কী বীভৎস নৃশংসতা

আপডেট: জুলাই ৪, ২০১৯, ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


নারীর প্রতি সহিংসতা কিংবা নারীকে কেন্দ্র করে নানা ঘটনা ঘটেই চলেছে এদেশে অহরহ। নারী স্বাবলম্বী কী নির্ভরশীল সে প্রশ্নটি কোনো বড় বিষয় নয়। সে মানুষ এ পরিচয়টি বড় না হয়ে সে নারী এ পরিচয়টি বড় হয়ে দেখা দেয় এখনও এ সভ্য সমাজে। এ পরিচয় তাকে তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে পদে পদে।
অনেকেই বলে থাকেন নারী উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়েছে। কথাটি আংশিক সত্য। এ আংশিক সত্য দিয়ে কোনো বিষয়কে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদের মাননীয় স্পিকার সবাই নারী- এ কথা সত্য। কিন্তু এ সত্য প্রমাণ করে না এদেশে সব নারী স্বাবলম্বী, স্বাধীন-তারা কোনো ভাবে নির্যাতিত নন। স্বাধীন বাংলাদেশে নারী স্বাধীনতা ও অগ্রযাত্রার যুগে এখনও ঘরে ঘরে মেয়েরা নিগৃহিত হচ্ছে। এ নিগ্রহের ধরন ভিন্ন ভিন্ন। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। এ শিক্ষা গ্রহণের পথে মেয়েদের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় বখাটেদের উপদ্রব। যদিও তারা পুরুষ শিক্ষক থেকেও নিরাপদ নয়। বখাটেদের জাত-পাত নেই। তারা যেমন স্কুলগামী কন্যা শিশুদের বিরক্ত করে, তেমনি বিরক্ত করে কলেজগামী তরুণীদের। এ নিগ্রহের মাত্রা কখনও কখনও এমন হয় যে, অনেকক্ষেত্রেই মেয়েরা তা মুখ বুঁজে সহ্য করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। অনেকের ক্ষেত্রে তারা বখাটেদের হাতেই প্রাণ হারায়। আর কত রিফাত, তনু, তানিয়াকে বখাটেদের হাতে বলী হতে হবে? কবে হবে তাদের খুনের বিচার? তাদের অভিভাবকেরা অনেকটা হাল ছেড়ে দিয়েছেন বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা দেখে। তারা হতাশ, বিচার ব্যবস্থার উপর তাঁদের আস্থা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। যথেষ্ট কারণও রয়েছে আস্থাহীনতার।
নারী নির্যাতনের মত সামাজিক ব্যাধি এত গভীরে শেকড় গেড়েছে যেটি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব যদি সমাজে বসবাসকারী সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে নারী নির্যাতনকে ‘না’ বলেন এবং কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে তারা নিশ্চুপ না থেকে যদি ভিকটিমের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের প্রতিকার পাবার ব্যবস্থা করতে পারেন। প্রায় নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে দেশের কোনো না কোনো জায়গায় নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছেই। যত ঘটনা ঘটে তার সামান্যই আমরা পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি। প্রকৃত ঘটনা অনেকক্ষেত্রেই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। ঘটনাগুলো ঘটার পর অনেকক্ষেত্রেই আঙ্গুল তোলা হয়, ভিকটিমের দিকে। নানা অপচেষ্টা চলতে থাকে। একান্তই যেগুলোকে উপেক্ষা করা যায় না শুধুমাত্র সেগুলি জানতে পারি। অনেকক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে কিংবা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকে ঘটনাগুলোকে ধামাচাপা দেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয় কখনও কখনও সামান্য টাকা-পয়সার বিনিময়ে ঘটনার রফা হয়ে থাকে।
রাফি হত্যাকা-ের উষ্ণতা নির্বাপিত হতে না হতেই সম্প্রতি বরগুনায় ঘটে গেল নৃশংস হত্যাকা- যার বর্বরতা অতীতের অনেক ঘটনাকেই হার মানায়। যদিও এখানে প্রাণ দিতে হয়েছে শাহ নেওয়াজ রিফাত ওরফে রিফাত শরীফকে। ঘটনার মূলে রয়েছে সেই নারী নির্যাতন। আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি ও রিফাত শরীফের ভেতরে ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। নয়ন কলেজে আসা-যাওয়ার পথে উত্ত্যক্ত করতো মিন্নিকে। অনেকদিন মুখ বুঁজে সহ্য করলেও এক সময় সে পরিবারের সদস্যদের জানায়। তারা মনে করেন মিন্নি ও রিফাতের বিয়ে দিলে নয়ন হয়ত ওকে আর বিরক্ত করবে না। তাই তাঁরা দুমাস আগে ওদের বিয়ে দেন। কিন্তু বখাটে নয়ন তাতে