত হলে, তত্ত্বাবধান করা হলে শিক্ষকরা আদর্শ হিসেবে পরিগণিত হবেন, সে বিষয়েও নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই ধারণা করা হচ্ছে, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের দিক থেকে শিক্ষকদের অবস্থান নিম্নগামী। তবে এখন সেটি গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত। এখন খুঁজে দেখতে হবে, শিক্ষার্থীরা কেন নৈতিকতার ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষককে অনুকরণীয় হিসেবে গ্রহণ করে না। এ সমস্যার করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। আমি মনে করি, শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা শেখাতে হলে আগে সেটি নিজের জীবনে ধারণ করতে হবে। শিক্ষক যদি একজন আদর্শ মানুষ হন, শিক্ষার্থীরা তাকে এমনিতেই অনুসরণ করবে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে কিশোর ও তরুণ সমাজে হতাশা, মাদক, ধর্মীয় বিশ্বাস, চরমপন্থা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সততা, নৈতিক আচরণ বিষয়ে এ ধরনের বিভিন্ন মতামত নেয়া হয়।
‘সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থাÍ বাস্তবে এ নীতিবাক্য মেনে চলা সম্ভব নয়’Í এ বিষয়ে মতামত চাওয়া হলে ৬২ শতাংশ পিতা-মাতা, ৩৬ শতাংশ শিক্ষক, ৪৮ শতাংশ উচ্চস্তরের শিক্ষার্থী ও ৩৫ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী বিষয়টির সঙ্গে একমত পোষণ করেন।
‘পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসদুপায় অবলম্বন করার প্রয়োজন হয়’Í এ বিষয়টির সঙ্গে ৮ শতাংশ পিতা-মাতা, ৫ শতাংশ শিক্ষক, ১৬ শতাংশ উচ্চস্তরের শিক্ষার্থী, ১৯ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী ও ১৫ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষার্থী একমত পোষণ করেন। অর্থাৎ অধিকাংশ জবাবদাতাই বিষয়টির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।
‘মেয়েদের বেশ-পোশাক সংযত ও মার্জিত হওয়া দরকার, যা ছেলেদের জন্য একইভাবে প্রয়োজন নেই’Í এ বিষয়টির সঙ্গে ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ বাবা ও ৬১ শতাংশ মা একমত পোষণ করেন। ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষক ও ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষিকাও একই মত দেন। আর শিক্ষার্থীদের মধ্যে, উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ ছাত্র ও ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ ছাত্রী, মাধ্যমিক স্তরে ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ ছাত্র ও ৫৩ দশমিক ১ শতাংশ ছাত্রী এবং প্রাথমিক স্তরের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ ছাত্র ও ৪১ দশমিক ২ শতাংশ ছাত্রীও বিষয়টির সঙ্গে একমত পোষণ করে।
সার্বিক বিষয়ে গবেষক দলের নেতা ড. মনজুর আহমেদ বলেন, গবেষণায় নৈতিকতা বিষয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে স্ববিরোধী ও সাংঘর্ষিক মতামত দেয়া হয়েছে। যেমন ৮৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য অসদুপায় অবলম্বন গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু অর্ধেক উত্তরদাতা মনে করেন, ‘সততা সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা’ এ নীতি বাস্তবসম্মত নয়। এ ধরনের বিভিন্ন নৈতিক দ্বন্দ্বের বিষয় উঠে আসে গবেষণায়। জরিপ ও ফেকাস গ্রুপ ডিসকাসনে বারবার শিক্ষকদের ভূমিকার বিষয়টি এসেছে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন সুপারিশ আনা হয়েছে। আশা করছি, সে আলোকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