কুয়ালালামপুর, লাংকাবি ও সিঙ্গাপুর ভ্রমণ Ñ একটি মনোরম অভিজ্ঞতা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৭, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

ড. কানাই লাল রায়


আমরা ৩০ জনের মতো (মূলত সবাই রাজশাহীর মানুষ) ঢাকাস্থ ইউনিয়ন টুরিজম অ্যান্ড ট্রাভেল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনায় কুলালামপুর, লাংকাবি ও সিঙ্গাপুরে ভ্রমণের মনস্থ করি। আমাদের এই যাত্রার মূল পরিকল্পনা ও সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রফেসর ড. তাসকিনা ফারুক। আমাদের ভিসা ও টিকিটের দায়িত্ব ইউনিয়ন টুরিজমই পালন করে। আমরা কেবল টিকিটের টাকা ও পাসপোর্ট  প্রভৃতি প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র সরবরাহ করি।
আমরা ১.৫.১৭ তারিখ সকাল ৭.৪০ সিল্ক সিটিতে রাজশাহী থেকে ঢাকা যাত্রা করি এবং বিমানবন্দর স্টেশনে অবতরণ করি দুপুর ১:৪৫ মিনিটে। আমাদের সহযাত্রী সংখ্যা ৩০ জনের মতো হলেও রাজশাহী থেকে আমরা ১৯ জন যাত্রা করি। বিমান বন্দর স্টেশন থেকে আমরা নিকটস্থ হোটেল পারভিন-এ অবস্থান করি, ইউনিয়ম টুরিজম-এর ব্যবস্থাপনায় কিন্তু নিজস্ব খরচে। রাত ৯ টার দিকে হোটেল থেকে বিমান বন্দরে যাত্রা করি। ওই সময় বেশ বৃষ্টি হচ্ছিল। বিমান বন্দরে এলাম ইউনিয়ন টুরিজম অ্যান্ড ট্রাভেল লিমিটেডের ৪ সিটের কার-এ চড়ে বেশ কয়েক দফায়।
বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন, বোর্ডিং পাস, ল্যাগেজ ইত্যাদি ভড়ৎসধষরঃু শেষ করে আমরা কুয়ালালামপুর বিমানের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। বিমান গধষরহফড় অরৎ ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর (কঁধষধ খঁসঢ়ঁৎ) ছাড়লো রাত ১২:৫০ অর্থাৎ তখন ২ তারিখ পড়ে গেছে। আমরা কুয়ালালামপুর বিমান বন্দরে পৌঁছালাম ২ মে সকাল সাতটার দিকে (কুয়ালালামপুর সময়), যা আমাদের সময় থেকে দু’ঘণ্টা এগিয়ে।
বিমানবন্দরের ফর্মালিটি শেষ করে আমরা ইউনিয়ন টুরিজম-এর ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট বাসে চড়ে মূল শহরের দিকে হোটেল আনকাসা-য় এসে উঠলাম। বাসে আমাদের মঁরফব ছিলেন আল-দ্বীন। তিনি চমৎকার ইংরেজিতে মালয়েশিয়ার ইতিহাস বর্ণনা করতে করতে হোটেলের অহপধংধ-র দিকে যাত্রা করলেন। বিমান বন্দর থেকে হোটেল আনকাসা-র দূরত্ব (পুরো নাম অহপধংধ ঐড়ঃবষ ্ ঝচঅ, কঁধষধ খঁসঢ়ঁৎ) ৪০ কি.মি. মতো। এটি অবস্থিত ঔধষধহ ঞঁহ ঞধহ ঈযবহম খড়পশ, চ.ঙ. ইড়ী ১২৭০০-এ।
কুয়ালালামপুর পাহাড়ি শহর। পাহাড় কেটে কেটে প্রশস্ত ঝকঝকে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। শহরের দিকে আসতে রাস্তার দু’ধারে শুধু পামট্রি। ফলবান বৃক্ষের মধ্যে মাঝে মাঝে কলাগাছ চোখে পড়লো। পামওয়েল ওখানকার বিখ্যাত অর্থকরি ফসল। উল্লেখ্য, হোটেল আনকাসা চমৎকার একটি হোটেল। হোটেলের করিডোরে ঢুকতেই প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করলো তাজা ফুলে