কৃষিকাজে ইউডিপি কৌশল ছোট পরিবর্তন বড় প্রাপ্তি

আপডেট: মার্চ ৫, ২০১৮, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


বছর দুই আগেও লাভলু সরদারের কাছে কৌশলটা ছিল অজানা। জমিতে ইউরিয়া প্রয়োগ করতেন সনাতন পদ্ধতিতে, ছিটিয়ে। এ পদ্ধতিতে ইউরিয়ার অপচয় যে হচ্ছে, সেটা বুঝলেও পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি ছিল তার কাছে অজ্ঞাতই।
লাভলু সরদারকে এ সমস্যা থেকে মুক্তি দিয়েছে মাটির গভীরে ইউরিয়া প্রয়োগ বা ইউরিয়া ডিপ প্লেসমেন্ট (ইউডিপি) কৌশল। শ্রম ও খরচ কমায় কৌশলটি আত্মবিশ্বাসও দিয়েছে তাকে। কৃষিতে আরো বেশি মনোযোগী ফরিদপুরের এ কৃষকের ভাষ্য, এ কৌশলে ইউরিয়ার অপচয় একদম নেই, লাগছেও আগের চেয়ে কম। সারের খরচ হ্রাস পাওয়ায় প্রতি বছরই আবাদের পরিসর বাড়াচ্ছি।
লাভলু সরদারের মতো ফরিদপুরের প্রায় সব কৃষকই এখন গুটি ইউরিয়ার দিকে ঝুঁকছেন। ফরিদপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় আবাদি জমি রয়েছে মোট ১ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর। এর প্রায় ২৫ শতাংশেই গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করছেন কৃষকরা।
কৌশলটি ব্যবহারে সারা দেশে কৃষকদের উৎসাহিত করে যাচ্ছেন কৃষি সম্প্রসারণকর্মীরা। এ কাজে তাদের সহায়তা করছে ইন্টারন্যাশনাল ফার্টিলাইজার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (আইএফডিসি)। কৃষিতে গুটি ইউরিয়ার ব্যবহারসংক্রান্ত গবেষণা বলছে, সারা দেশের ২৫ লাখের বেশি কৃষক এটি ব্যবহার করছেন। কৌশলটির ফলে ইউরিয়ার ব্যবহার কমছে ২৫ শতাংশ। এর বিপরীতে ধানের ফলন সর্বনিম্ন ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রথাগত পদ্ধতিতে ইউরিয়া প্রয়োগের তুলনায় নতুন কৌশলে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণও কম হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) ও আইএফডিসি যৌথভাবে দুই দশক আগে ইউরিয়া প্রয়োগের নতুন কৌশলটি উদ্ভাবন করে। বাংলাদেশে কৌশলটি অল্পবিস্তর প্রয়োগ শুরু হয় ২০০৯ সালে। প্রথমে ধানে ইউডিপি কৌশল প্রয়োগ করা হলেও এখন অন্যান্য ফসলেও একই পদ্ধতিতে ইউরিয়া ব্যবহার করছেন কৃষক। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, গুটি ইউরিয়া ব্যবহারের পূর্বশর্ত হলো লাইনে চারা রোপণ। রোপণের সাতদিনের মধ্যে মাটি শক্ত হওয়ার আগে মাটির ৩-৪ ইঞ্চি নিচে গুটি ইউরিয়া পুঁতে দিতে হয়। প্রতি চার গোছার মাঝখানে একটি করে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হয়। শুধু ধান নয়, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলেও এ কৌশলে ইউরিয়া প্রয়োগ করা যায়। প্রায় দেড় হাজার ব্রিকেট মেশিনের মাধ্যমে আইএফডিসির উদ্যোগে দেশে প্রায় আড়াই লাখ টন গুটি ইউরিয়া উৎপাদন ও ব্যবহার হচ্ছে। ফলে গুঁড়ো ইউরিয়া ব্যবহার ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে।
আইএফডিসির এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ইশরাত জাহাঁ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, কৃষকের কাছে এ সারের চাহিদা তৈরিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করি আমরা। পরবর্তীতে সারের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন ও বিপণনের জন্য বেসরকারি খাতকেও সম্পৃক্ত করা হয়। এখন সার পোঁতার জন্য উন্নত মেশিন তৈরির কাজ চলছে। সামনের দিনে উন্নত মেশিন আনা গেলে কৃষকের সারের ব্যবহার অনেক কমে আসবে। সেই সঙ্গে কমবে ফসলের উৎপাদন খরচও।

