কৃষি পণ্যের দাম হোক কৃষকবান্ধব

আপডেট: জুন ২০, ২০১৯, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এদেশের প্রায় ৮০ ভাগ লোক কোনো না কোনোভাবে কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। যে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী কৃষির উপর নির্ভরশীল সে দেশে কৃষক কেন এত অবহেলিত? খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, ধান বিক্রি নিয়ে কৃষক মহাবিপাকে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত সরকারের হস্তক্ষেপে তারা খানিকটা স্বস্তি পায়।
পত্রিকান্তরে জানা যায়, বাঘায় এক মণ পটল বিক্রি হয় ১২০ টাকায়। অর্থাৎ এক কেজি পটলের দাম মাত্র ৩ টাকা। ফলে কৃষকরা আর খেত থেকে পটল তুলছেন না। খেতেই নষ্ট হচ্ছে তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চাষ করা পটল। যদি পটলের বাজার দর এমন থাকে তাহলে তাদের লোকসান গুনতে হবে। প্রতি মণ পটল বাজারে আনতে পরিবহণ খরচ ২০ টাকা। খাজনা দিতে হয় ২০ টাকা। খেত থেকে তুলতে লাগে ২০ টাকা এর পরে রয়েছে চাষাবাদ বাবদ খরচ। এসব খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে তা দিয়ে কৃষকের বাজার করার মতো খরচ থাকে না। সপ্তাহ দুয়েক আগে এ পটল বিক্রি হয়েছে ২২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। এ দাম পেয়ে কৃষকরা খুশি। যে দামই তারা পাক না কেন তাতে কেজি প্রতি পটলের দাম ৫.৫০ টাকা থেকে ৬.৫০ টাকা পেয়েছেন কৃষকরা। আমরা ক্রেতারা পটল কিনছি ২০ টাকা থেকে ১৫ টাকা কেজি। এতে করে দেখা যাচ্ছে কৃষি পণ্যের বিপনের ক্ষেত্রে একদিকে ঠকে কৃষক এবং অন্যদিকে ঠকে অসহায় ক্রেতারা। লাভের সিংহভাগ যায় বিক্রেতার ঘরে। মধ্যস্বত্বভোগী যারা আছে তারাও অনেকটাই লাভবান হয়। তবে পাইকারি ও খুচরা দামের যে বিরাট ব্যবধান এটা দূর হওয়া উচিৎ। যদি পটল ২০ টাকা কেজি হয় তাহলে কৃষক যেন অন্ততঃ ১০ টাকা পায় সেটি নিশ্চিত হওয়া দরকার। তাহলে কৃষক লাভবান হবে। সেক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীরা কিছুটা হলেও লাভের পরিমাণ কম পাবে কিন্তু তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে এ বিষয়ে নজর দিতে হবে। তা না হলে কৃষক নিরুৎসাহিত হবে এবং কৃষি থেকে সরে গিয়ে বিকল্প কোনো কাজ খুঁজবে যেটা কৃষক বা সাধারণ জনগণ কারোর জন্যই মঙ্গলকর হবে না।
আমরা অনেকে কৃষকের কষ্টের কথা বলে থাকি- কিন্তু কৃষক কীভাবে লাভবান হবে সে বিষয়টি ভেবে দেখি না। অনেকে আবার তাদের এত ছোট করে দেখে যে কাউকে গালি দেবার সময়ে বলে ‘চাষা’ অর্থাৎ তাঁদের কাজকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। অথচ তারা এটুকু বোঝে না বা জানে নাÑ এই কৃষক সম্প্রদায় না থাকলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে। কারণ তাঁরা ফসল ফলান বলেই আমরা আমাদের নিজ প্রয়োজনীয় জিনিস পাই এবং শিল্প কলকারখানাগুলো পায় শিল্পের কাঁচামাল যা থেকে উৎপাদিত হয় নানা শিল্পপণ্য। যেগুলো আমাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হয়। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
একজন কৃষক উদয়াস্ত যে পরিশ্রম করেন ফসল ফলাতে- তাকে মূল্যায়ন করা যায় না কোনো অর্থমূল্যে। বর্তমান বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার যুগে কৃষি যন্ত্রপাতির আধুনিকায়ন হওয়ায় তাঁদের কষ্টে কিছুটা লাঘব হয়েছে সত্য। কিন্তু এ অগ্রযাত্রার সুফল সর্বত্র এখনও পৌঁছায় নি একথা যেমন সত্য, তেমনি অনেক কৃষকের তেমন আর্থিক সংগতি নেই এসব আধুনিক যন্ত্রপাতির সুবিধা গ্রহণ করার। সুতরাং, অনেককেই সেই প্রাচীন পদ্ধতিতেই চাষাবাদ করতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, অনেক সময় কৃষক ন্যায্যমূল্যে সময়মতো সার, বীজ, কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ উপযুক্ত দামে হাতের কাছে পান না। পেলেও অনেকক্ষেত্রে তাঁরা প্রতারণার শিকার হয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে তাঁরা অনেক সময়ই এর প্রতিকার পান না। ফলে তাঁদের চুপিসারে এগুলো মেনে নিতে হয়। অনেকেই আছেন প্রতিকার পাবার জটিলতার মধ্যে নিজেকে জড়াতে চান না। বা অনেকে কীভাবে প্রতিকার পাবেন সেটাও জানেন না। সুতরাং, মুখ বুঁজে তাদের সব মেনে নিতে হয়।
যোগাযোগের উন্নতির এ যুগে কৃষকরা এখন বাজারদর কিংবা কৃষি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য অনেক সময়ই হাতের কাছে পেয়ে থাকেন। কিন্তু এখনও অনেক কৃষক আছেন যাঁরা এসব প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হতে পারেন নি। যাঁরা এখনও পাশ্চাদপদ তাদের নানা রকম ভোগান্তির শিকার হতে হয় এবং তাঁরা ভোগান্তির শিকার হয়ে থাকেন। কৃষকরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য সরকারসহ সাধারণ জনগণকেও সচেতন হতে হবে। সরকারি উদ্যোগকে আরো বেগবান করতে হবে। যাঁদের উদ্দেশ্যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে তাঁরা যেন সঠিক উপায়ে এসব তথ্য পেতে পারেন সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে। কোনো তথ্য যেন বিভ্রান্তিকর না হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে। কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার, বীজসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্যে পায় সেদিকে নজর দিতে হবে। কৃষকদের সহজ শর্তে প্রয়োজনীয় কৃষিঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে করে উৎপাদন মৌসুমেই কম দামে কৃষিপণ্য বিক্রি করে দিতে তাঁরা বাধ্য না হন। বিক্ষিপ্তভাবে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি না করে সকলের পণ্য একত্রিত করে যৌথ দর কষাকষির মাধ্যমে পণ্যের ন্যায্য দাম পায় যে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিপণ্যের দাম যেন কৃষকের অনুকূলে যায় সে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে যথেষ্ট আন্তরিক হতে হবে। এ বিষয়গুলো যাতে নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়ে সকলকে যথেষ্ট সচেতন ও আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি কৃষক ভালো থাকে তাহলে ভালো থাকবে দেশ ও সমাজ। তাই আমাদের সকলের উচিৎ কৃষকদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।