এবার গাড়ি কেনার ঋণ নিয়ে ডিএসইতে অসন্তোষ

আপডেট: এপ্রিল ১, ২০১৯, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


বিতর্কিত পদোন্নতির পর এবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কর্মকর্তাদের মধ্যে গাড়ি কেনার ঋণ নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ডিএসইর এইচআর (হিউম্যান রিসোর্স) বিভাগ থেকে ‘রিভাইজড কার স্কিম’ সংক্রান্ত সার্কুলার প্রকাশের পর এই অসন্তোষ দেখা দেয়। রিভাইজড কার স্কিমটি ডিএসইর ৯২০তম বোর্ড সভায় পাস হয়।
ডিএসইর কর্মকর্তারা জানান, আগে ডিএসইর কার স্কিম শুধু উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) লেভেল পর্যন্ত ছিল। এবার তা সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) লেভেল পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে এ জন্য কিছু শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। ফলে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পর্ষদ ও প্রভাবশালী সদস্যদের আস্তাভাজনরাই এই সুবিধা পাবেন। পক্ষান্তরে ভালো কাজ করার পরও অনেকে বঞ্চিত হবেন। এমন আশঙ্কা করছেন ডিএসইর অনেক কর্মকর্তা। বিশেষ করে এজিএম পদের কর্মকর্তারা।
ডিএসইর একাধিক এজিএম জানান, সম্প্রতি প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতি দেয়া হলেও কোনো এজিএমকে পদোন্নতি দেয়া হয়নি। পদোন্নতি দেয়ার আগে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কে এ এম মাজেদুর রহমান এজিএমদের ডেকে দীর্ঘ সময় বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি এজিএমদের পদোন্নতি না দিতে পারার অপারগতা প্রকাশ করেন এবং সকলকে গাড়ি দেয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন।
এমডির এমন আশ্বাসে সকল এজিএম খুশি হন। কিন্তু তাদের সেই খুশি বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। কারণ ২৪ মার্চ এইচআর ডিজিএম এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার দেন। তাতে গাড়ির ঋণ পাওয়ার যোগ্যতার জন্য ‘পারফরমেন্স’ শর্ত হিসেবে রাখা হয়েছে, যা নির্ভর করবে ডিএসইর সন্তুষ্টির ওপর। পাশাপাশি আগে গাড়ির ঋণ নেয়া পুরাতন ডিজিএমদের আবারও গাড়ির ঋণ পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে বেশিরভাগ এজিএম গাড়ি কেনার ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন। কারণ এজিএমদের গাড়ির ঋণ দেয়া হবে বাজেট থাকা সাপেক্ষে।
এ বিষয়ে একজন এজিএম নাম প্রকশ না করার শর্তে বলেন, নতুন কার স্কিমে যে শর্ত রাখা হয়েছে তাতে আগের স্কিম অনুযায়ী পাঁচ বছরে ঋণ পরিশোধ হওয়ার পর সকল ডিজিএম পুনরায় দ্বিতীয় গাড়ির জন্য আবেদন করতে পারবেন। আগেরবার গাড়ি পাওয়া সকল ডিজিএমের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। অর্থাৎ এখন যে পলিসি (নীতিমালা) পাস হলো তাতে পুরাতন ডিজিএমরা আবারও গাড়ি পাচ্ছেন। ফলে দেখা যাবে ডিজিএমদের ঋণ দিতেই বাজেট শেষ হয়ে যাবে।
তিনি বলেন, পদোন্নতি দেয়ার আগে এমডি বলেছিলেন- সকল এজিএম গাড়ির ঋণ পাবেন। কিন্তু সার্কুলারে পারফমেন্স শর্ত হিসেবে রাখা হয়েছে। ফলে কেপিআইতে (কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর) যারা ‘আউটস্ট্যান্ডিং’ মার্কিং পেয়েছেন শুধু তারাই ঋণ পাওয়ার যোগ্য হবেন। আর যারা ‘ফেয়ার’ পেয়েছেন তারা ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন। এমডি, সিএফও, সিটিও এবং সিআরও’র আস্থাভাজন এমন হাতেগোনা কয়েকজনকে আউটস্ট্যান্ডিং দেয়া হয়েছে। আর পুরাতন প্রায় সকল এজিএমকে কেপিআই মার্কিং দেয়া হয়েছে ফেয়ার। ফলে তারা বঞ্চিত হবেন গাড়ির ঋণ পাওয়ার সুবিধা থেকে।
আরেক এজিএম বলেন, এখন জিএম, ডিজিএম পদে যারা আছেন তারা সবসময়ই এমনভাবে পলিসি (নীতিমালা) পাস করেন যাতে করে সকল সুবিধা তারাই পান। প্রমোশন, গাড়ি-বাড়ি সকল ক্ষেত্রেই তারা দীর্ঘদিন যাবৎ এমন অরাজকতা করে আসছেন। এর আগে বাড়ি করার ঋণের ক্ষেত্রেও তারা এমনটি করেছেন, অথচ বাড়ির ঋণের পলিসিতে যোগ্যতায় বলা ছিল যাদের চাকরির মেয়াদ ১০ বছর হয়েছে তারা সকলেই এই সুবিধা পাবেন।
‘কিন্তু জিএম, ডিজিএমরা বাড়ির ঋণ নেয়ার পরপরই বাজেট নেই বলে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর আর কোনো বাজেটেই বাড়ির ঋণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়নি। এবার গাড়ির ক্ষেত্রেও ঠিক একই কাজ করা হলো। আমরা যারা ১৫ থেকে ২০ বছরের অধিক সময় ধরে ডিএসইতে চাকরি করছি আমরা তো কিছুই পেলাম না, আমাদের যোগ্যতা অবদানের মূল্যায়ন করা হলো কীভাবে’- যোগ করেন ওই এজিএম।
ডিএসইর আরেক কর্মকর্তা বলেন, ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পর্ষদ যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বঞ্চিত করে তেলবাজদের বেছে নিচ্ছে। শিক্ষাগত এবং কর্মদক্ষতার দিক থেকে বেশিরভাগ জিএম, ডিজিএমের যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। এদের অনেকেই ইংরেজিতে কথা বলা কিংবা ইংরেজিতে অফিসিয়াল কোনো ড্রাফট বা রিপোর্ট তৈরি, কম্পিউটার চালানোর মতো কাজ করতে পারেন না। অনেক ডিজিএম অফিসে শুধু কিছু সই করা ছাড়া আর কোনো কাজই করেন না, অথচ তারাই সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করছেন, বেতন নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।
তিনি বলেন, ডিএসইর ম্যানেজমেন্ট যোগ্যদের মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। চাটুকারিতায় পারদর্শী হওয়ার কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধুমাত্র বিবিএ পাস করা ব্যক্তি প্রমোশন পেয়ে হয়ে যাচ্ছে সিনিয়র ম্যানেজার। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করে চাকরিতে জয়েন করেও, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছেন এক্সিকিউটিভ পদে। অনেকেই প্রফেশনাল ডিগ্রির পড়াশোনা করছেন, কমপ্লিট করেছেন অনেক লেভেল, তারপরও তাদেরকেই বঞ্চিত করা হচ্ছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, এখানে যোগ্যতা এবং কাজের মূল্যায়ন হয় না। তেলবাজি, গুটিবাজি এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করতে পারলেই উন্নতি করা যায়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এইসব বিষয়ে অবগত থাকলেও তারা কেনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। বিএসইসির অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ব্রোকার হাউজের সদস্যদের আশীর্বাদেই টিকে আছে এমন অযোগ্য ম্যানেজমেন্ট।
সার্বিক বিষয়ে ডিএসইর এমডি কে এ এম মাজেদুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে ডিএসইর একজন ডিজিএম বলেন, আমি গাড়ির ঋণ নিয়েছিলাম পাঁচ বছর হয়ে গেছে। আগামী জুনে ডিএসইর বাজেট পাস হওয়ার পর আবারও গাড়ির ঋণ পাব। আমি যতটুকু জানি মহাব্যবস্থাপক, উপ-মহাব্যবস্থাপকদের ঋণ দেয়ার পর বাজেট থাকা সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে এজিএমদের লোন দেয়া হবে।
গাড়ির ঋণে কী সুবিধা
জিএম পদমর্যাদার কর্মকর্তারা গাড়ির ঋণ হিসেবে পাবেন ৩০ লাখ টাকা। পাঁচ বছর মেয়িদি এ ঋণের জন্য প্রতিমাসে পরিশোধ করতে হবে ৫০ হাজার টাকা। এর বিপরীতে গাড়ির ঋণ নেয়া জিএমকে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাবদ ২৫ হাজার টাকা এবং ১৮ হাজার ৭৫০ টাকা ট্যাক্স সুবিধা দেয়া হবে। অর্থাৎ গাড়ির ঋণ পাওয়া জিএম মাসে অতিরিক্ত ৪৩ হাজার ৭৫০ টাকা পাবেন।
একইভাবে ডিজিএম পদমর্যাদার কর্মকর্তারা গাড়ির ঋণ হিসেবে পাবেন ২৫ লাখ টাকা। পাশাপাশি মাসে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং ট্যাক্স সুবিধা পাবেন ৩৮ হাজার টাকা। বিপরীতে পাঁচ বছরে ঋণ পরিশোধের জন্য মাসে পরিশোধ করতে হবে ৪১ হাজার ৭০০ টাকা।
আর এজিএম পদমর্যাদার কর্মকর্তারা গাড়ির ঋণ হিসেবে পাবেন ২০ লাখ টাকা। পাশাপাশি মাসে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং ট্যাক্স সুবিধা পাবেন ৩১ হাজার টাকা। বিপরীতে পাঁচ বছরে ঋণ পরিশোধের জন্য মাসে পরিশোধ করতে হবে ৩৩ হাজার ৪০০ টাকা।