করোনা, রাজনীতি, লকডাউন

আপডেট: March 26, 2020, 12:36 am

সামসুল ইসলাম টুকু


প্রায় তিনমাস যাবৎ দেশের পত্রিকাগুলোর পাতাজুড়ে শুধু করোনার খবর। ডাক্তার, গবেষক, বিশেষঞ্জ, পর্যবেক্ষক এবং কলামিস্টরা করোনার উৎস, গতি-প্রকৃতি, সংক্রমণ, চিকিৎসা সচেতনতা সম্পর্কে যতো লিখেছেন যে তারপরে আর লেখার কিছু আছে বলে মনে হয় না। তবে করোনাকে নিয়ে ধর্মান্ধতা, রাজনীতি ও ধান্দাবাজি আমার মনে লেখার উৎসাহ যুগিয়েছে।
আমার মনে হয় করোনার মতো সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে এতো আলোচিত বিষয় ইতোপূর্বে দেখা যায়নি। প্লেগ, কলেরা, ম্যালেরিয়া, বসন্ত, ডেঙ্গুর মতো মহামারির মুখোমুখি হয়েছে এ বিশে^র মানুষ। তবে যেগুলো ২/১টি দেশে বা দেশগুলির কোনো কোনো অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। কিন্তু করোনা বিস্তৃত হয়েছে পৃথিবীব্যাপি। যা কারো ধারণার মধ্যেই ছিলো না। আগে এশিয়া আর আফ্রিকার দেশগুলোকেই দুর্ভিক্ষ আর মহামারির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করতো ইউরোপ আর আমেরিকার দেশগুলো। কিন্তু করোনা এবার ইউরোপ ও আমেরিকাকে ছাড়েনি। তারা এতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া সত্ত্বেও।
গত বছরের শেষে যখন চিনে করোনা আক্রমণের খবর প্রচার হলো এবং খুব দ্রুত মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লো তারপর থেকে ২ মাস পর্যন্ত এ নিয়ে আমেরিকার রাজনীতি ও ধর্মান্ধদের অপপ্রচার চলতে থাকলো। আমেরিকা বললো এটা চিনা ভাইরাস। যেন চিনের সাথে অপরাপর রাষ্ট্রগুলো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় হয়। এতে চিনের মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে বটে। গণমাধ্যমগুলো আমেরিকার এই অপরাজনীতির বাহন হলো। যখন আমরা দেখি যে সংবাদ ব্যাপক জনগণের বিরুদ্ধে যাবে তা থেকে বিরত থাকাই সঠিক সাংবাদিকতার পরিচায়ক। ঠিক তেমনি সাম্রাজ্যবাদী গণমাধ্যমকে এড়িয়ে গেলেই কোনো সমস্যা হবে না। এ পরামর্শকে কেউ ঔদ্ধত্য মনে করবেন না দয়া করে। সাম্রাজ্যবাদের ওই অপপ্রচারের কারণে আমাদের দেশের যে ব্যবসায়ীরা চিনের সাথে ব্যবসা করতো বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, ছাপানোর উপকরণ, কসমেটিকস সামাগ্রীর দাম বাড়িয়ে দিলো যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার অজুহাতে। এই দাম বৃদ্ধি অব্যাহত আছে এবং থাকবে যতোদিন না চিনের সাথে পরিপূর্ণ বাণিজ্যিক যোগাযোগ না হচ্ছে।
এদিকে ধর্মান্ধরা প্রথম বলা শুরু করলো চিনারা সাপ-ব্যাঙ, কাকড়া, পোকামাকড়সহ প্রচুর অখাদ্য খায়- তাই তাদের করোনা ভাইরাস হবে না তো কাদের হবে? এতে ধর্মান্ধরা চিনকে বেজার করতে পারলো না। তাই বলা শুরু করলো চিনারা উইঘুর মুসলমান সম্প্রদায়ের অমানবিক নির্যাতন করার কারণে আল্লাহ্্র গজব নাযিল হয়েছে। কেউ কেউ বললো চিনারা নাকি পরিবর্তিত আকারে কুরআন লেখা শুরু করেছে; তারা কমিউনিস্ট, আল্লাহ্্ মানে না তাই তাদের উপর জমিনি বালা নেমে এসেছে। আর এই গজব আর বালার ভয়ে চিনারা মসজিদে গিয়ে নামাজ ধরেছে। আমেরিকার অপরাজনীতি ও ধর্মান্ধদের অপপ্রচারকে উপেক্ষা করে চিনারা নিজেরা তাদের নিজস্ব প্রযুক্তি ও সচেতনতার মাধ্যমে করোনার মোকাবিলা করেছে এবং মারাত্মক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে। অন্যদিকে ইরান, ইতালিসহ ইউরোপ ও আমেরিকায় যখন করোনা আক্রমণ শুরু হলো তখন ধর্মান্ধরা মুখে কুলুপ এঁটে দিলো। এরপর চিনারা যখন নিজেদের বিপর্যয় কাটিয়ে তাদের প্রযুক্তি ও লোকবল নিয়ে ইতালির সাহায্যে এগিয়ে গেল ধর্মান্ধরা উল্টো শুর ধরলো। এবার বললো হিকমতে চিন। শুধু তাই নয়- সাময়িক বোধোদয় হয়ে বলছে ১৫০০ বছর আগে নবীজীর বাণী। যদি শেখার জন্য সুদূর চিনে যাবার প্রয়োজন হয় তবে যেতে হবে। সেই বাণীকে যুক্তিযুক্ত বলে স্বীকার করছে। অন্যদিকে বিশে^র বিভিন্ন দেশও স্বীকার করছে এই বিপদে চিনই পৃথিবীর একমাত্র ভরসা।
