কোটা আর কালোবাজারির ফাঁদে ট্রেনের টিকিট

আপডেট: জুন ১৪, ২০১৮, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

শাহিনুল ইসলাম আশিক


টিকিট যেনো সোনার হরিণ। ছোয়া তো দূরের কথা, পাত্তাও পাওয়া যায় না। কোটার ও কালোবাজারির কারণে টিকিট পাচ্ছে না প্রত্যাশীরা। কোটার ফাঁদে আটকা পড়েছে রেলস্টেশনের ৪৫ শতাংশ টিকিট। আর বাকি ৫৫ শতাংশ টিকিটের উপরে রয়েছে কালোবাজারিদের থাবা। ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিটের দেখা মেলা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে টিকিট প্রত্যাশীদের।
গত ১০ জুন টিকিট কালোবাজারির কারণে মাত্র ১৫ মিনিটে ১৮ জুনের ফিরতি টিকিট শেষ হয়ে যায়। সেই দিন ১৬ জনের টিকিট দেয়ার পরে কাউন্টার থেকে জানানো হয় টিকিট শেষ। এনিয়ে বিক্ষোভ করে টিকিট প্রত্যাশীরা। ওই দিন সিল্কসিটি ও ধুমকেতু দুই ট্রেনের এসি সিটের সংখ্যা প্রায় ৫০০টি। শোভন চেয়ার প্রায় ১২০০টি। সংসদ সদস্য, প্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন কোটা বাদে প্রায় সাড়ে তিনশ এসি সিটের টিকেট সাধারণ মানুষের পাওয়ার কথা। কিন্তু রেল কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় টিকেট কালোবাজারির কারণে টিকেট পাননি অধিকাংশ টিকিট প্রত্যাশী।
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী রেলের টিকিট বিক্রিতে চালু রয়েছে চার ধরনের কোটা পদ্ধতি। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ অনলাইন। ভিআইপি ও রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রাখা হয়েছে পাঁচ শতাংশ করে। এর বাইরেও আছে পাঁচ শতাংশ জরুরি কোটা। সবমিলে বিভিন্ন ভাবে দেখা যায় অন্তত ৪৫ ভাগ টিকিট চলে যাচ্ছে ভিআইপিদের হাতে।
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের বিভাগীয় ম্যানেজার অসিত কুমার তালুকদার বলেন, ২৫ শতাংশ কোটা রয়েছে। কোনো কোনো সময় ৪৫ শতাংশ কোটার মধ্যে চলে যাচ্ছে।
অন্যদিকে স্টেশনগুলো টিকিট বরাদ্দ নিয়ে অভিযোগ তুলেছে যাত্রীরা। রাজশাহীতে যে সকল স্টেশন রয়েছে তাদের ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০টা পর্যন্ত টিকিট বিক্রি করতে দেয়া হয়। সেই টিকিটগুলো দ্রুত শেষ হয়ে যায়। রাজশাহী স্টেশনে বাকি টিকিটগুলো কাউন্টার থেকে বিক্রি করা হয়।
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের সুপারিনটেনডেন্ট গোলাম মোস্তফা বলেন, রাজশাহীর সব স্টেশন থেকে ট্রেনের টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। টিকিট সংখ্যায় অনেক কম। স্টেশনগুলোতে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০টা পর্যন্ত বরাদ্দ থাকে।
টিকিট প্রত্যাশী রাইসা জান্নাত বলেন, ভাইয়া ভোরে এসে টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়েছিলো। সে চলে গেছে আমি আর চাচাতো ভাই এসেছি টিকিটের জন্য। লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। অনেক মানুষ, দেখা যাক টিকিট পাই কিনা। কালোবাজারিরা কাউকে দিয়ে স্টেশন থেকে টিকিট কিনিয়ে নেয়। পরে তারা বেশি টাকায় বিক্রি করে। এছাড়া টিকিটের জন্য কালোবাজারিদের ১০০ থেকে ১৫০ টাকা করে দেয়া হয়।
মঙ্গলবার সকালে কালোবাজারির অভিযোগে আটককৃত নাটোর আবদুলপুরের সিহাব (১৪) জানায়, তার চাচা রাজমিস্ত্রির কাজ করে। সে টিকিট কেনা বেচা করে আবদুলপুর স্টেশন এলাকায়। আর সিহাবের সঙ্গে কথা হয়েছে টিকিট প্রতি ১০০ টাকা দেবে তাকে। তাই সে রাজশাহী স্টেশনের টিকিট কিনতে এসেছে আরেক চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে। সিহাব ভ্রামম্যাণ আদালতে আটকের পরে চাচাতো ভাইও সটকে পড়ে। পরে তাকে মুঠোফোনে ফোন করা হলে তিনি আসছি বলে আর আসেনি। পরে সিহাবকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়।
একই অভিযোনে আটক করা হয় পুঠিয়ার এনামুল হককে। তিনি রাজশাহী কোর্টের এক অ্যাডভোকেটের টিকিট কিনতে এসেছিলেন। সঙ্গে ওই অ্যাডভোকেটও ছিলেন। ওই সময় অ্যাডভোকট ও এনামুলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। ঘটনা বেগতিক দেখে সটকে পড়ে ওই অ্যাডভোকেটও। এসময় এনামুল স্বীকার করেন, তিনি এই ধরনের আরো লোকদের টিকিট কাটতে প্রায় স্টেশনে আসেন। পরে এনামুলকে জিআরপি থানায় হস্তান্তর করা হয়।
সর্বশেষ গতকাল বুধবার দুই বোন টিকিট কালোবাজারি ভাইয়ের জন্য স্টেশনে আসেন। তাদের টিকিটসহ আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালত কারাদণ্ড প্রদান করে। তারা হলেন, নগরীর চন্দ্রিমা থানার ভদ্রা জামালপুর মহল্ল¬ার নজরুল ইসলামের স্ত্রী সুমনা আক্তার (৩৫) ও মতিহারের তালাইমারী শহিদ মিনার এলাকার কাইয়ুম আলীর স্ত্রী সুমি খাতুন (৩২)।
রাজশাহী জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার মামনুন আহমেদ অনীক তাদের প্রত্যেককে এক মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। রাজশাহী জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার মামনুন আহমেদ অনীক জানান, দণ্ডপ্রাপ্ত দুই নারীর কাছ থেকে আটটি টিকিট উদ্ধার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, তাদের বড় ভাই কালোবাজারে টিকিট বিক্রি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। তার মাধ্যমেই তারা দুই বোন কালোবাজারিতে জড়িয়েছেন। দণ্ড দেয়ার পর তাদের রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। মামনুন আহমেদ অনীক জানান, আগাম টিকিট যতদিন বিক্রি করা হবে ততদিনই তারা স্টেশনে অবস্থান করবেন।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতি কালোবাজারির অভিযোগে রাজশাহী স্টেশনে চার দিকে ১৮ জনকে জেল জরিমানা করেছে ভ্রামম্যাণ আদালত। তবুও পাত্তা নেই টিকিট নামের সোনার হরিণটির।