কথোপকথনে শিক্ষার্থীর পড়ার ঘর

আপডেট: January 23, 2020, 12:19 am

মোহাম্মদ হারুন মিয়া


স্কুলগামী প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীর পড়ার একটি ঘর থাকে। পড়ার ঘরে নিয়মিত পড়াশুনা হবে এটাই স্বাভাবিক। পড়ার ঘরটি হতে হবে মোটামুটি মাঝারি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও দেখতে সুন্দর। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পড়ার ঘর না হলে পড়াশুনা করতে ভালো লাগবে না। পড়ার ঘরটি বাস ভবনের কোনো এক কোণায় হলেই ভালো। বিশেষ করে দক্ষিণ কোণায়। দক্ষিণ কোণায় হলে ঘরে সহজে বাতাস প্রবেশ করে। যাকে বলে দক্ষিণা বাতাস। দক্ষিণা বাতাসে ঘরটি সবসময় ভরপুর থাকে, বাতাস মনকে আলোড়িত করে, দোলা দেয়।
পড়ার ঘরটি সাধারণত ১২ ফুট লম্বা এবং ১০ ফুট চওড়া হলেই ভালো হয়। একটু বড় সাইজের ঘর হলে এতে সহজে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে। পড়ার ঘরে দু’টি বড় জানালা, একটি দরজা ও একটি ভেন্টিলেটর থাকা চাই। এগুলো ঘরে সহজেই আলো-বাতাস প্রবেশ করতে সহায়তা করে। দক্ষিণা বাতাস পড়ার ঘরে প্রবেশ করলে শরীর শিহরিত হয়, গরম কম লাগে এবং পড়াশুনা করতে ভালো লাগে। দক্ষিণা বাতাস ঘরে প্রবেশ করলে ঘরে ফ্যান চালানোর কোনো প্রয়োজন হয় না। ঘরটি এমনিতেই শীতল থাকে।
পড়ার ঘরে চেয়ার, টেবিল ও বুক শেলফ থাকা আবশ্যক। পড়ার টেবিলে ক্লাসের বই, খাতা, পড়ার উপকরণ বিষয়ভিত্তিক সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা যায়। খাতা আবার কয়েক রকমের যেমন: Class work (CW) Homework (HW) I  Rough (রাফ) লেখার জন্য রাখতে হয়। চেয়ার বসে পড়াশুনা করাই ভালো। খাটে শুয়ে, বসে পড়াশুনা না করাই উত্তম। শুয়ে, বসে পড়াশুনা করলে আলস্যের সৃষ্টি হয় এবং পড়াশুনাতে মনোযোগ কম আসে। মনোযোগের চেয়ে আরামই বেশি হয় বিধায় পড়াশুনা ঠিকমত হয় না। পড়ার ঘরে পড়ার টেবিল ছাড়াও আরেকটি বুক শেলফ থাকা ভালো। এই বুক শেলফে পড়ার বই, আউট বই যেমন – উপন্যাস, কবিতা, নাটক, ভাষা-শিক্ষা-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের বই ও দৈনিক পত্রিকা রাখতে হয়। অবসরে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আউট বই পড়লে জ্ঞান বাড়ে। বিচিত্র পৃথিবীতে বিচিত্র মানুষ, বিচিত্র পড়াশুনা, বিচিত্র অভিজ্ঞার মানুষ বাস করে। জানার কোনো শেষ নেই। প্রবাদ আছে – “The more you read, the more you learn ” অর্থাৎ যতই তুমি পড়বে, ততই তুমি জানবে, বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন – “ Know thyself’ অর্থাৎ নিজকে জান এবং হাদিসে উল্লেখ আছে “দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত বিদ্যা অর্জন কর”। কাজেই বেশি করে পড়াশুনা করতে হবে। তবেই জীবনে সফলতার স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করতে সক্ষম হবে।
পড়ার ঘরের টেবিলটি কয়েকটি তাক বিশিষ্ট হতে পারে। যাতে করে প্রতিটি তাকেই বইগুলো সাজিয়ে রাখা যায় এবং প্রয়োজনের সময় যাতে সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। সহজে পাওয়ার জন্য শ্রেণিবিন্যাসভিত্তিক সাজিয়ে রাখা যায়। বইগুলো তাকে সাজিয়ে রাখলে পড়াশুনার সময় নষ্ট হয় না এবং পড়াশুনা করতে বেশ ভালো লাগে। এতে মন ও মানসিকতা প্রফুল্ল থাকে। শেলফে বই সাজিয়ে রাখার ফলে যখন যে বইটি পড়ার দরকার, তখন সেই বইটি তাক থেকে সহজে বের করে পড়াশুনা করা যায়। এতে সময়ের কোনো অপচয় হয় না।