নিরস্ত না হয়ে আরো বেশি করে বিরক্ত করতে থাকে। রিফাত, মিন্নিকে কলেজ আনা নেওয়া করতে থাকে। এমনি একদিনে নয়ন তার সঙ্গীদের দিয়ে রিফাতকে ডেকে নিয়ে তাকে প্রথমে মারধর করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রকাশ্যে দিবালোকে কোপাতে থাকে। মিন্নি প্রাণপণে চেষ্টা করে ওদের ঠেকাতে, সে চিৎকার করে আশপাশের মানুষের সাহায্য চায় কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি সাহায্যের জন্য। এক পর্যায়ে তারা তাকে ছেড়ে দেয়। ততক্ষণে তার অবস্থা শোচনীয়। তার চিকিৎসার যথাসাধ্য চেষ্টা করা হলেও শেষরক্ষা হয় নি। মৃত্যু তাকে নিয়ে যায় না ফেরার দেশে।
এ বর্বরোচিত হত্যাকা-ের মূল হোতাসহ সহযোগীরা বিভিন্ন মামলার আসামী। অথচ তারা জেলে না থেকে দিনের আলোতে রিফাতকে হত্যা করার মত ঔদ্ধত্য দেখায়। এদেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের। মানুষ বড় অসহায়। পুলিশ প্রশাসন অনেকটাই উন্নাসিক। এত বড় অপরাধ করার পর তাদের আর মনুষ্য সমাজে থাকবার অধিকার থাকে না। কারণ যারা সুস্থভাবে সমাজে চলার কিংবা বেঁচে থাকার অধিকার জোর করে হরণ করে তারা কখনও সামাজিক জীব হতে পারে না। শোনা যায়, এরা মাদকের সাথে যুক্ত। পত্রিকান্তরে জানা যায়, এরা নানা সময় নানাভাবে বিভিন্ন মানুষের উপর জুলুম চালিয়েছে। ভয়ে তারা মুখ খোলে নি। তাই বলে ঘটনাগুলো ধামাচাপা পড়েছে তা নয়। মানুষ এগুলো জানে। বিশেষ করে যারা ভিকটিম তারা এখনও আতংকিত। এত ভয়ংকর বিভীষিকাময় যাদের চরিত্র তাদেরকে আইনের আওতায় না এনে মনুষ্য সমাজে ছেড়ে রেখে মানুষকে শংকিত অবস্থায় রাখা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেমন দায়িত্ব পালন? এটিকে প্রহসন ছাড়া অন্য কিছু বলার উপায় নেই। সরকারের উচ্চপদস্থ কেউ কেউ বেশ জোরেসোরে বলার চেষ্টা করছেন এ ঘটনার বিচার হবে। কিন্তু তার নিশ্চয়তা কোথায়? কারণ অতীতের বেশ কিছু ঘটনাই প্রমাণ করে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে বড় বড় অপরাধ করেও অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, তাদের বিচার হয় নামে মাত্র। প্রকৃত অপরাধীরা থাকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে, বিচারহীনতার এই যে নাটক এটি সমাজকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যুব সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যাদের হাতে দেশ, জাতি নিরাপদ নয়। সরকার যদি প্রকৃত অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিয়ে তাদের যথাযথ বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে একটিও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাহলে অন্য কেউ কোনো অপরাধ করার পূর্বে দশবার ভাববে। সরকার কী সে পথে যাবে না গতানুগতিক পথে যাবে? রাজনীতির জন্য রাজনীতি না করে গণমানুষের অধিকার নিশ্চিত করা তাদের নিরাপত্তা বিধান করা, অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া, সত্যানুরাগীদের পুরস্কৃত করা এগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
জানা যায়, রিফাত হত্যা ঘটনায় জড়িতরা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের আশীর্বাদপুষ্ট। আমরা সাধারণ জনগণ আমরা সুবিচার চাই এ হত্যাকা-ের। অপরাধী যেই হোক তার শাস্তির বিধান করুন। রিফাত ফিরে আসবে না। একমাত্র সন্তানের এ করুণ পরিণতি কীভাবে মেনে নেবেন তাঁরা? মিন্নি কি ভুলতে পারবে তার প্রিয়তম বন্ধু, স্বামী ও সহযোগীর অত্যাচারের পাশবিক চিত্র? তারই চোখের সামনে ঘটা ঘটনায় সে প্রাণপণে চেষ্টা করেছে তাঁকে রক্ষা করার। কিন্তু অসহায় মিন্নির সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেনি। মানুষের প্রতি হারিয়ে ফেলেছে আস্থা। মানুষ কি মনুষ্যত্বের কাছে দায়বদ্ধ নয়? আজ যে ঘটনা রিফাত-মিন্নির ক্ষেত্রে ঘটেছে, সেই একই ঘটনা কি অন্য কারো ক্ষেত্রে ঘটতে পারে না? যদি ঘটে তাহলে তার পরিণতিও কি একই রকম হবে? না, তা হতে পারে না। আমরা চাই আর কোনো নৃংশসতা এমন ভয়াবহ আকার ধারণ না করুক। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। এটিই যেন হয় শেষ নৃংশসতা।