করোনা ভাইরাসে মৃতদের বিশ্বাসনুযায়ীই শেষকৃত্য অনুষ্ঠান হোক!

আপডেট: April 27, 2020, 12:11 am

মিথুশিলাক মুরমু


মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ শত্রুর মোকাবেলার্থে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। দেশের হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-ইসলাম-আদিবাসীদের নিজস্ব ধর্মের বীরযোদ্ধারাও মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের পক্ষে শহিদ হয়েছেন। যুদ্ধকালীন কোনো বীরমুক্তিযোদ্ধা শহিদ হলে কীভাবে কবরস্থ করা হতো! এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আলাপনে যেটা জেনেছি, দেশের এই সূর্য সন্তানদের কবরস্থ করার পূর্বে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ যা পরবর্তীতে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এই গানটি গেয়েই শহিদদের কবরস্থ করা হতো। কারণ সোনার বাংলার জন্যেই, মাতৃভূমির জন্যেই, দেশের আপামর জনসাধারণকে মুক্তির লক্ষ্যেই জীবন উৎসর্গ করেছেন। বর্তমান সরকার শহীদ ও জীবিত বীরমুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানার্থে অনেক হিতকর কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন, এমনকি কৃতজ্ঞতায় পরবর্তী প্রজন্মকেও সুযোগ দিতে কার্পণ্যবোধ করেনি। সরকারের মাইলফলক উদ্যোগকে স্যালুট জানিয়েছি।
নভেল করোনার মহামারিতে বিশ^ব্যাপী জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে মানুষ মৃত্যুকোলে ঢোলে পড়ছে। অবশ্য এইসব মানুষের কতকগুলো পরিচয় রয়েছে, যেমনÑ দেশ, জাতি, ধর্ম ইত্যাদি। সবচেয়ে স্পর্শকাতর পরিচয় হলো ধর্মীয় পরিচয়। ইতোমধ্যেই পাশর্^বর্তী দেশ শ্রীলঙ্কা ইসলাম ধর্ম বিশ^াসীর মৃতদেহ পুড়িয়ে সৎকার করে নিন্দার ও ইমেজ সংকটে পড়েছে। দৈনিক কালের কণ্ঠ (৩.৪.২০২০) শিরোনাম করেছেÑ‘করোনায় মৃত দুই মুসলিমের মরদেহ পুড়িয়ে সৎকার শ্রীলঙ্কায়, নিন্দার ঝড়’। করোনায় ইসলাম ধর্মাবলম্বী কলম্বোর বাসিন্দা ৭৩ বছর বয়সী বিসারুল হাফি মোহাম্মদ জুনুস (১.৪.২০২০) তারিখে মারা যান। এদিন চারজন মারা যান, চারজনের মধ্যে দুইজন ছিলেন মুসলিম। বিসারুলের সন্তান ফয়েজ জুনুস অভিযোগ করেছেন, ‘আমার বাবার মরদেহ পুলিশ পাহারায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং শ্মশানে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। যদি দাফনের বিকল্প থাকে তবে সরকারের ব্যবস্থা করা উচিত। কিন্তু পুড়িয়ে দেওয়াই একমাত্র বিকল্প নয়, আমরা ইসলামিক পদ্ধতি অনুসারে আমাদের প্রিয়জনকে কবর দিতে চাই।’ ইসলামিক দাফনের রীতি লঙ্ঘন করে জোর করে সরকার তাদের দেহ পুড়িয়ে দেয়। দেশটির মুসলিম কাউন্সিলের সহ-সভাপতি হিলি আহমেদ বলেছেন, ‘মুসলিম সম্প্রদায় এটিকে চরমপন্থী বৌদ্ধ শক্তির বর্ণবাদী এজেন্ডা হিসেবে দেখছে। এরজন্য সরকারকে খেসারত দিতে হতে পারে।’ ইতোপূর্বে শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোভিড ১৯ নির্দেশিকা জারি করে জানিয়েছিলো, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া মানুষের দেহগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হবে। সেখানে আরো বলা হয়, মরদেহগুলো ধৌতও করা হবে না।
শ্রীলঙ্কার পর ভারতে উল্টোটা অবলোকন করেছি, ‘ভারতে করোনায় মৃত মুসলিম বৃদ্ধকে কবর দিতে বাধা, পুড়িয়ে সৎকার’ (কালের কণ্ঠ ৪.৪.২০২০)। করোনায় আক্রান্ত মৃত মুসলিম ব্যক্তিকে মৃত্যুর পর কবর দেওয়াতে বাধা দেওয়া হয়েছে। পরে মুসলিম ব্যক্তিকে পোড়ানো হলো শ্মশানে। পরিবারের সম্মতি নিয়েই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মুসলিম ব্যক্তিকে প্রশাসনের সহযোগিতায় মুম্বাইয়ে হিন্দুদের একটি শ্মশানে পুড়িয়ে সৎকার করা হয়। সংবাদ মাধ্যমগুলোতে চোখে পড়েছে- করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পর শেষকৃত্যে উঠেছে বাধা দেওয়ার অভিযোগ। সে কবরস্থানেই হোক বা শ্মশান। করোনায় মৃত কাউকে শেষকৃত্যের জন্য নিয়ে যাওয়া হলেই বাধা দিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আতঙ্কেই মৃতদেহের শেষকৃত্যে বাধা দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসন বলেছে, পরিবারের মত নিয়েই মৃতদেহ পোড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ভারতের কোলকাতাতেই প্রথম ঘটনা ঘটেছিলো, দমদমের এক ব্যক্তিকে মৃত্যুর পর নিমতলা শ্মশানে পোড়াতে বাধা দেওয়া হয়েছিলো।
আমাদের সরকার করোনা ভাইরাসে মৃত ব্যক্তিদের নিজ নিজ বিশ^াস ও ধর্মানুযায়ী শেষকৃত্য অনুষ্ঠান পরিচালনার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন। যারা বা যিনি ব্যক্তিগতভাবে জীবনভর নিজ ধর্ম বিশ^াস, রীতি-নীতি, রেওয়াজ ও ঐতিহ্যকে লালন করে আসছেন, সেটি অনুযায়ী শেষকৃত্য অনুষ্ঠান পরিচালনা হবে; এটিতো প্রত্যাশা করা যেতেই পারে! এখানে দোষের রয়েছে বলে মনে হয় না। যে পর্যন্ত পরিবারের কিংবা নিকটজন অথবা ধর্মীয় পুরোহিতদের কাছ থেকে একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ পাবেন; অবশ্যই নিজ ধর্ম বিশ^াসের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের আলোকে; নইলে ধর্মীয়ভাবে বা সামাজিকভাবেও তাদের প্রতি একটি অলিখিত খড়গ নেমে আসতে পারে! এক্ষেত্রে প্রশাসনের দায়িত্ববান কর্মকর্তাদেরকে যথারীতি নিয়ম অনুসরণ করেই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানটি পরিচালনার জন্যে বিনীত অনুরোধ
করি।
আমার বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ^াস করে। পবিত্র সংবিধানে রয়েছেÑ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।’ মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সরকারকে সময় উপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
লেখক: সংবাদকর্মি