পড়ার ঘরের টেবিলে রুটিন, দিন পঞ্জিকা, ছোট মানচিত্র, ডায়েরি, পেপার ওয়েট, পেনস্ট্যান্ড, ল্যাম্প রাখতে হয়। ক্লাসের প্রতিদিনের পড়া নিয়মিত পড়তে টেবিল রুটিন টানিয়ে রাখা যায়। প্রতিটি বিষয়ের পড়া শেষ হলে খাতায় লেখা ভালো। এতে করে লেখা সুন্দর ও দ্রুত হয় এবং পরীক্ষায় বানানের কোনো ভুল হয় না। কঠিন বানানগুলো বার বার লেখার ফলে শুদ্ধরূপে খাতায় লেখা যায় এবং পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া যায়। তাছাড়া সুন্দর হাতের লেখার কদরতো আলাদা আছেই। সুন্দর হাতের লেখাকে শৈল্পিক কাজ বলেও অভিহিত করা হয়।
পড়ার ঘরটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা উত্তম। পড়ার ঘরে পড়াশুনা করাই ভালো ছাত্র-ছাত্রীর কাজ। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে একজন শিক্ষার্থীর রুটিন মাফিক প্রতিদিন কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা পড়াশুনা করা উচিৎ। কঠিন বিষয়গুলো যেমন – গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান অন্তত ০১ ঘণ্টা করে পড়াশুনা করা উত্তম। ক্লাসের পড়ার বই ছাড়াও প্রতিদিন দৈনিক পত্রিকা (বাংলা ও ইংরেজি), ম্যাগাজিন এবং আউট বই পড়ার অভ্যাস গঠন করার সময় এখনই। আউট বই পড়ায় জ্ঞান বাড়ে। একবার পড়ার অভ্যাস গঠন করতে পারলে জীবনে আর পিছনের দিকে তাকাতে হয় না। পড়ার অভ্যাস ভালো অভ্যাস। এতে কোনো ক্ষতি নেই, বরং আছে বিস্তর উপকার। বইয়ের মতো প্রকৃত বন্ধু দ্বিতীয় আর নেই। বই শুধু দিতেই জানে, নিতে জানে না, বিনিময়ে সে কিছুই চায় না। তাই বেশি করে বই পড়া উচিৎ। প্রবাদ আছে – “বই পড়ে কেউ দেওলিয়া হয় না”, “বেশি করে বই পড়ুন, বই মানুষকে মহৎ করে” ইত্যাদি।
বিষয়ভিত্তিক পড়াশুনা করতে গিয়ে কোনো নতুন শব্দের সন্ধান পেলে তা সাথে সাথে খাতায় নোট রাখা যেতে পারে। খাতায় নোটকৃত নতুন শব্দগুলো পরবর্তীতে অভিধান থেকে বের করে শব্দের অর্থ, বানান ও উচ্চারণ শেখা যেতে পারে। নতুন নতুন শব্দ জানা থাকলে Vocavolary বাড়ে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন ও অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে টিভি দেখাসহ পঠিত বিষয়গুলোর রিভিশন দেয়া ভালো ছাত্রের কাজ। পড়াশুনার পাশাপাশি অবসরে হারমোনিয়ামে গান করা যায়। এতে বাড়তি ইমেজ আসে। গান জানা থাকলে স্কুলের যে কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সাংস্কৃতিক জগতে বিচরণ করার সমূহ সম্ভাবনাও থাকে। এছাড়া পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে কবিতা, ছবি আঁকা, প্রবন্ধ ও ছোটগল্প লেখার অভ্যাস গঠন করতে পারলে ভালোই হয়। এ বয়সে লেখালেখির অভ্যাস ভালো ফল বয়ে আনে। লেখালেখির অভ্যাস গঠনের মাধ্যমে পরবর্তীতে লেখক হওয়ার সম্ভাবনাতো থাকেই। প্রতিটি মানুষেরই লেখালেখির অভ্যাস ছাত্র অবস্থা থেকেই করা উচিৎ। পড়াশুনা সংক্রান্ত যা কিছুই করা হোক না কেন, তা যেন পড়ার ঘরে বসেই করা হয়। পড়াশুনার জন্য পড়ার ঘরের কোনো বিকল্প নেই। তাই প্রতিটি শিক্ষার্থীরই পড়ার ঘরের যত্ন নেয়া উচিৎ।
লেখক : সহকারী পরিচালক, রিসার্চ সাপোর্ট অ্যান্ড পাবলিকেশন ডিভিশন, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন

[email protected]