পত্রিকাগুলোর তথ্য অনুযায়ী গতকাল বুধবার পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৮ হাজার ৮৯২ মারা গেছে। অতি দ্রুত যদি একে প্রতিরোধ না করা সম্ভব হয় তাহলে মৃতের মাত্রাটা গাণিতিকহারে বৃদ্ধি পাবে। দেশে দেশে চলছে গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম। লকডাউন শুরু হয়েছে শহরে শহরে। যেন গণহারে সংক্রমিত হতে না পারে। সীমিত পর্যায়ে থাকে। ইতোপূর্বে যেসব মহামারি পৃথিবীতে এসেছিলো সবগুলোই প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে এবং ভাইরাস আক্রমণের আগেই তার প্রতিরোধে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে করোনা প্রতিরোধও সম্ভব হবে এবং ভ্যাকসিনও আবিষ্কার হবে। তবে ইতোমধ্যে করোনা পৃথিবীব্যাপি যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। খুব সাধারণ একজন ডাক্তার মো. ইউসুফ আলী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় তাপমাত্রা যথেষ্ট আছে। এমন তাপমাত্রা ১৫ দিন অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের খোলাস্থানে ভাসমান ভাইরাস ও ডাক্তারদের দেওয়া সাবধানতা অবলম্বন করলে মানুষের শরীরের ভেতরের ভাইরাস মারা পড়বে এবং বিস্তার লাভ করতে পারবে না। ঢাকার মতো দূষণযুক্ত শহরে গত ৩ মাসে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত দেশগুলো থেকে যতো প্রবাসী এসেছে তারপরেও বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত সংক্রমণ দেখা যায়নি। এটি বাংলাদেশের মতো গরিব দেশের জন্য অনেক বড় সৌভাগ্য। যেখানে সম্পদশালী সুশৃঙ্খল স্বাস্থ্য সচেতন ইতালি, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, স্পেন, আমেরিকার মতো দেশগুলো দিশেহারা।
বাংলাদেশের গত মঙ্গলবার লকডাউন ঘোষণার পর ধান্দাবাজ মুনাফালোভী মজুদদাররা খাদ্যদ্রব্যের দাম তো বাড়িয়েছে তার উপরে বাজারে সরবরাহ আশঙ্কাজনকভারে কমিয়ে দিয়েছে। আগামী দশ দিনের লকডাউনের শিকার হবে খেটে খাওয়া মানুষরা। স্বচ্ছল মানুষরা লকডাউনের খবর পাওয়ার সাথে সাথে বাজার থেকে প্রয়োজনীয় বা বেশি খাদ্যদ্রব্য কিনে নিয়েছে। কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায় তারা কী করবে? তাদের কাজ নাই, খাবার নাই- এই অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের কথা হচ্ছে, দেশে কী হতে যাচ্ছে, রাস্তাঘাট জনশূন্য- দেশের অবস্থা ভালো না, আর এই ব্যাটা মজুদদাররা কি খাদ্যদ্রব্য আর টাকা নিয়ে কবরে যাবে। অন্যদিকে আমাদের সরকারের এতো লোকবল নেই যে, এই দশদিন বসে থাকা গরিবদের প্রতিদিনের খাদ্য যোগান দেবে। সেক্ষেত্রে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের কথা শোনা যায়নি। সুতরাং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক হওয়া স্বাভাবিক। সে আতঙ্ক করোনার নয়। খাদ্যের। এ বিষয়টি ভেবে সরকারের বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক। মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনী থাকবে সেহেতু এ সমস্যা সমাধান সম্ভব বলে আশা করা যায়। মঙ্গলবারই ফেসবুকে দেখলাম মাস্কহীন পথচারীদের জীব-জানোয়ারের মতো লাঠিপেটা করছে পুলিশ। ছেলে-বুড়ো, নারী সেই লাঠিপেটা থেকে বাদ পড়ছে না। এটা যেদেশে অথবা যে শহরেই হোক না কেন সেটাকে সভ্যতা বা মানবতা বলা যাবে না। সেক্ষেত্রে পুলিশের এবং সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের কর্তব্য হবে মাস্কবিহীনদের মাস্ক সরবরাহের ব্যবস্থাসহ (টাকার বিনিময়ে হলেও) করোনা থেকে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সচেতনতা শিক্ষা দেওয়া। তাছাড়া অনেক শ^াসকষ্টের রোগী আছে যারা মাস্ক পরলে শ^াসকষ্ট বৃদ্ধি পায়। বিষয়গুলো ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে ব্যবস্থা নিতে হবে। করোনায় মৃতের যে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তা নিয়ে সামান্য হলেও মতপার্থক্য আছে। কারণ করোনা ভাইরাস চিহ্নিতকরণের যন্ত্রপাতির সংখ্যা বিশে^ নিতান্তই অপ্রতুল। সেক্ষেত্রে সব মৃত্যুই যে করোনার কারণে তা নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে আক্রান্ত দেশগুলোতে যেগুলো স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মনে করা হচ্ছে সেখানে যে করোনা আক্রান্ত নেই সেটিও জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না।
লেখক : সাংবাদিক