এবার আমের উৎপাদন বাড়বে দেড় লাখ টন

আপডেট: এপ্রিল ২, ২০১৮, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


আম উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোয় এবার বাগানের পরিসর কিছুটা বেড়েছে। দুই মাস ধরে তাপমাত্রাও রয়েছে সহনীয়। আমের মুকুলের জন্য ক্ষতিকর কুয়াশার প্রকোপ এ বছর তেমন দেখা যায়নি। ব্যাপকমাত্রায় গুঁটি ঝরিয়ে দিতে পারে গোটা চৈত্রজুড়েই, এমন কোনো ঝড়-বাদলের পূর্বাভাস নেই। এ পরিস্থিতিকে আম উৎপাদনের জন্য আদর্শ বলছেন কৃষিবিদরা। অনুকূল এ আবহাওয়ার পাশাপাশি কৃষি কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ এবার বাড়তি আম উৎপাদনের আশা জাগাচ্ছে। গতবারের চেয়ে এবার দেড় লাখ টন বাড়তি আম উৎপাদন হবে বলে মনে করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)।
এ বছরের উৎপাদন নিয়ে আশাবাদী কৃষকরাও। আম উৎপাদনকারী ও রাজশাহী এগ্রো প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক মো. আনোয়ারুল হক বলেন, অন্য যেকোনো মৌসুমের তুলনায় চলতি মৌসুমে সবচেয়ে ভালো অনুকূল আবহাওয়া বিরাজমান রয়েছে। আগেরবার অন্য ফসলে সঠিক দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষকই এবার তাদের জমিতে আমের চারা লাগিয়েছেন। বড় কোনো ঝড় কিংবা বৃষ্টি না হলে আমার মতো এ অঞ্চলের সিংহভাগ কৃষকেরই আম উৎপাদন বাড়বে। অধিকাংশ কৃষকই এখন নিরাপদ আম উৎপাদনে জোর দিচ্ছেন। নিরাপদ আম উৎপাদনকারীদের উৎপাদিত আম নিরাপদে বিক্রির সুযোগ তৈরি করে দিলে এ অঞ্চলে আমের উৎপাদন আরো বাড়বে। বিশেষ করে ব্যাগিং পদ্ধতিতে উৎপাদনে কিছুটা খরচ বেশি হলেও আম বিক্রির সময় ভালো দাম পাওয়া যায়। তাছাড়া এ পদ্ধতিতে উৎপাদিত আম রফতানিও করা যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কয়েক বছর ধরেই দেশে আমের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে আমের উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১০ লাখ ১৮ হাজার টন। পরের অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ লাখ ৬১ হাজার ৬৮৫ টনে। এরপর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে মোট সাড়ে ১২ লাখ টন আম উৎপাদন হয় বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছর তা ১৪ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ডিএইর হর্টিকালচার উইংয়ের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, নিরাপদ আম উৎপাদনের বিষয়ে এরই মধ্যে কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকেও এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। কৃষকদের মধ্যে ব্যাগিং পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে অনুকূল আবহাওয়া ও মাটি কাজে লাগিয়ে ফলটি উৎপাদনে আগ্রহ বাড়ছে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের সার্বিক সহায়তা ও দিকনির্দেশনার কারণে আম উৎপাদনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। এছাড়া কয়েক বছরে আমের বিভিন্ন জাত অবমুক্তকরণ, সম্ভাবনাময় অঞ্চলগুলোয় আবাদ বৃদ্ধি ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্প্রসারণ ছাড়াও অঞ্চলভিত্তিক মাটির গুণাগুণ ও আবহাওয়া অনুযায়ী উপযুক্ত আমের নতুন জাত সম্প্রসারণ ও পাহাড়ি অঞ্চলে আবাদ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
দেশে শতাধিক প্রজাতির আম রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৪৫টির আবাদ হচ্ছে। এসব প্রজাতির মধ্যে ল্যাংড়া, ফজলি, ক্ষীরশাপাতি (গোপালভোগ), হিমসাগর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ, গোপালভোগ, বোম্বাই জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে। দেশে উদ্ভাবিত উন্নত জাতের আমগুলোর মধ্যে বারি-১, বারি-২, বারি-৩ ও বারি-৪ জাত উল্লেখযোগ্য। এ তালিকায় নতুন যোগ হয়েছে আম্রপালি ও মল্লিকা। দিনাজপুরের সূর্যপুরীও ইদানীং বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে।
তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে আম উৎপাদন হচ্ছে প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হচ্ছে বৃহত্তর রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। তবে মোটামুটি সব জেলাতেই ফলটির আবাদ সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন জাত উদ্ভাবনে গবেষণা হচ্ছে। এমনকি উপকূলীয় লবণাক্ত ভূমিতেও এখন মিষ্টি আমের চাষ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) বর্তমানে বারোমাসি আম উৎপাদন নিশ্চিতে গবেষণা চালাচ্ছে। এরই মধ্যে বারি আম-১১ নামের একটি জাত উদ্ভাবনের পর তা অবমুক্তের চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
কৃষকদের মধ্যে আম উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে তাদের সঠিক দাম প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে বলে জানান সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক। তিনি বলেন, দেশে আমের উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব। আবহাওয়া উপযোগী আমের নতুন জাত উদ্ভাবন এবং পাহাড়ি অঞ্চলে ফলটির আবাদ সম্প্রসারণ করতে হবে। নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে ফলন বাড়াতে হবে। রফতানি শিল্পকে বিকশিত করতে হবে। মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে পাল্প শিল্পকে আরো বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এছাড়া আমের উৎপাদন ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় আরো সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমে ফরমালিন মেশানো নিয়ে যেসব ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে।
উৎপাদনে আশাবাদ জাগালেও গত অর্থবছর পর্যন্ত সেভাবে গতি পায়নি বাংলাদেশের আম রফতানি। চলতি অর্থবছর থেকে এ চিত্রেও দেখা দিয়েছে পরিবর্তনের সম্ভাবনা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে ৩ লাখ ২৪ হাজার কেজি আম সরবরাহ করে বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরে তা ১৩ লাখ কেজি ছাড়ানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
ডিএইর উদ্ভিদ সংগনিরোধ বিভাগ বর্তমানে আমের রফতানি বাড়ানোয় কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে কৃষকদের মধ্যে ব্যাগিং পদ্ধতিতে রফতানি উপযোগী আম উৎপাদনের আগ্রহ বাড়াতে বেশ কার্যকর কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বিভাগটি। এছাড়া কৃষকের সঙ্গে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রেও বিভাগটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানান উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. আজহার আলী।
তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের দেশের আম মূলত ইউরোপের দেশগুলোয় রফতানি করা হচ্ছে। সেখানকার বাজার অতি সংবেদনশীল হওয়ায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী বালাইমুক্ত নিরাপদ আম উৎপাদন ও রফতানিতে মনিটরিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে আম চাষী ও রফতানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক আয়োজনসহ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব কৃষককেই নিরাপদ আম উৎপাদনে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দুটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও এখন কৃষকদের সার্বক্ষণিক সেবা দিচ্ছে। অনুকূল আবহাওয়া এবং আমাদের কার্যক্রমে কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে। ফলে চলতি অর্থবছরে রফতানি কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব হবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য বলছে, ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি বৈশ্বিক আম উৎপাদনে বাংলাদেশকে শীর্ষ দশে তুলে এনেছে। ২০১৫ সালেই বৈশ্বিক আম উৎপাদনে নবম স্থানে উঠে আসে বাংলাদেশ। সে সময় বৈশ্বিক উৎপাদনে শীর্ষস্থানে ছিল ভারত। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Don`t copy text!