কৃষিতে ইউডিপি কৌশলের প্রয়োগ নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। এসব গবেষণার ফলাফল বলছে, এ পদ্ধতিতে ২৫ শতাংশ কম ইউরিয়া ব্যবহার করেও ২৫ শতাংশ ফলন বাড়ানো যায়। জমিতে প্রয়োগের পর নাইট্রোজেনের যে অপচয় হয়, ইউডিপি কৌশলে তা ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনা যায়।
এসব সুবিধার কারণে কয়েক বছর ধরেই গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করছেন নাটোরের সিংড়া উপজেলার কৃষক আবদুল হান্নান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ধান চাষে গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে ভালো ফলন হওয়ায় এবারও ব্যবহার করছি। আগে প্রতি বিঘা জমিতে ৫০-৫৫ কেজি গুঁড়ো ইউরিয়া সার ব্যবহার করতে হতো। এখন বিঘাপ্রতি ২৫-২৭ কেজি গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করলেই হচ্ছে।
সবাই যাতে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করেন, সেজন্য কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে বলে জানান নাটোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, জেলায় গুটি ইউরিয়া সার ব্যবহার বাড়ানোর জন্য উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গুটি ইউরিয়া সারের ব্যবহারও বাড়ছে। এতে কৃষক কম খরচে বেশি লাভ পাচ্ছেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের ফার্টিলাইজার গাইড-২০১২ অনুযায়ী গুঁড়ো ইউরিয়া আউশ ও আমন ধানে অন্তত প্রতি হেক্টরে গড়ে ২০০ কেজি ও বোরো ধানে ৪৩৪ কেজি প্রয়োগের নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুসারেই কৃষকরা সার দিয়ে থাকেন। কিন্তু গুটি ইউরিয়া প্রতি হেক্টরে আউশ-আমন ধানে মাত্র ১১২ কেজি ও উফশী বোরো ধানে ১৭০ কেজি প্রয়োগ করতে হয়। ফলে আমন ধানে ৮৮ কেজি এবং বোরো ধানে ২৬৪ কেজি সার সাশ্রয় করে। গুটি ইউরিয়ায় গুঁড়ো ইউরিয়ার মতোই ৪৬ শতাংশ নাইট্রোজেন বিদ্যমান থাকে। গুটি ইউরিয়া কোনো নতুন সার নয় জানিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সরেজমিন বিভাগের পরিচালক ড. আলহাজ উদ্দিন আহাম্মেদ বণিক বার্তাকে বলেন, এটি গুঁড়ো ইউরিয়ারই রূপান্তর। তবে গুটি ইউরিয়া বাজারে প্রচলিত গুঁড়ো ইউরিয়ার তুলনায় অনেক বেশি লাভজনক। গুটি ইউরিয়া একবার প্রয়োগ করলেই চলে। ধান পাকা পর্যন্ত আর প্রয়োগ করার প্রয়োজন পড়ে না। গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে জমিতেও আগাছাও কম হয়। খড়ে পুষ্টিমান বেশি থাকে। কমে যায় পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের উপদ্রব।
গুটি ইউরিয়া তিনভাবে অপচয় রোধ করে জানিয়ে তিনি বলেন, এ সার বাতাসে উবে যায় না। মাটির গভীরে চুইয়ে অপচয় হয় না। পানির সঙ্গে বিলে বা নদী-নালায়ও চলে যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে পরিবেশও ভালো থাকে। সার কম লাগে বিধায় ভরা মৌসুমে সারের অভাব থাকে না। এসব সুবিধার কারণে সারা দেশেই এটির ব্যবহার বাড়ানো হবে।
উল্লেখ্য, দুটি ধাপে ইউডিপি কার্যকর করা হয়। প্রথমে একটি মেশিনের (ব্রিকেট মেশিন) মাধ্যমে প্রচলিত গুঁড়ো ইউরিয়াকে গুটি ইউরিয়ায় রূপান্তর করা হয়। দ্বিতীয়ত. মাটির ৩-৪ ইঞ্চি নিচে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ। বাংলাদেশে দুই সাইজের গুটি ইউরিয়া তৈরি করা হয়। আউশ ও আমন মৌসুমের জন্য ১ দশমিক ৮ গ্রাম এবং বোরো মৌসুমের জন্য ২ দশমিক ৭ গ্রাম ওজনের গুটি। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা