করোনা মুক্ত থাকতে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছি

আপডেট: April 16, 2020, 5:09 pm

আজহারুল আজাদ জুয়েল


করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সরকার ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার সাথে সাথে বাংলাদেশের সকল নাগরিককে ঘরে থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে যেন সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকে তা নিশ্চিত করতে আইন শৃংখলা বাহিনীর প্রতি নির্দেশনাও দিয়েছে।
আমি চাকরি না করলেও জনগণের সাথে রিলেটেড কাজে জড়িত। কাজের স্বার্থে আমাকে লোকর কাছে যেতে হয়, দেখা, সাক্ষাৎ ও কথা বলতে হয়। কিন্তু সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং সর্বশ্রেণির মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান শোনার পর আমি বাইরে যাচ্ছি না। নিজেকে এক প্রকার গৃহবন্দি করে রেখেছি।
শুধু যে সরকারের আবেদনের কারণেই নিজেকে গৃহবন্দি রেখেছি ব্যাপারটা শতভাগ এ রকম না। এর সাথে আরো কিছু কারণ আছে। সেই কারণগুলো একটু বললে পাঠকের বুঝতে কিছুটা সুবিধা হবে। প্রথম কারণ হলো, আমি ছোট বেলা থেকে অ্যাজমা রোগে আক্রান্ত। এই রোগ আমার বাবার ছিল, মায়ের ছিল, এখন আমারো আছে। এমনকি আমার ছেলে, ছোট বোন, দুই ভাগ্নে, তারাও আক্রান্ত অ্যাজমাটিক রোগে। বিশ^ব্যাপী করোনায় আক্রান্ত রোগীদের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকগণ দেখেছেন যে, এই রোগীদের সিংহভাগ বয়স্ক। প্রায় সত্তর-উর্ধ লোকেরাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে বেশি মারা গেছেন। এইসব রোগীর মধ্যে আগের থেকে কিছু জটিল রোগ ছিল। যেমন ডায়াবেটিস, অ্যাজমা, ক্যান্সার, হৃদরোগ ইত্যাদি। অপেক্ষাকৃত তরুণরা করোনায় আক্রান্ত হলেও মারা গেছেন কম। তাদের অধিকাংশই চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
করোনা আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুর নানান দিক বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকরা বলছেন, যারা অ্যাজমা, হাঁপানি, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, হৃদরোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত আছেন, তাদের জন্য করোনা বিপজ্জনক। তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাই করোনা ভাইরাস খুব সহজেই তাদেরকে কাবু করতে পারে এবং দ্রুতই তার জীবনহানির কারণ হয়ে উঠে। চিকিৎসকদের আহ্বান, এই ধরনের রোগীরা যেন বিশেষভাবে সতর্ক থাকেন এবং নিজেকে নিরাপদ রাখেন। তদুপরি আমার এক ভাগ্নে, দিনাজপুর সিটি কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক নুরে আলম সিদ্দিকী একদিন বললো, মামা তোমার তো বয়স ৫০ পেরিয়েছে, তুমি অ্যাজমা রোগী। এমনিতেই তোমার হাঁচি-কাশি হয়। তো এখন যখন একটা বিশেষ সিচুয়েশন চলছে- এই সময়টায় তোমার আর বাইরে যাওয়ার দরকার নাই। তুমি বাড়িতে থাকো, বই পড়, আর বাড়িতেই লেখালেখি করো।
চিকিৎসকদের সতর্কবাণী ও ভাগ্নের পরামর্শ গ্রহণ করে আমি এখন নিজেকে বাড়ির ভেতরে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। বাড়িতে বসে বই পড়া, টিভি দেখা, ল্যাপটপে এক আঙ্গুলে কম্পোজ করা, মোবাইলে মাঝে মাঝে দু-একজনের সাথে কথা বলা, ফেসবুক ও ম্যাসেঞ্জারে চ্যাটিং, কখনো কখনো বাড়ির টুকিটাকি কাজ করা, এগুলোর মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রেখছি। এভাবে আমার সময় দিব্বি পার হয়ে যাচ্ছে। কখনো বোর লাগছে না।
অবশ্য বাইরে একেবারেই বের যে হচ্ছি না, তাও নয়। মাঝে মাঝে কিছু কিছু কারণে বের হতে হয়। এর মধ্যে প্রেসক্লাবে একদিন ঢুঁ মেরেছি। আমাদের পাড়ার (পাটুয়াপাড়া) সফিউদ্দিন আহমেদ ওরফে সফি চাচা মারা গিয়েছিলেন, তার জানাজায় অংশ নিয়েছি। রামনগর বাজারে গিয়ে এক-দু’দিন কেনাকাটা করছি। দিনাজপুর নাট্য সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউর রহমান রেজু ভাইয়ের বাড়িতেও একদিন গিয়েছি। এছাড়া প্রতিদিন হাঁটার জন্য বের হয়েছি।
আমি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নই। তবও প্রতিদিন সকালে এবং সন্ধ্যায় হাঁটাহাঁটির জন্য বের হতে হয়। বিভিন্ন কারণে ছোট থেকে হাঁটার অভ্যাস আমার। যখন বাংলা স্কুলে পড়তাম তখন পাটুয়াপাড়ার বাড়ি থেকে হেঁটেই যাতায়াত করতাম। যখন দিনাজপুর সরকারি কলেজে পড়তাম, তখনো হেঁটেই যাতায়াত করতাম। স্কুল-কলেজে যাতায়াত করা ছাড়াও স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবেও প্রতিদিন সকালে বড়মাঠ, শিশুপার্ক পর্যন্ত হাঁটতাম। এভাবে হাঁটাহাঁটিটা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যার রেশ রয়েছে এখনো। আধাঘণ্টা করে দিনে দুইবার না হাঁটলে ভাল তো লাগেই না বরং এক রকমের সমস্যাও হয়। যেদিন হাঁটব না, সেদিন কোনো কাজে মন বসতে চায় না, কোনো কিছুতে এনার্জি আসে না। সেদিন মনের মধ্যে তেমন ফুর্তিও অনুভব করি না। সেদিন আমার কোমরের বিষ-ব্যথাটাও বেড়ে যায়। তাই কোমরের বিষ-ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্য হলেও আমাকে হাঁটতে হয়। আমার কোমারের এই ব্যথাটাও বাচ্চাকালের। আগে এটা শীতের সময় অনুভব করতাম। হাঁটাহাঁটি করলে চলে যেত। গরমকালে বাথা টের পেতাম না। এখন শীত-গরম সব সময়ই কোমরের ব্যথা আছে। তবে হাঁটলে আরাম, না হাঁটলে যন্ত্রণা। তাই আমার জন্য হাঁটাটাই হলো একটা চমকপ্রদ ওষুধ।
আগে বাইরে গেলে হোটেলে চা-পরোটা খাওয়ার একটা অভ্যাস ছিল। রামনগরে এখনো হোটেল খোলা। গরম পরোটা পাওয়া যায়। কিন্তু করোনা সতর্কতার পর হোটেলে যাওয়া বাদ দিয়েছি। ফুটপাটে দাঁড়িয়ে চা খাওয়ার অভ্যাস ঝেড়ে ফেলেছি। কেন না, যে সব কাপ কিংবা গ্লাসে চা দেয়া হয়, সেগুলোতে সারা দিনে অনেক মানুষের মুখ লেগে থাকে। তাদের কারো করোনা থাকলে তা ওই কাপ-গ্লাসে লেগে যেতে পারে। চা ওয়ালারাতো সেগুলো ভাল মত ধোয় না। ফলে সেগুলোর মাধ্যমে অন্যের মধ্যে জীবাণু ছড়িয়ে যেতে পারে। এমন আশংকা থেকে ফুটপাতে চা খওয়া বাদ, হোটেলে যাওয়াও বাদ। এখন লোক সমাগম থেকে দূরে থাকছি, হাঁটার পথেও লোকের কাছাকাছি না গিয়ে দূর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। এভাবে সারা দিনের এক দেড় ঘণ্টা বাইরে থাকেলেও বাকি সময়টা পুরোপরি হোমের মধ্যে থাকছি। যদিও এটাও হোমকোয়ারেন্টাইন না। তবুও বলা যায়, নিজের ও পরিবারের সুরক্ষার জন্য আমি এখন এক রকম হোম কোয়ারেন্টাইনে আছি।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক

[email protected]

২৯ মার্চ ২০২০