সুসজ্জিত বিশাল একটি ফ্লাওয়ার ভাস। যেন হোটেলে নবাগতদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। অনেকে চমৎকৃত হয়ে তার ছবিও তুললেন। হোটেলে ৯১৩ নং কক্ষটি আমাদের দু’জনের জন্য (আমি ও স্ত্রী কল্পনার জন্য) বরাদ্দ হলো। রুমটি বেশ ভালো, প্রশস্ত। রুমের নং যুক্ত কার্ড দিয়ে রুমের লক খুলতে হয়। অন্যরা তাঁদের জন্য বরাদ্দ রুমে চলে গেলেন। ওইদিন দুপুরে ওই হোটেলেই খেলাম। দু’জনের লাগলো ৪০ রিঙ্গত করে ৮০ রিঙ্গিত (প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য, ১ রিঙ্গিত সমান বাংলাদেশের টাকা ১৮.৫০)। ওইদিন দুপুর আড়াইটা/৩টার দিকে আমরা ট্যুরিজম-এর বাসে করে শহর দেখতে বের হলাম। আমরা কুয়ালালামপুর ন্যাশনাল মসজিদ দেখলাম। সুলতান আবদুল সামাদের বাসভবনও দেখলাম। ওই সময় বেশ বৃষ্টি হচ্ছিল। রাজবাড়ির ভিতরে যাওয়া আমাদের সম্ভব হয় নি। আমরা রাজবাড়ির প্রধান গেটে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মূল গেট এবং প্রাঙ্গণ থেকে যতদূর দেখা যায় আমরা রাজভবন দেখলাম। ঘধঃরড়হধষ গড়ংয়ঁব কুয়ালামপুরের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। সেন্ট্রাল মার্কেট থেকে এর দূরত্ব ১৫ মিনিটের। গার্ডেন লেক থেকে এর দূরত্ব ১ কিলোমিটার। এই মসজিদের অলঙ্করণ ট্রাডিশনাল ইসলামিক আর্টের সঙ্গে আধুনিক আর্টের সংমিশ্রণ। এর আর্কিটেকচারাল ডিজাইন মক্কাশরীফের মসজিদের দ্বারা অনুপ্রাণিত। এর পাঁচটি ছাদ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ সূচনা করে এবং এর গম্বুজটি জাতীয় স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সুলতান আবদুল সামাদ প্রাসাদটিও মালয়েশিয়ার নানা ঐতিহ্য বহন করে। ১৯৫৭ সালের ৩১ আগস্ট মালয়েশিয়া স্বাধীনতা লাভ করে। এর ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্রটিও এই প্রাসাদের সামনে পাঠ করা হয়। এই প্রাসাদ ভবনটি মোঘল ভাস্কর্যের সঙ্গে মালয়েশিয়ান ও ব্রিটিশ ভাস্কর্যের সংমিশ্রণে প্রণীত। গাইডের কাছে জানতে পারলাম বর্তমান রাজা ৪৮ বছর বয়স্ক এবং অবিবাহিত।
আমরা ওইদিন জাতীয় স্বাধীনতার প্রতীক ও শহিদদের সম্মানে প্রতিষ্ঠিত স্মৃতিসৌধ বা মনুমেন্টটিও দর্শন করি। মনুমেন্ট চত্বরটিও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বৃষ্টির কারণে ওইদিনের ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে আমাদের হোটেলে ফিরে আসতে হয়। অনেকে আবার মার্কেটিং-এও যান। আমার স্ত্রীও তাসকিনা আপার (তাসকিনা ফারুক, ইনি রা.বি.র মনোবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা) সঙ্গে মার্কেটিং-এ গিয়ে কয়েকটি ছাতা এবং একটি হোটেল থেকে রাতের খাবার কিনে আনে।
কুয়ালালামপুরের বার্ডপার্কটিও একটি দর্শনীয় বস্তু। কিন্তু সময়াভাবে তা দেখা সম্ভব হয়নি। তবে আমাদের  সেই স্বাদ পূর্ণ হয় সিঙ্গাপুরে গিয়ে। সে বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করেছি। পরদিন অর্থাৎ ৩.৫.১৭ তারিখ সকাল ৮ টার দিকে হোটেল আনকাসায় ব্রেকফাস্ট সম্পন্ন করলাম। ব্রেকফাস্ট বিচিত্র খাদ্যের সমাহারে পূর্ণ এবং বুফে সিসটেমে খাওয়ার ব্যবস্থা। এরপর বেলা ৯টার দিকে আমরা টুরিস্ট বাসে করে কুয়ালালামপুরের সবচেয়ে প্রধান দর্শনীয় বস্তু চবঃৎড়হধং ঞরিহ ঞড়বিৎ দর্শন করলাম।  ঞরিহ ঞড়বিৎ টি বহু দূর থেকে দেখা যায়। এর সামনের লনটিও খুবই সুন্দর, মনোরম। টাওয়ারটি অনেকটা ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ারের মতো। ঞরিহ ঞড়বিৎ-এর ভিতরের দৃশ্য আরও চমৎকার। সুদৃশ্য সপিং মলে সুসজ্জিত প্রতিটি ফ্লোর। এসকেলেটরে করে উপরে উঠতে হয়। এসকেলেটর (ঊংপধষধঃড়ৎ) বা চলন্ত সিঁড়ি মানুষের পায়ে হেঁটে সিঁড়ি ভাঙার কষ্ট কমিয়েছে। এইভাবে বহুতলে উঠলেও পরিশ্রান্ত হতে হয় না। তবে ওঠা এবং নামার সময় সতর্ক না থাকলে বিপত্তি ঘটতে পারে। ঞরিহ ঞড়বিৎ দর্শন শেষ হলে আমরা আবার একত্রিত হলাম। উল্লেখ্য, ঞরিহ ঞড়বিৎ আরও দর্শনীয় হয়ে ওঠে রাত্রিকালীন আলোক সজ্জায়। আমাদের সঙ্গী অনেকে ব্যক্তিগতভাবে মনো ট্রেনে করে রাতে টুইন টাওয়ার দেখতে গিয়েছিলেন।
আমরা এরপর একটি হিন্দু মন্দিরের দিকে যাত্রা করলাম। মন্দিরটি একটি অতি উঁচু পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। দেবতার নাম মুরুগান (গঁৎঁমধহ) বা নারায়ণ। পাহাড় কেটে সিঁড়ি নির্মিত হয়েছে। ২৭২ টি সিঁড়ি। সিঁড়িতে এবং চার পাশে প্রচুর বানরের সমাহার। তারা প্রধানত মন্দির ও প্রতিমা দর্শনে আগত দর্শনার্থীদের প্রদত্ত বাদাম, কলা প্রভৃতি খাদ্যের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। মন্দির কর্তৃপক্ষও হয়তো তাদের জন্য আলাদা খাবার বরাদ্দও রেখেছে। মন্দির প্রাঙ্গণে বিশাল আকৃতির মুরুগান বা নারায়ণের মূর্তি। ১৪০ ফিট উঁচু। আমরা ওই বিশাল নারায়ণ দেবতার মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে অনেক ছবি তুললাম। মন্দির চত্বরে ডাব বিক্রি হচ্ছে। ডাবগুলি বড় আকৃতির এবং অদ্ভুত ভঙ্গিতে গ্লাসের মতো করে কাটা হচ্ছে। দাম প্রতিটি ৫ রিঙ্গিত, আমাদের হিসাবে ৯০ টাকার ওপরে। আমরা ডাব খেলাম। মন্দির প্রাঙ্গণে ছোটখাট মার্কেটিং শপ আছে আমরা একটি গণেশের মূর্তি, একটি নারায়ণের মূর্তি এবং কিছু চাবির রিং কিনলাম।
কুয়ালালামপুরের শ্রী মহামারিয়াম্মান মন্দির চায়না টাউন ও জলন তুন লী স্ট্রিটে অবস্থিত মালয়েশিয়ার সর্ব প্রাচীন মন্দির। কে থম্বস্বামী পিল্লাই ১৮৭৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষিণ ভারতীয় ধাঁচে নির্মিত মন্দিরটি ১৯৬৮ সালে প্রায় পুনর্নির্মিত হয়। মন্দিরটি দর্শনীয়। এর গাত্রে রামায়ণের কাহিনী খোদিত। এ মন্দিরটি দূর থেকে দেখেছি। গুয়ান ডি মন্দিরটি যুদ্ধের দেবতা গুয়ান ডি-র নামে স্থাপিত। এটিও আমরা কুয়ালালামপুরে পথ চলতে চলতে দেখেছি।
এখন আমরা মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কের কিছু কথা বলবো। মালয়েশিয়া ১৯৫৭ সালে ব্রিটেনের নিকট থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।
