করোনায় করণীয়

আপডেট: March 26, 2020, 12:24 am

শুভ্রা রাণী চন্দ


করোনা আতঙ্কে শঙ্কিত আজ পুরো বিশ্ব। প্রকৃতির কী বিচিত্র খেলা! পুরো বিশ্বকে আজ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে এক কাতারে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ব্রাহ্মণ, শুদ্র, রাজা, প্রজা কেউ-ই মুক্ত নয় করোনার আশঙ্কা থেকে। পৃথিবীর ধনী ও অভিজাত দেশগুলোও এসে দাঁড়িয়েছে তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ দেশের কাতারে। প্রকৃতির বিচারে সবাই সমান।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্য স্রষ্টার বিস্ময়কর দান। মানুষ তার রূপ আস্বাদন করেছে যতটা, তার চেয়ে ধ্বংস করেছে ঢের বেশি। প্রকৃতি অপকৃপন হাতে মানুষকে দিয়ে গেছে সৌন্দর্য্যরে পসরা আর সম্পদের পাহাড়। কিন্তু মানুষ ব্যক্তিগত লোভ-লালসাকে চরিতার্থ করতে নির্বিচারে ধ্বংস করেছে প্রকৃতিকে।
সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে প্রসারিত করতে কখনও কখনও হয়তো মানুষকে প্রকৃতির প্রতি অবিচার করতে হয়েছে। কিন্তু সেটি যদি প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট না করতো তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হতো। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, ভূমিদস্যু, দখলবাজ, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতা সবাই ভূমি আত্মসাতে ব্যস্ত। ফলে তারা নির্বিচারে কেটেছে পাহাড়, উজাড় করেছে বন, ভরাট করেছে খরস্রোতা নদী-খাল, দখল করেছে অন্যের জমি। যেখানে সেখানে গড়ে তুলেছে ইমারাত, ইটভাটা, শিল্প কলকারখানা, মার্কেট ইত্যাদি। ফসলি জমি নষ্ট করে সেখানে গড়ে উঠছে সুরম্য প্রাসাদ কিংবা কলকারখানা। যে কৃষি ছিল আমাদের (বাংলাদেশের) অর্থনীতির অন্যতম হাতিয়ার তা এখন ধিরে ধিরে কমে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত নানাভাবে আমরা প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছি। প্রকৃতি যেমন অকৃপন হাতে আমাদের দান করে তেমনি আমাদের অনাচারের জবাবও দেয় নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভেতর দিয়ে। ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- ঝড়, বন্যা, কিংবা জলোচ্ছ্বাসে ধ্বংস হয়েছে পৃথিবী ও তার বাসিন্দারা। তেমনি নানা রোগও মহামারি আকার ধারণ করে পৃথিবীর কোনো কোনো অঞ্চলকে ভয়ঙ্কর ক্ষতির সম্মুখিন করেছে। খুব বেশিদিনের কথা নয়, মানুষ ডেঙ্গু আতঙ্কে ছিল। অনেক প্রাণহানি হয়েছে- বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতও আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু তার ব্যাপকতা কম ছিল। বাংলাদেশ ভারত থেকে নানা সহযোগিতা গ্রহণ করেছিল ডেঙ্গু মোকাবিলায়। ১৯১৮ সালে স্প্যানিস ফ্লুতে পুরো বিশ্বে প্রায় ৩ কোটিরও বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলো। এছাড়া প্লেগ, ইবোলায় বহু মানুষ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলো।
সম্প্রতি চিনের উহান রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে করোনা ভাইরাস। আস্তে আস্তে তা সংক্রমিত হয়েছে ১৮৮টি দেশ ও অঞ্চলে। আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৩,১৮,৫০০ এবং মৃতের সংখ্যা ১৩,৬৭১ জন (সমকাল-২৩.৩ প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছে নতুন নতুন দেশ ও অঞ্চলের অগণিত মানুষ)। আগের সময়ের চেয়ে এখনকার মূল পার্থক্য হলো- যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হয়েছে অতীতের তুলনায়। ফলে আক্রান্ত মানুষদের পক্ষে সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া অনেকটা সহজ হচ্ছে। যাঁরা সাহায্য করছেন তাঁদের পক্ষেও আক্রান্ত এলাকায় পৌঁছানো সহজ হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে- এ ভয়াবহ অবস্থা কতদিন চলবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। মানুষ আতঙ্ক ও চরম অনিশ্চয়তার ভেতরে দিন যাপন করছে। অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশে নেই এ রোগ সনাক্তকরণের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। সম্প্রতি গণস্বাস্থ্য এ ভাইরাস সনাক্তকরণের কিট আবিষ্কার করেছে- যার কাঁচামাল আসছে ইংল্যান্ড থেকে। যদি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত থাকে তাহলে তারা আগামী এক মাসের ভেতরে ১ লক্ষ কিট সরবরাহ করতে পারবে বলে আশা করা যায়- যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তবুও গণস্বাস্থ্যকে ধন্যবাদ তাদের যুগোপযোগী আবিষ্কারের জন্য।
বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে যদি অবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হয়। তবে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী যথারীতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হবে একথাও সত্যি। বাংলাদেশ সরকার এ পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করছে। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরাও ওঁৎ পেতে থাকে। সুযোগ পেলে তার সদ্ব্যবহার করতে ছাড়ে না। এক শ্রেণির মানুষ প্রচুর পণ্য কিনে মজুত করছে। অন্যদিকে দিন মজুরদের ঘরে খাবার প্রায় নেই। কারণ তাদের কাজের সুযোগ কমে গেছে। এ পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশই নয়। পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশেও একই অবস্থা বিরাজমান। সরকারের উচিৎ এ সব অসহায় মানুষদের সাহায্য করা। বিত্তমানদের সহায়তা এক্ষেত্রে জরুরি।
বিশ্বের বহু দেশ করোনায় আক্রান্ত হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইতালি, চিন, ফ্রান্স এসব দেশ। তবে এ ভাইরাস প্রতিরোধে মডেল হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে সিঙ্গাপুর, হংকং ও তাইওয়ান।
বাংলাদেশ জনবহুল দেশ। দেশটির আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় জনসংখ্যাধিক্য বেশি নজরে পড়ে। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাস্তাঘাটে লোক চলাচল কম, যানবাহনও কম। চারিদিকে এক অদ্ভুত নিরবতা। তেমনি করে শোনা যায় না পাখিদের কলতান। গাছ-পালাগুলোও যেন দাঁড়িয়ে আছে নিথর হয়ে। সব কিছুই যেন হঠাৎ করে স্থবির হয়ে গেছে। এত বেশি মন খারাপ করা কাজ করছে যা অবর্ণনীয়।
মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই স্বার্থপর। ইদানিং এ মাত্রাটা এতো বেড়ে গিয়েছিল যে, নিজের প্রয়োজনে যে কোনো খারাপ কাজ করতে মানুষ পিছপা হচ্ছিল না। (অবশ্যই ব্যতিক্রম আছে তারা সংখ্যায় খুবই কম)। নিজের স্বার্থে আঘাত লাগলে যে কোনো ধরনের হিংসাত্মক বা ধ্বংসাত্মক কাজ সে অবলীলায় করতে পারে। জ্ঞানের চর্চা নেই বললেই চলে। আছে কুসংস্কার, পরনিন্দা বা পরচর্চা করার প্রতিযোগিতা। প্রকৃত ধর্মচর্চা, উদারতা, নৈতিকতা, মানবিকতা, সহনশীলতা, পরোপকার করার প্রবণতা আজ বিলীন প্রায়। শিক্ষার হার বাড়ছে কাগজে কলমে। কিন্তু বাস্তবে প্রকৃত শিক্ষা নেই। নম্রতা, ভদ্রতা কিংবা বিনয় আছে হাতে গোনা কিছু মানুষের ভেতরে। মানুষকে সম্মান করা আদব-কায়দা চর্চা, নির্লোভ হওয়া এসব এখন বইয়ের পাতায় শোভা পায়। এ সময়ে যে যত চাটুকার, পরচর্চাকারী, তৈল মর্দনকারী সমাজে তার কদর বেশি। পদ-পদবির মালিক তারা। আদর্শে বালাই নেই এদের। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে সব ভালোকিছু।
করোনার করুণায় মানুষের ভেতরে যে আতংক বিরাজ করছে, সে আতঙ্ক যদি মানুষের মানবিকতার উন্নয়নে কাজে লাগে, বিবেকের দংশনকে ভালো কাজে উজ্জীবিত করে, তাদের ভেতরে সৌভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে তোলে, পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষকে দূরীভূত করে, নৈতিকতার চর্চায় নিয়োজিত করে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে, পরস্পর পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। সকলের কল্যাণ নিশ্চিত হবে।
করোনায় আতঙ্ক নয়, আমরা সচেতন হই, অন্যকে সচেতন করি। যততত্র ঘুরে না বেড়িয়ে করোনা প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিজেরা মেনে চলি এবং অন্যদেরকেও মেনে চলতে অনুপ্রাণিত করি। পরিবারের সদস্যদের সাথে বাড়িতে সময় কাটাই। আমরা অনেকে পেশাগত ব্যস্ততার কারণে পরিবারে সময় দিতে পারি না। যাদের অফিস বন্ধ তারা বাড়িতে থেকে পরিবারে সময় দিতে পারি। ঘরে বসে বিশ্বের পরিস্থিতি জানতে পারি মিডিয়ার বদৌলতে। বিনোদনের জন্য গান শুনতে পারি, সিনেমা দেখতে পারি, পোষা পশু-পাখিদের সাথে সময় কাটাতে পারি, বাগানে গাছ-পালার পরিচর্যা করতে পারি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের খোঁজ নিতে পারি। সরকারের সাথে সাথে আমাদের যার যেমন সামর্থানুযায়ী যেন দুর্গত মানুষদের সাহায্য করি।
মানুষ বেঁচে থাকে তার ভালো কাজের ভেতর দিয়ে। করোনা যে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে আমরা জানি না কে কখন আক্রান্ত হবো। ভয়াবহ এ বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমরা মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই, সব ভেদাভেদ ভুলে মানবিক হই, সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পূজারি হই। মানুষের মতো বাঁচতে শিখি। প্রাকৃতিক এ দুর্যোগের সময় শুধু নিজ স্বার্থ না দেখে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার সামিল হই।
‘স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ বৃহৎ জগৎ হতে
সে কখনো শেখিনি বাঁচিতে-’
Ñরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর