কুয়ালালামপুর, লাংকাবি ও সিঙ্গাপুর ভ্রমণ একটি মনোরম অভিজ্ঞতা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৭, ১:০১ পূর্বাহ্ণ

ড. কানাই লাল রায়


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
আমরা সুলতান মসজিদেও গিয়েছিলাম। মসজিদের পাশে মার্কেট আছে। সেখানে জিনিসপত্র অপেক্ষাকৃত সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। আমাদের অনেকে সেখান থেকে কেনা-কাটা করলেন।
ওইদিন বিকাল ৩ টার দিকে টুরিস্ট বাসে আবার আমাদের অনেকে শহরের অন্যান্য দ্রষ্টব্য বস্তু দেখতে বেরিয়ে পড়লেন। আমরা ক্লান্ত ছিলাম বলে আর ওদের সঙ্গে গেলাম না। আমরা (আমি, আমার স্ত্রী কল্পনা ও তাসকিনা আপা) পায়ে হেঁটে শহর দেখার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। হোটেল মুন থেকে মুস্তাফা প্লাজা বা মুস্তাফা সেন্টার খুব বেশি দূরে নয়। আমরা হাঁটতে হাঁটতেই সেখানে গিয়ে পৌঁছলাম। মুস্তাফা সেন্টার বহুস্থান জুড়ে এবং সম্ভবত ৬ বা ৭ তলা। আমরা কিছু কেনা-কাটাও করলাম। রাত ৮/৮:৩০ টার দিকে আমরা হেঁটেই হোটেলে ফিরে এলাম। রাস্তা চিনতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল। মানুষের কাছে জিজ্ঞাসা করতে করতে ফিরে এলাম।
পথে তিনজনে সাগর কলা কিনে খেলাম। এক একটির দাম ৪০ সেন্ট। আমরা হোটেলে ঢোকার আগে নিকটস্থ একটা হোটেলে গিয়ে রাতের খাবার খেয়ে এলাম। এখানে ভেজিটেরিয়ানদের জন্যও খাওয়া-দাওয়া কোনো সমস্যা নয়।
৮ তারিখে সকালে আমরা যথারীতি হোটেলে ব্রেকফাস্ট করলাম। নানা ধরনের নানা স্বাদের খাবার রয়েছে। বুফে সিস্টেমে যে যার ইচ্ছা মতো খাবার নিয়ে নিচ্ছেন। আমরা ব্রেকফাস্ট শেষ করে আমাদের রুম থেকে আমাদের লাগেজসহ নিচে নেমে এলাম। প্রথমে সবার লাগেজগুলো সিস্টেমেটিকভাবে একস্থানে রাখা হলো। কারণ ওইদিন বিকেল ৫ টায় আমাদের কুয়ালালামপুরের ফ্লাইট। আমরা রুমের চাবি হ্যান্ডওভার করে দিলাম। প্রথমে কথা ছিল মালপত্র হোটেলেই থাকবে। আমরা শহর ঘুরে এসে মূলত জুরং বার্ড পার্ক (Jurong Bird Park) দেখে এসে মালপত্র নিয়ে চলে যাব। পরে স্থির হলো একেবারেই মালপত্র বাসে তুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়বো। তাই করা হলো। আমাদের লাগেজাদি বাসে তোলা হলে শেষবারের মতো আমরা শহর ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখতে দেখতে আমরা জুরং বার্ড পার্কে এসে পৌঁছালাম। জুরং বার্ড পার্কে যাওয়ার জন্য ট্রামের ব্যবস্থা ছিল। ট্রামে যেতে যেতে মাঝপথে আমরা একস্থানে থামলাম। সেখানে দেখলাম, গাছে গাছে প্রচুর টিয়া পাখি। বাদাম জাতীয় কিছু খাবার খেতে দিলে একেবারে হাতের ওপর এসে বসে। সেখান থেকে আমরা আবার ট্রামে চড়ে এমন একটি স্থানে এসে নামলাম যাকে বলে world of darkness  বা অন্ধকার জগৎ।
গুহার মতো আবছা অন্ধকার পথে আমরা হাঁটতে লাগলাম। অনেক ধরনের প্যাঁচা দেখতে পেলাম। এ সব পাখি সাধারণত দিনের আলোয় দেখতে পায় না, রাতে চলাচল করে। অনেক ধরনের পেঙ্গুইন পাখিও চোখে পড়লো। এরপর আমরা অন্ধকার গুহা থেকে বেরিয়ে পুলস অ্যামফি থিয়েটার (Pools Amphi-Theatre)-এ এসে পৌঁছলাম। আমরা দলের সকলে গ্যালারিতে এসে বসলাম। দুর্গা নামে একটি মেয়ে পাখিদের সম্পর্কে এবং তাদের প্রশিক্ষণ সম্পর্কে অনেক কথা বললো। তারপর একজন ভদ্রলোক পাখিদের দিয়ে নানা কৌতূহলোদ্দীপক ও চিত্তাকর্ষক খেলা দেখাতে লাগলেন। পাখিগুলোর নাম Flamingo, Macaw, Amigo, Parrot ইত্যাদি। বিভিন্ন পাখি নানা কৌশল দেখাতে লাগলো। Macaw নামক বেশ বড় আকারের সুন্দর-দর্শন পাখিটি পরিষ্কার কণ্ঠে আমাদের ইংরেজিতে good morning জানালো,one থেকেten পর্যন্ত সংখ্যাগুলো বললো, ইংরেজিতে একটি গান করলো এবং পুরো Happy birth day গানটি গেয়ে শুনালো। পাখির কণ্ঠ বলে মনেই হলো না, মানুষের মতো পরিষ্কার কণ্ঠ। Flamingo পাখিগুলো বাজনার তালে তালে নেচে দেখালো। দুটি পাখি দু’পাশ থেকে দূরে দূরে হাতে-ধরে-থাকা পাঁচটি রিং-এর ভিতর দিয়ে উড়ে গিয়ে তাদের কুশলতা প্রকাশ করলো। আরও অনেক পাখি অবাক করা নানা কসরত দেখালো। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে লাগলাম। ওইদিন বিকালেই আমাদের সিঙ্গাপুর ছাড়ার ফ্লাইট। কাজেই আমাদের মনের মধ্যে এক ধরনের ব্যস্ততা কাজ করছিল। আমরা জুরং বার্ড পার্ক থেকে আমাদের হোটেলের কাছাকাছি দুপুরের খাওয়ার জন্য ঢাকা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট নামে একটি হোটেলে চলে এলাম। আমরা ৩১ জন ছিলাম। সবাইকে দ্রুত খাওয়ার সাপ্লাই করতে বলা হলো। যাহোক, আমরা আধ ঘণ্টার মধ্যে খাওয়া-দাওয়ার কাজ শেষ করে সিঙ্গাপুর এয়ার পোর্টের দিকে যাত্রা করলাম। পাঁচটায় ফ্লাইট, আমরা ৩ টার মধ্যে এয়ার পোর্টে পৌঁছে গেলাম। এয়ার পোর্টের ফর্মালিটি শেষ করে বিমানের ওঠার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। Malindo Air-এ আমরা সিঙ্গাপুর থেকে প্রথমে কুয়ালালামপুর যাব এবং সেখান থেকে রাত ৮:১০ এর ফ্লাইটে আমরা ঢাকা এয়ারপোর্টে নামবো। নির্ধারিত সময়ে অর্থাৎ ৬:১৫-র দিকে আমরা কুয়ালালামপুর পৌঁছলাম। এবং এয়ারপোর্টের ফর্মালিটি শেষে Malindo Air-এ আমরা রাত ৮:১০ টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। প্রায় ৪ ঘণ্টা পর রাত ১০ টায় (বাংলাদেশ সময়) আমরা ঢাকা বিমান বন্দরে পৌঁছলাম। বিমান বন্দরের ফর্মালিটি, লাগেজ সংগ্রহ ইত্যাদি বাবদ বিমান বন্দর থেকে বের হতে আমাদের প্রায় রাত ১১ টা বেজে গেল। সেখান থেকে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট হোটেল ১০ মিনিটের রাস্তা, কিন্তু রাস্তা জ্যামের কারণে আমাদের হোটেল সাঈদায় পৌঁছাতে প্রায় রাত ১২টা বেজে গেল। হোটেলে পৌঁছে দেয়া এবং হোটেলের রুম বুকিং পর্যন্তUnion Tourism-এর দায়িত্ব ছিল। হোটেলের ভাড়া (এক দিনের ১৮০০ টাকা) আমাদেরই দিতে হলো। আমাদের রাজশাহী গামী ট্রেন সিল্কসিটি পরদিন (৯.৫.১৭) দুপুর ২:৪০ মিনিটে। হোটেলে ব্রেক ফাস্টের কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা বাইরে গিয়ে অন্য একটি রেস্টুরেন্টে সকালের খাওয়া খেয়ে এলাম। আমার স্ত্রী টুকটাক শপিংও করলো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাতে আমাদের সব সঙ্গীরা হোটেলে ওঠেননি। যাদের ঢাকায় আত্মীয় আছে বা ঢাকায় স্থায়ীভাবে থাকেন (৪ জন) তাঁরা অনেকে সেখানে চলে গেলেন। আমাদের ঢাকায় আত্মীয় থাকা সত্বেও মালপত্র টানাটানির ভয়ে এবং রাত হয়ে যাওয়ায় আমরা হোটেলে থাকাই মনস্থ করলাম। Union Tourism-এর যিনি মালিক সেই হায়দার সাহেব ফেমিলিসহ (স্ত্রী ও কন্যা)। আমাদের সঙ্গেই কুয়ালালামপুর ও সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন। সঙ্গে তাঁর সহকারী সেলিম সাহেব নামে এক ভদ্রলোক ও (Union Tourism-এর লোক) গিয়েছিলেন। ঢাকা হোটেলের রুম বুকিং-এর কাজ (যাঁরা হোটেলে থাকতে ইচ্ছুক) এবং বিমান বন্দর থেকে কার-এ হোটেলে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব তাঁরা পালন করেছিলেন। তাঁরা বিমান বন্দর থেকে আমাদের কাছে বিদায় নিলেন।
আমরা ঢাকায় পৌঁছানোর সংবাদ আমরা ঢাকাস্থ আত্মীয় স্বজনকে জানাইনি। তারপরও দেখি দুপুর ১২ টার দিকে শালিকা স্বপ্না এবং তার সহকর্মী ও বন্ধু অজন্তা হোটেল খুঁজে আমাদের বের করেছে এবং আমাদের দুপুরে খাওয়ার তরি-তরকারিও নিয়ে এসেছে। তারা আমাদের রাজশাহী গামী সিল্কসিটি ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে তবে বিদায় নিল। প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য, আমরা কুয়ালালামপুর যাওয়ার দিনও তারা বিমানবন্দরের কাছে হোটেল পারভিন-এ উপস্থিত ছিল। আমরা সিল্কসিটি ট্রেনে রাত ১০ টায় রাজশাহী এসে পৌঁছলাম। স্টেশনে ছেলে শিমুল একজন লোককে (রুস্তম) নিয়ে উপস্থিত ছিল এবং ব্যাটারিচালিত অটো ভাড়া করে রেখেছিল। আমরা রাত ১০.৩০ মিনিটে বাসায় পৌঁছলাম। অন্যরা যাঁর যাঁর গন্তব্য স্থানে চলে গেলেন।
লেখক: প্রফেসর (অব.) ভাষা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।