মালয়েশিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী টুঙ্কু আবদুল রহমান, দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী তুন আবদুল রাজাক হুসাইন, তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী তুন হোসাইন এবং চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী তুন ডা. মাহাথির মোহাম্মদ। এঁরা প্রত্যেকেই দেশপ্রেমিক এবং জাতীয়তাবাদী নেতা। নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে এঁদের অবদান অসামান্য। তবে আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি ও রূপকার যাঁকে বলা হয়ে থাকে, তিনি হলেন চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী তুন ডা. মাহাথির মোহাম্মদ। তিনি ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ২২ বছর যাবত মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন এবং পেশায় ছিলেন স্বনামধন্য চিকিৎসক। মালয়েশিয়া বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জন্য ‘ঞযব গধষধুংরধ : ঞযব ঝবপড়হফ চৎড়মৎধসসব’ চালু করে। মাহাথির মোহাম্মদ সমগ্র দেশকে কৃষি ভিত্তিক দুর্বল অর্থনীতি থেকে প্রায় একক প্রচেষ্টায় শিল্পের শক্তিকেন্দ্রে রূপান্তরিত করেছেন, মাত্র দুই দশকের মধ্যে। তিনিও অন্য তিন প্রধানমন্ত্রীর মতো ইউএমএনও (টগঘঙ অর্থাৎ ঞযব টহরঃবফ গধষধুং ঘধঃরড়হধষ ঙৎমধহরুধঃরড়হ) দলের সদস্য। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীরাও সমান দেশপ্রেমিক এবং দেশোন্নয়নের কাজে নিবেদিত প্রাণ। রাজা ও রাজভবনের কথা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। পুত্রজায়া হলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাসভবন। যাবতীয় সরকারি অফিসও পুত্রজায়াতে। প্রধানত, উল্লেখ্য, ইউএমএনও (দি ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন) ১৯৪৬ সালে গঠিত, মালয়েশিয়ার সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল। মালয়েশিয়া স্বাধীনতা লাভের পর স্বল্প সময়ের মধ্যে যে উন্নতি সাধন করেছে, তা অভূতপূর্ব ও প্রশংসনীয়। মালয়েশিয়ার মূল জনগোষ্ঠি হলো মালে। তাঁরা ওই দেশের আদিম জনগোষ্ঠি। তাছাড়া, চিনা বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠি আছে এবং আছে ভারতের তামিল বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠি। তাছাড়া, ভারতের অন্যান্য প্রদেশের জনগোষ্ঠিও আছে, আর আছে প্রচুর বাংলাদেশি। বিভিন্ন হোটেল ও মার্কেটের প্রায় সর্বত্র বাঙালিদের চোখে পড়ে। বেশিরভাগ বাঙালি শ্রমিক হিসাবে কাজ করছে। আমরা মালয়েশিয়ার লাংকাবি-তে বেশ কয়েজন বাঙালি শ্রমিককে দেখেছি এবং তাদের সঙ্গে কথাও বলেছি, তারা সেখানে বিল্ডিং নির্মাণের কাজ করছে এবং ১০/১২ বছর যাবত আছে। প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য, মালয়েশিয়া আকারে বাংলাদেশ থেকে অনেক বড়, কিন্তু জনসংখ্যা মাত্র ৩ কোটির মতো। মূলত, মুসলমান প্রধান দেশ। তবে অর্থনীতির অনেকটাই চাইনিজ ও ভারতীয়দের হাতে। ভারতীয় সংস্কৃতির অনেকটাই এখনও সেখানে চালু আছে।
৩ মে অর্থাৎ ওইদিনই আমরা বিকাল ৩ টার দিকে টুরিস্ট বাসে চড়ে মালয়শিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর পুত্রজায়ার দিকে যাত্রা করলাম। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাসভবনও পুত্রজায়াতে অবস্থিত, একথা আগেই উল্লেখ করেছি। আমরা পুত্রজায়া মসজিদও দেখলাম। মালয়শিয়া পাহাড়ি শহর। আমাদের পুত্রজায়াতে যেতে প্রশস্ত পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে অনেক উঁচুতে উঠতে হলো। এরপর আমরা পুত্রজায়ার যে আকর্ষণীয় সুবৃহৎ ভবনটির সামনে আমরা উপস্থিত হলাম তার নাম এধহঃরহম ঐরময খধহফং. ভবনটি সুউচ্চ পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এবং সুদৃশ্য সপিং মল তো আছেই আরও আছে সুদৃশ্য ক্যাসিনো। ক্যাসিনো আমরা পরে সিঙ্গাপুরেরও দেখেছি। ঢুকলে চাকচিক্যে চোখ ঝলসে যায়। তবে ওখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তু ঈধনষব কার-এ চড়ে রোপওয়ে দিয়ে উচ্চ পাহাড়ের উপর ভ্রমণ। নিচের দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যাওয়ার অবস্থা, মাঝে মাঝে স্টেশন আছে। আমরা সর্বোচ্চ যে স্থানটি উঠলাম তা ভূপৃষ্ঠ বা সমতল ভূমি থেকে ১৮০০ ফিট উঁঁচুতে। আমাদের কাছে এই যাত্রাটি ছিল যেমনি ভীতিকর তেমনি এক আনন্দদায়ক অনুভূতি। সেন হলো মালয়েশিয়ার মুদ্রার একক। ১০০ সেনে এক রিঙ্গিত। বাংলাদেশের ১৮.৫০ টাকার সমান।
এখানে কয়েকটি মালয়েশিয়ান শব্দ ও তার বাংলা অর্থ দেওয়া হলোÑ
মেরদেকা Ñ স্বাধীনতা।
তাওকে Ñ মহাশয়, প্রভু।
টুঙ্কু, টেঙ্কু Ñ রাজকুমার।
সঙ্কক Ñ কাপড় বা ভেলভেট তৈরি কালো রঙের টুপি। মালয়ী পুরুষরা পরে থাকেন।
রাকিয়াত Ñ নাগরিক সমাজ বা জনগণ। কবষঁষধৎ শব্দটির প্রচুর ব্যবহার দেখলাম অর্থ ঊীরঃ, ঞধীর বানানটি ঞবশংর রূপে লেখা হয়। ঝরমহধঃঁৎব কে ঞধহফধ ঃধঁমধহ, ঞড়ঃধষ কে ঔঁসষধয, ছঁধহঃরঃু কে কঁধহঃরঃঃ রূপে লেখা হয়। চৎরপব কে ঐধৎমধ, জবপবরাবফ নু কে ঞবৎরহধ ড়ষবয রূপে লেখা হয়। প্লেনে মালয়ান ভাষায় লেখা আছে ঞবৎরসধ শধংরয শবৎধহধ ঃধনধৎধহম শধসর অর্থ ঞযধহশ ুড়ঁ ভড়ৎ ভষুরহম রিঃয ঁং।
লাংকাবি
আমাদের বিমান ৪ মে কুয়ালালামপুর থেকে লাঙ্কাবি ছাড়লো বিকাল ১৫.৪০ অর্থাৎ ৩.৪০-এ এবং লাংকাবি পৌঁছালো ১৫.৪৫ বা বিকাল ৪.৪৫-এ। এয়ারপোর্টের কাজ শেষে আমরা এয়ারপোর্টের বাইরে এসে আমাদের জন্য অপেক্ষমান টুরিস্ট বাস দেখতে পেলাম। আমরা সবাই বাসে উঠলে বাস হোটেল বিল্লা ভিস্তার দিকে যাত্রা করলো। এই বাসের গাইড ছিলেন সারা (ঝবৎধ) নামক একজন ইয়াং নারী। লাংকাবিতেই তাঁর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। বাস ছাড়লে তিনি লাংকাবি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ও অমায়িক ভঙ্গিতে অনেক তথ্য তুলে ধরলেন। বিমান বন্দর থেকে হোটেল বিল্লাভিস্তা ৩০/৩৫ মিনিটের পথ। বিল্লাভিস্তা সমুদ্রের ধারে একটি চমৎকার পরিবেশে অবস্থিত। আমাদের কক্ষ নং ছিল ৩৩৪। অন্য সঙ্গীরা তাঁদের বরাদ্দ কক্ষে চলে গেলেন হোটেলের তিন তলার বারান্দা থেকে অদূরবর্তী সমুদ্রের নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখে পড়ে। হোটেলের ক্যান্টিনটি হোটেলের মধ্যে অবস্থিত নয়। হোটেল থেকে সামান্য দূরে সুদৃশ্য ফুল বাগানের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে একেবারে সমুদ্রের তীর ঘেসে অবস্থিত। আমরা দু’জন কান্টিনে গিয়ে রাতের খাবারের অর্ডার দিলাম এবং আমরা দুজন ক্যান্টিনের পাশে এমন একটি জায়গা বেছে নিয়ে বসলাম, যেখান থেকে সমুদ্র একটি ছোট্ট লন পার হলেই। ঠিক সমুদ্রের ধার ঘেষে নারকেল গাছের বীথি। টেবিলের ওপর মৃদু আলোর মোমবাতি। ফ্লাওয়ার ভাসও আছে। অতি মনোরম পরিবেশ। আমরা চায়ের অর্ডার দিয়ে বসলাম। বিশাল গ্লাসে দুধ চা। এক কাপ নিলে এক কাপ ফ্রি। দাম সাত রিঙ্গিত। আমরা চাপর্ব শেষ করে একেবারে কাছে অবস্থিত সুইমিং পুলে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম আমাদের সফর সঙ্গী অনেকেই সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত এবং কেউ কেউ ইতোমধ্যেই সুইমিং পুলে নেমে পড়েছেন। সুইমিং পুল বেশি গভীর নয়, দেড়/দুই গজ হতে পারে। পাশেই সমুদ্র, কিন্তু সুইমিং পুলের জল লবণাক্ত নয়, মিষ্টি। প্রতিদিনই পাম্পিং করে জল পরিবর্তন করা হয়। জলের মধ্যে বালব লাগানো থাকায় জলটি আলোকিত। আমাদের প্রস্তুতি ছিল না। কাজেই তীরে বসে দেখছিলাম। পরে আমার স্ত্রীর কথায় শুধু জামাটি খুলে গেঞ্জি ও প্যান্ট পরা অবস্থাতেই জলে নেমে পড়লাম। সে এক দারুণ সুন্দর মিষ্টি অভিজ্ঞতা। ২৫/৩০ মি. জলে থেকে উঠে পড়লাম। সঙ্গে তোয়ালে ছিল না, কাজেই ওই অবস্থাতেই হোটেলে চলে এলাম। পরে রাত ৯.৩০-র দিকে ক্যান্টিনে যেয়ে দু’জন খেয়ে এলাম।
মালয়েশিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। সুউচ্চ পাহাড় ও পাশাপাশি সমুদ্রের অবস্থান এই দেশটিকে আরও মনোরম করে তুলেছে। পাহাড় কেটে সুপ্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ যেমনি ব্যয়বহুল তেমনি শ্রমসাধ্য বিষয়। কিন্তু একটি জাতি সৎ ও দেশপ্রেমিক হলে কোনো কঠিন কাজই আর দুঃসাধ্য থাকে না। মালয়েশিয়া রাবার উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু আমাদের ভ্রমণের পথে রাবারের গাছ তেমন চোখে পড়েনি। তবে পাহাড়ি রাস্তার দু’পাশে প্রচুর পাম গাছ চোখে পড়েছে। পামওয়েল মালয়েশিয়ার প্রধান অর্থকরি ফসল। কুয়ালামপুরে আমাদের দেশের পরিচিত আম, কাঁঠাল, নারিকেল প্রভৃতি ফলবান বৃক্ষ তেমন চোখে না পড়লেও লাংকাবি অঞ্চলটি এর ঠিক বিপরীত। সেখানে আম কাঁঠাল পেঁপে নারিকেল কলা আনারস প্রভৃতি ফলবান গাছ প্রচুর পরিমাণে আছে। পশুপাখিদের মধ্যে শালিক, কাক, কুকুর, বিড়াল প্রভৃতি চোখে পড়লো। চেহারায় তেমন পার্থক্য নেই। (চলবে)